এই পুজো এবার পা দিল ৫৬৯-তম বছরে
ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী পশ্চিমবঙ্গ। এই বাংলায় দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আক্ষরিক অর্থে সর্বোচ্চ মাত্রার সাংস্কৃতিক আনন্দোৎসব। যে আনন্দযজ্ঞে সামিল হয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল আর্থসামাজিক শ্রেণীর মানুষ। শারদীয়া উৎসবে মিশে আছে ঐতিহ্য, শিল্প, আনন্দ এবং ভক্তি। কলকাতা এবং কলকাতার বাইরে এই উৎসবের রং আলাদা নয়। কলকাতার মতোই রাজ্যের অন্য শহর বা মফস্সলেও বারোয়ারি পুজো-র পাশাপাশি পুরাতন ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বনেদি বাড়ির পুজো। তেমনই একটি বনেদি বাড়ির পুজো হয় হুগলির কোন্নগর-এ।

কোন্নগরের ঘোষাল বাড়ির পুজো ৫৬৯ বছরের পুরোনো। ঐতিহ্যমন্ডিত এই পুজোতে লেগে রয়েছে ঘোষালবাড়ি তথা কোন্নগরের বিবর্তনের ইতিহাসের গন্ধ, যে পুজোর আকর্ষণ সমগ্র কোন্নগরবাসীর কাছে প্রবল। এমনকি, কলকাতা ও অন্যান্য শহর থেকেও দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে পুজোর পাঁচদিন। কোন্নগরের জমিদার পরিবার ঘোষাল বংশের কিংবদন্তি অনুসারে, পূর্বতন জমিদারেরা স্বপ্নে দুর্গাপুজো করার আদেশ পেয়েছিলেন।
ঘোষালদের জমিদারি শুরু হয়েছিল ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে। তখন থেকেই বাড়ির ঠাকুরদালানে তাঁরা প্রতিবছর দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছেন। আগে পুজোর দিনগুলিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেমন- গান, নাচ, যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো। একসময় উস্তাদ বুরদুল খাঁ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতন প্রথিতযশা শিল্পীরা এই বাড়িতে অনুষ্ঠান করে গিয়েছেন। সময় বদলেছে, মুছে গেছে জমিদারির চাকচিক্য, কিন্তু ঘোষালবাড়ির পুজোর রীতি বা আচার প্রায় একইরকম রয়েছে আজও।
পরিবারের ছোটো থেকে বড়ো, এই পুজোতে সবার ভূমিকা থাকে। ব্রিটিশ শাসনকালে তাঁরা পুজোর জন্য বিদেশ থেকে অনুদানও পেতেন। সেইসময়ে দাঁড়িয়ে সেই অনুদানের পরিমাণ ছিল ৭৫০ টাকা। পুজোর খরচের পর যেই টাকা বাঁচত, সেটা আবার ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেই রীতি এখনও পালিত হয়। আগে দশমীর দিন মাঝগঙ্গায় দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জন দেওয়া হতো। বিসর্জনের আগে একটা নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু একবার দশমীতে পরিবারের এক সদস্য বাঘের আক্রমণে মারা যাবার পর থেকে সকালবেলায় প্রতিমা বিসর্জন হয়।

পুজোর দিনগুলিতে প্রতিমাকে ঘরে বানানো নৈবেদ্য ভোগ আর মিষ্টি নিবেদন করা হয়। বাড়ির মহিলারা নারকেল আর গুড় সহযোগে নাড়ু তৈরি করেন। এই পুজোর আর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দশমীর দিন দেবীকে ভোগ হিসাবে ইলিশ মাছ দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের সিঁদুরখেলা এবং প্রতিমা বরণের পর ঠাকুর বিসর্জন দেওয়া হয়। বর্তমানে বাইরে থেকে শিল্পী নিয়ে এসে নাচ, গান, যাত্রাপালার আসর আর বসে না। তবে বাড়ির সদস্যরা নিজেরাই নাটক মঞ্চস্থ করেন। পরিবারের প্রায় সব সদস্যই তাতে অংশগ্রহণ করেন। জানা গেল, এবারও তেমনটাই হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধুমাত্র পুজোর আয়োজনই নয়, তাঁরা এখন ব্যস্ত রয়েছেন নাটকের রিহার্সাল নিয়েও।