পাহাড় হ্রদ অরণ্যের মিজোরাম। কম পর্যটক যান। এক বার গিয়ে দেখুন
পুজোর ছুটিতে নিরিবিলিতে কোথাও বেড়াতে চাই – এ প্রায় অসম্ভব দাবি। পাহাড় জঙ্গল যেখানেই যাও –‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’। হঠাৎই মনে হল মিজোরামের কথা। কিন্তু,লালডেঙ্গার দেশে নাকি শান্তি নেই, উগ্রপন্থীদের ঝামেলা? দ্বিধা নিয়ে গেলাম একদিন ‘মিজোরাম হাউস’। তারাও বিস্মিত মিজোরাম বেড়াতে যাবার প্রস্তাবে। আইজল ছাড়া অন্য কোনও স্থানের কথা তারাও জানে না। তবে, কর্মীরা আশ্বস্ত করলেন – খুব শান্তিপূর্ণ জায়গা মিজোরাম, আর অতি দ্রুত ব্যবস্থা করে দিলেন Inner-line-permit এর। পরে দেখলাম আইজল বিমানবন্দরে নেমেও করা যেত।
আমাদের প্রথম গন্তব্যস্থল রেইক(Reiek)। আইজল শহর ছাড়িয়ে যেতে হবে আরও ৩০ কিমি। সেদিন ছিল রবিবার, সব মানুষ চার্চমুখী – একটিও দোকান খোলা পাইনি।
রেইকের(জেলা মামিট) উচ্চতা পাঁচ হাজার ফিটের কিছু বেশি। ঘন সবুজ বনাঞ্চলে ঘেরা পথ, মাঝে মাঝে ঝরনা – নীল আকাশ আর প্রান্তরের সবুজ মিশে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। পথে পড়ল মিজোরামের প্রধান নদী Tiawng। রেইকের সরকারি ট্যুরিস্ট রিসর্টে পৌঁছাতে বিকেল গড়াল। ছোট্ট রিসর্ট, সাকুল্যে বোধহয় তিনজোড়া কটেজ। শান্ত আরণ্যক পরিবেশ, রেইকে বেড়াতে আসার সবচেয়ে ভাল সময় এপ্রিল মাস –এখানে তখন এদের প্রিয় ফুলের নামে হয় আন্তুরিয়াম উৎসব। এই উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য দেশজ শিল্প-সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। মেলায় নানা জনজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা আসে তাদের তৈরি সামগ্রী নিয়ে। ৭ দিন ধরে চলে তাদের নিজস্ব লোকগীতি ও নৃত্য। এখনও পথের পাশে বাঁধা মাচা যেন গত উৎসবে পশরা নিয়ে আসা নানা জনজাতির কথা বলে।
রিসর্টের পাশেই পর্যটন বিভাগের গড়া মিজোদের আদি গ্রাম ও তাদের প্রাচীন জীবনযাত্রার নানা উপকরণের নমুনা। সাথে আছে দুই-একটি আধুনিক বাড়িও, পার্থক্যটা সহজেই চোখে পড়ে।
মুইফাং(Hmuifang)- মিজোরামের অন্যতম জনপ্রিয় পার্বত্য শহর।
রেইক থেকে আইজল হয়ে যেতে হবে মুইফাং, আইজল শহর থেকে দূরত্ব ৫০কিমি। সবুজ গালিচায় মোড়া প্রশস্ত উঁচুনিচু প্রান্তরে মুইফাং-এর সরকারি রিসর্ট, পাহাড় দিয়ে ঘেরা, পাহাড়ের অরণ্যের অনেকাংশেই মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি এখনও। কাঁচে ঘেরা ছোট ছোট কটেজ, রিসর্টের ঘর থেকে চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়ের কোলে মেঘের খেলা। মন্থর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল দূরে দূরে কিছু কিছু জনবসতি – কোথাও ঘরের সামনে গিটার নিয়ে বসে পড়েছে ছেলেমেয়েরা। ভিনদেশের লোক দেখে সবাই আলাপ জমাতে চায়, ভাষা সমস্যা থাকলেও চোখেমুখের আন্তরিকতা সেই সমস্যা মেটায়। এখানে আমাদের মেয়াদ একরাত্রি, কিন্তু ভবিষ্যতের পর্যটকদের বলে রাখি –অন্তত দু’রাত কাটান এইখানে।
মুইফাং থেকে চম্ফাই। রাস্তায় পড়ল থানজোয়াল(Thanzowal)- মিজো বয়নশিল্পর কেন্দ্র। ঘরে ঘরে তাঁতে বোনা হচ্ছে উজ্জ্বল রং-এর মিজো পোশাক, চাদর, ব্যাগ – রং-এর সমাহার দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। এখান থেকে ৬কিলোমিটার দূরে ভেন্টাং(Ventwang) জলপ্রপাত। মিজোরামের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত, এক পাহাড়ের মাথা থেকে দেখছি আরেক পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে তার দাপট।
কাছেই আছে আরেকটি জলপ্রপাত-তুইরিহিয়ান(Tuirihian)। ভেন্টাং-এর তুলনায় অনেক ছোট, কিন্তু একেবারে পাশে বসে দেখা যায়- এ যেন অনেক আপন।
চম্ফাই শহর জেলা সদর। সীমান্ত ঘেঁসা, মায়নামারের পাহাড় দিয়ে ঘেরা এক উপত্যকা। মিজোরামের সর্বাধিক সমতল ভূমি এই উপত্যকাতেই আছে। প্রধানত ধানচাষ হয়, সমস্ত মিজোরামে চালের যোগান দেয় এই চম্ফাই। মিজোদের প্রধান খাদ্য, অন্য পূর্ব ভারতীয় রাজ্যদের মত, ভাত। আর হয় আঙুর, চম্ফাইর winery বিখ্যাত। সকালে রওনা হয়ে এখানে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল। চমৎকার ট্যুরিস্ট কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় নীল পাহাড়ে ঘেরা ধূধূ ধানের ক্ষেত। এখান থেকে যাওয়া যায় মায়নামারের রি ডিল(Rih dil)। Dil কথার অর্থ মিজো ভাষায় হ্রদ। এই হ্রদটি মায়নামারে হলেও একে বলা হয় মিজোরামের বৃহত্তম প্রাকৃতিক হ্রদ। বুঝলাম রাষ্ট্রনেতাদের ইচ্ছে যেমনই হোক, সাধারণ মানুষের কাছ এই হ্রদ এখনও মিজোরামেরই অঙ্গ। এদের কাছে এই হ্রদ অত্যন্ত পবিত্র- কারণ পুণ্যাত্মাদের স্বর্গে যাওয়ার পথ নাকি এইটি। চম্ফাই থেকে ২৭ কিমি দূরে সীমান্ত গ্রাম Zokhawthar, সেখান থেকে ৩ কিমি দূরে সেই হ্রদ-মায়নামারের রিখাদ্বার(Rihkhadwar) গ্রামে। মাঝে বয়ে চলেছে নদী। সীমান্তে কড়াকড়ি নেই।
রি ডিল-এর গল্প শোনাল আমাদের গাড়ির চালক – রি ও তার ছোট্ট বোন থাকত বাবা ও সৎমায়ের সাথে। অত্যাচারী সৎ মায়ের পরামর্শে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার ছলে বনে গিয়ে বাবা হত্যা করেন ছোট মেয়েকে। বনে ছোট বোনের রক্তাক্ত দেহ দেখে রি-এর কান্না আর বাঁধ মানেনা। ‘লিসি’ নামের এক পবিত্র আত্মার তাকে দেখে মায়া হয়। তিনি সন্ধান দেন এক গাছের যার পাতার সাহায্যে রি তার বোনের প্রাণ ফেরায়। তারপর বোন যখন তৃষ্ণায় ছটফট করে, তখন কোথাও জল না পেয়ে রি ওই পাতার সাহায্যে নিজেকেই হ্রদে পরিণত করে। এর থেকেই তৈরি হয় রি ডিল।
আইজলে ফেরার পালা।পথে থামলাম আরেক জায়গায় – সাইতুল (Saitul),উদ্দেশ্য এক, দীর্ঘ পথযাত্রা কমানো এবং দুই, সাইতুলের কাছেই আছে মিজোরামের আরেকটি হ্রদ Tamdil, সেটা দেখা। সাইতুল থেকে ৭কিমি দূরে অরণ্যে ঘেরা ছোট্ট হ্রদ –Tamdil। হ্রদের পাশেই পর্যটন বিভাগের অতিথিনিবাস।‘টাম’ হল মিজোভাষায় সরষেগাছ। তারও গল্প আছে। সেটা ওখানে গিয়ে শুনুন। সাইতুল থেকে ফের আইজল, ঘন্টা তিনেকের পথ।