ঘটনার উল্টোপিঠটা কি আমরা জানি?
বিগত কয়েক দশক ধরে শিক্ষা-সংস্কৃতি-আন্দোলনে পথ দেখিয়েছে দেশের অন্যতম অগ্রণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায়ই খবরের শিরোনামে উঠে আসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। কখনও বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার জন্য আবার, কখনও বিলুপ্ত ভাষা সংরক্ষণের নয়া উদ্যোগের জন্য। পশ্চিমবাংলার এই বিশ্ববিদ্যালয় যে বরাবরই ব্যতিক্রমী, তা আরও একবার প্রমাণিত হল দিন দুয়েক আগে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রূপান্তরকামীদের জন্যে আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থার দাবিতে অনেকদিন ধরেই লড়ছিলেন এখানকার বেশ কিছু পড়ুয়া। সেই লড়াইয়ের প্রথম স্বীকৃতি এল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের পক্ষ থেকে। আমরা জানতে পারলাম, ইংরেজি বিভাগে গত সোমবার একটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শৌচালয় (Gender-neutral Toilet) পড়ুয়া-গবেষকদের জন্যে খুলে দেওয়া হয়েছে। ছেলে, মেয়ে, রূপান্তরকামী-প্রত্যেক লিঙ্গ পরিচিতির মানুষই যা ব্যবহার করতে পারবেন।
দুদিন আগে যখন অফিশিয়ালি ঘোষিত হল ইংরেজি বিভাগ এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারপর অনেক পড়ুয়াকেই নাকি ওই শৌচালয় ব্যবহার করতে গিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। কারণ, শৌচালয়ের বাইরে ঝুলছিল তালা। অনেকেই নিজেদের সোশাল মিডিয়ায় ঘটনাটি নিয়ে সরব হয়েছেন। এরপর গতকাল, ৩১ মে সন্ধ্যেবেলা, যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হলাম, কলা বিভাগের ওই বিল্ডিং-এ ‘জেন্ডার নিউট্রাল টয়লেট’ বা ওই জাতীয় কিছু লেখা কোনও শৌচালয় চোখে পড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র-সংগঠনকে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা বলেন, লিঙ্গ নিরপেক্ষ শৌচালয়টি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে আছে।
তাঁদের কথা মতো, পিজি আর্টস বিল্ডিংয়ের নিচের তলায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ঢোকার ঠিক আগেই ডানদিকে চোখে পড়লো একটি শৌচালয়। যার দরজায় একটি সাদা কাগজে লেখা আছে ‘জেন্ডার নিউট্রাল ওয়াশরুম’। এ বিষয়ে যখন বিদু চন্দের সঙ্গে কথা বললাম, তিনি জানালেন, “ইংরেজি বিভাগই প্রথম এই স্বীকৃতিটা দিল, সেটা যেমন ভালো ব্যাপার, অন্যদিকে, ওই বিভাগের তরফে যে শৌচালয়টি করা হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভুল বার্তা রটানো হচ্ছে। যেটা একেবারেই কাম্য নয়। আমি কলকাতার বাইরে আছি, তাই ঠিক কী কারণে সমস্যা দেখা দিয়েছে এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।”
বিদুর বক্তব্য থেকেই জানা গেল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শৌচালয়ের দাবিটা অনেকদিনের। ২০১৬ সাল থেকেই বিভিন্ন আন্দোলনে, স্টুডেন্ট কমিউনিটিতে এই দাবি উঠে আসে। বিশেষত, ২০১৮-তে যখন ৩৭৭ ধারা বৈধ করে আইন পাশ হল, তখন বিষয়টা আরও জোরালো হয়, ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয় কর্তৃপক্ষকে।
ইংরেজি বিভাগ থেকে যে শৌচালয়টা করা হয়েছে সেটা আসলে স্টাফ-টয়লেট। সেটাকেই অফিশিয়ালি ‘জেন্ডার নিউট্রাল টয়লেট’-এর স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগে, যখন এই দাবি উঠেছিল তখন থেকেই এই টয়লেট লিঙ্গ-নিরপেক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হত। এবং তখন থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতোবিরোধ দেখা যায় পড়ুয়াদের মধ্যে। কারো কারো দাবি, ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শৌচালয় করতে হবে। এ নিয়ে একাধিকবার ডেপুটেশনও দেওয়া হয়েছিল ওই বিভাগের পড়ুয়াদের তরফে।
এসব চলতে চলতে কোভিড আসে, লকডাউন হয়ে যায়। সব আবার স্বাভাবিক হওয়ার পর, হচ্ছে-হবে এই করতে করতে হঠাৎই এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ইমন কল্যাণ লাহিড়ীর কাছে এই জেন্ডার নিউট্রাল টয়লেটের ব্যাপারটা নতুন করে উত্থাপন করেন বিদু। তিনি আগ্রহের সঙ্গে বিষয়টা শোনেন। কিন্তু, এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমতি লাগবে ইত্যাদি ভেবে ইমন কল্যানবাবু সেসময় কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সময় চেয়েছিলেন। পরে, ৩০ তারিখ যখন ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিজেই এই উদ্যোগ নিলেন, আর দেরি করেননি তিনি। তাঁর সিদ্ধান্তেই অফিসিয়ালি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করা হয় পিজি আর্টস বিল্ডিং-এর নিচের তলার একটি শৌচালয়কে।
পিজি আর্টস বিল্ডিংয়ের নিচের তলায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ঢোকার ঠিক আগেই ডানদিকে চোখে পড়লো একটি শৌচালয়। যার দরজায় একটি সাদা কাগজে লেখা আছে ‘জেন্ডার নিউট্রাল ওয়াশরুম’। এ বিষয়ে যখন বিদু চন্দের সঙ্গে কথা বললাম, তিনি জানালেন, “ইংরেজি বিভাগই প্রথম এই স্বীকৃতিটা দিল, সেটা যেমন ভালো ব্যাপার, অন্যদিকে, ওই বিভাগের তরফে যে শৌচালয়টি করা হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
বিদু বলেন, “আমাদের বিভাগে অবশ্য এ নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। আমাদের বিভাগের, পিজি আর্টস বিল্ডিং-এর প্রথম তলায় আগে থেকেই লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শৌচালয় ছিল। সেটাও ছিল স্টাফদের। আলাদা করে ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোনও লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শৌচালয় ছিল না। এবার সেটা করা হল নিচের তলায়। আর আমাদের বিল্ডিং-এর একেবারে উপর তলায় শুধুমাত্র লাইব্রেরি আছে, সেখানে একটাই শৌচালয়। এই শৌচালয়টিও লিঙ্গ নিরপেক্ষ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। আমাদের বিভাগীয় প্রধান বলেছেন সেটাও অফিসিয়ালি জেন্ডার-নিউট্রাল করে দেওয়া হবে। স্থায়ী সাইনবোর্ড লাগানোর ব্যবস্থাও করা হবে। এবং ভবিষ্যতে যাতে বিশেষ ভাবে সক্ষমরা পড়ুয়ারাও এই শৌচালয়গুলি ব্যবহার করতে পারে, সেদিকটা নিয়েও আলাদা করে ভাবা হচ্ছে।”
পরিশেষে, বিদু আমাদের আশার কথা শোনালেন ঠিকই কিন্তু, যা বোঝা গেল, সমস্যা একটা থেকেই গেছে। যেকোনও বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে, সমস্যা আসেই। তা কাটিয়ে উঠতে হয়। আমরাও আশাবাদী যতই সমস্যা আসুক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যে উদাহরণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা যেন সঠিক ভাবে বাস্তবায়িত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো যেন আরও মজবুত হয়। ও হ্যাঁ, আর একটা কথা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এহেন সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসার পর, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বক্তব্যও নজর কেড়েছে। একটি জৈনক সংবাদপত্রকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁদের ক্যাম্পাসে এখন অনেক রূপান্তরকামী পড়ুয়া রয়েছেন। মেন বিল্ডিংয়ের একটি শৌচালয়কে কর্তৃপক্ষ জেন্ডার নিউট্রাল বলে দাবি করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আক্ষেপ, ক্যাম্পাসে এ নিয়ে কোনও প্রচার নেই। অনেকেই ওই শৌচালয়ের কথা জানেনও না। এতদিন তো এই অবস্থাই ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁরা এতদিনে স্বীকৃতি দিতে পেরেছেন যখন, আশা করাই যায় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও এ নিয়ে যত্ন সহকারে ভাববে।
_______________
ছবি নিজস্ব