পূর্ববঙ্গীয় রীতি মেনে পূজিত হন দেবী
দক্ষিণ কলকাতার অন্তর্গত গড়িয়া, বিধানপল্লীর চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গাপুজো প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো৷ তবে এই পরিবারিক পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশভাগের ইতিহাস৷ বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালি গ্রামেই ছিল চক্রবর্তীদের আদি নিবাস৷ প্রথমে তাঁরা কলকাতার ভবানীপুরে উঠে আসেন৷ সেখানে দু’বছর সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালিত হয়৷ পরবর্তীতে সেখান থেকে গড়িয়ার বিধানপল্লীতে এসে স্থায়ী বাসিন্দা হন ৺কালীপদ চক্রবর্তী ও ৺তারাপদ চক্রবর্তী৷ গড়িয়ার বিধানপল্লীর বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন ঘটে ১৯৫০ সালে ৺কালীপদ চক্রবর্তীর হাত ধরে ৷ ৺কালীপদ চক্রবর্তীর তিন পুত্র ৺শ্যামাপদ চক্রবর্তী, ৺দেবীপদ চক্রবর্তী ও ৺রমাপদ চক্রবর্তী৷ এই তিনপুত্রের উত্তরসূরীরাই বর্তমানে যৌথভাবে প্রাচীন দুর্গাপূজাকে বয়ে নিয়ে চলছেন।
চক্রবর্তী বাড়ির পুজোয় বিশেষত্ব হল গণেশ থাকেন দক্ষিণহস্তে অর্থাৎ সরস্বতীর পাশে এবং লক্ষ্মীর পাশে থাকেন কার্তিক। এই নিয়ম পূর্ববঙ্গীয় রীতি মেনেই চলে আসছে।


চক্রবর্তী বাড়ির উঠোনে পুজোর দিনগুলিতে আয়োজন করা হয় নৃত্য-গীতের আসর, আগমনী-বিজয়া বন্দনা, নিত্যভোগ বিতরণ ইত্যাদি৷ প্রতিবছর বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, কাঠামো পুজোর পরে শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ৷ বংশানুক্রমিক এবং পরম্পরা মেনে স্থানীয় ব্রহ্মপুরের স্বর্গীয় তারাপদ পালের পুত্র গুরুপদ পাল পিতার দেখানো পথে, নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে চক্রবর্তী পরিবারের দেবী প্রতিমা এবং তাঁর সাজসজ্জা নির্মাণ করেন৷ চক্রবর্তী বাড়ির পুজোয় বিশেষত্ব হল গণেশ থাকেন দক্ষিণহস্তে অর্থাৎ সরস্বতীর পাশে এবং লক্ষ্মীর পাশে থাকেন কার্তিক৷ এই নিয়ম পূর্ববঙ্গীয় রীতি মেনেই চলে আসছে৷ ষষ্ঠীর সায়াহ্নে ঠাকুরঘর সংলগ্ন উঠোনে বিল্ববৃক্ষ সহযোগে দেবীর বোধন, অধিবাস এবং আমন্ত্রণ পর্বের মধ্যদিয়ে দুর্গোৎসবের শুভ সূচনা হয়৷ কুলো পুরোহিতের বিধান ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকার মত অনুযায়ী প্রতিবছর এই নিয়ম নির্ঘন্ট পরিবর্তীত হয়৷ বোধনের দিন নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে দেবী দুর্গার পাশে স্থাপন করা হয়৷ এই সময়ে পারিবার সেবিত শালগ্রামদের দুর্গাদালানে নিয়ে আসা হয়, দশমী পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই পূজিতা হন৷ পূর্বে চক্রবর্তী পরিবারে বলিপ্রথা প্রচলিত থাকলেও, বর্তমানে ছাগবলির পরিবর্তে চালকুমড়ো, আঁখ, কলা বা শশা বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে৷ সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী তিথিতে যথাক্রমে দেবীকে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়৷ কলার বড়া মায়ের বিশেষ প্রিয়, তাই প্রতিদিনই মায়ের ভোগে কলার বড়া উৎসর্গ করা হয়৷


পুজোর দিনগুলিতে নৈবদ্য রূপে চালের চূড়া তৈরি করে থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয়৷ এছাড়াও অন্নভোগে থাকে ইলিশ সহ অন্যান্য মাছ ভাজা, নয় রকমের ভাজা, বড়া, মুগডাল, লাবড়া, ধোকার ডালনা, দই, মাখন, মিছরি, ছানার সন্দেশ, নারকেল নাড়ু, ক্ষীরের মিষ্টি, মালপোয়া, লুচি, সুজি এবং পরমান্ন৷ দশমীর দিন বিল্বপত্রে দুর্গানাম লিখে, দর্পণ বিসর্জনের পর দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শন করেন সপরিবার৷ বিদায়ের পূর্বে বরণডালা সাজিয়ে প্রশস্তি বন্দনার মধ্য দিয়ে কন্যারূপী উমাকে বরণ করে নেওয়া হয়৷ দেবীর পরনে সুসজ্জিত, অলংকৃত সোনার গয়না খুলে পরম যত্নে সংরক্ষণ করা হয় আগামী বছরের জন্য৷ অন্তিম সায়াহ্নে দেবী প্রতিমাকে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা কাঁধে করে রওনা হন নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে৷ এ বাড়িতে দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতে আবার শুরু হয় ব্যস্ততা। আবার নব উদ্যামে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা এবং দীপান্বিতা অমাবস্যায় শক্তি আরাধনায় মেতে ওঠে গড়িয়ার চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যরা।
_______________
বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যবৃন্দ।