‘প্রোফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো’– ভালো ছবি হলেও উপসংহার নিয়ে খেদ থেকেই যায়

শেষ দৃশ্যে বদলে গেল সত্যজিতের দর্শন

‘প্রোফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো’ ছবিটি নিয়ে বাঙালির প্রত্যাশা আর আশঙ্কা, দুইই ছিল বিরাট মাপের। পরিচালক সন্দীপ রায় আমাদের হতাশ করেননি, মূল কাহিনীকে প্রায় অবিকৃতভাবে তিনি তুলে এনেছেন পর্দায়। আর সত্যজিতের গল্পের প্রতি এই মূলানুগত্যই, এ ছবির মূল প্লাস পয়েন্ট হয়ে উঠেছে।

শঙ্কু নিয়ে বাংলায় এই প্রথম ছবি, তাই ভূমিকা হিসাবে প্রথম শঙ্কু-কাহিনী ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’-র সূচনাংশটি পরিচালক তুলে এনেছেন পর্দায়। সেখানে আমরা দেখছি তারক চাটুজ্যে জনৈক তরুণ লেখকের হাতে তুলে দিচ্ছেন সুন্দরবনে উল্কার গর্তের মধ্যে পাওয়া একটি ডায়রি। সে ডায়রির লেখক স্বয়ং প্রোফেসর শঙ্কু, সে ডায়রির লেখা নিয়ত রং বদলায়-– কখনো কালো, কখনো সবুজ, আবার পরক্ষণেই বেগুনি। উৎসাহী তরুণ ডায়রিটি সাগ্রহে পড়তে আরম্ভ করেন, আর প্রোফেসর শঙ্কুর জবানির মাধ্যমেই আমরা মূল কাহিনীতে প্রবেশ করি। 

আগেই বলেছি, এ ছবিতে মূল গল্পকে প্রায় হুবহু অনুসরণ করা হয়েছে। তবে, পরিচালক পিরিয়ড পিস বানাতে চাননি, তাই ১৩৮৭ বঙ্গাব্দে পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় প্রথম প্রকাশিত গল্পটিকে তিনি হাল আমলের মানানসই করে তোলার জন্য অল্প কিছু নতুন উপাদান যোগ করেছেন। তার মধ্যে আছে শঙ্কুর নিজস্ব কিছু আবিষ্কার– ভিডিও কলিং-এর জন্য একটি অভিনব যন্ত্র, অত্যাধুনিক চলভাষ এবং নার্ভ চাঙ্গা রাখার বড়ি। ছবিতে দেখানো ডায়েরি ২০১৬ সালের, তাই গল্পের পটভূমিকেও আধুনিক পৃথিবীতে আনতে হয়েছে, নকুড়বাবুর হাতে দিতে হয়েছে একখানি মোবাইল ফোন। কুশলী পরিচালক সেটিকে স্মার্টফোন না দেখিয়ে, পুরনো মডেলের ফোন হিসাবে দেখিয়েছেন, যা নকুড়বাবুর চরিত্রের সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়েছে। শঙ্কুর অ্যানাইহিলিন পিস্তলের কেরামতি দেখানোর জন্য পরিচালক মিস্টার লোবোর উপরে মাকড়সার বদলে চিতাবাঘের আক্রমণ শানানো দেখিয়েছেন, যে চিতাবাঘটি লোবোকে ছুঁতে পারার আগেই শঙ্কুর অ্যানাইহিলিনের মহিমায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে! এবং, একবার ব্লুমগার্টেন আর একবার হাইটরের ক্ষত অতি অল্প সময়ে নিরাময় করেছেন শঙ্কু–- আমরা দেখেছি মিরাকিউরল ম্যাজিক! 

তবে, গিরিডির বাড়িতে শঙ্কুর প্রিয় যন্ত্রমানব রোবুকে যখন একঝলক দেখানো হলই, তাকে ওইরকম নট-নড়নচড়ন অবস্থায় বসিয়ে রাখার বদলে, একটু সক্রিয় দেখালে আমরা দর্শকেরা আরও একটু আনন্দ পেতাম!

শঙ্কুর ভূমিকায় ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় অনবদ্য। দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ানো পোড় খাওয়া প্রাজ্ঞ বৈজ্ঞানিকের ভূমিকাটি তিনি দক্ষ হাতে সামলেছেন। সেইসঙ্গে, পোষা বিড়াল নিউটনকে কোলে নিয়ে ঈষৎ ভুঁড়ি-ওয়ালা শঙ্কু নিশ্চিন্ত মনে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন-– মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই দৃশ্যটি তাঁকে আমাদের কাছের মানুষ করে তুলেছে। ব্লুমগার্টেনের সঙ্গে আলাপচারিতার সময়ে তাঁর আত্মসংযম, অনুতপ্ত লোবোর প্রতি তাঁর সহৃদয় করুণা, কিংবা যে কোনও বিপদের মূহূর্তে ঠাণ্ডা মাথায় তাঁর তৎপরতা-– সবকিছু মিলিয়েই, শঙ্কু চরিত্রটিকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ধৃতিমান। আমরা তাঁকে আবার, এই চরিত্রে দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

পার্শ্বচরিত্রদের সকলেই নিজ নিজ ভূমিকায় যথাযথ। তবে, নকুড়চন্দ্র বিশ্বাসের ভূমিকায় শুভাশীষ মুখোপাধ্যায় অবশ্যই বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। অতি সাধারণ গড়পরতা বাঙালি নকুড়বাবু– তিনি গোলাতেঁতুলের আচার খান, কাজ-চালানো গোছের ইংরেজি কোনোক্রমে বলতে পারেন, বিদেশ যাওয়ার সময়ে সাহেবি কোটপ্যান্ট জোগাড় করলেও চেক-কাটা লাল গামছাটি সুটকেসে ভরতে ভোলেন না। তিনি যে বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিকের যোগ্য পার্শ্বচর হয়ে উঠলেন, সে কি কেবল হঠাৎ পেয়ে যাওয়া কতকগুলো অতিমানবিক ক্ষমতার জোরে? নাহ, তাঁর নীতিবোধ, শঙ্কুর প্রতি তাঁর আনুগত্য, তাঁর আশ্চর্য উপস্থিত বুদ্ধি- এই সবকিছুর জন্যই তিনি পাঠক তথা দর্শকের ভালোবাসা আদায় করে নেন। জাত-অভিনেতা শুভাশীষ—এই ছবিতেও তাঁর অভিনয় অনবদ্য। প্রথম বিদেশের রাস্তায় গাড়ি চড়ে ঘুরতে পেরে একজন আমবাঙালির সহর্ষ বিস্ময় আমরা তাঁর অভিব্যক্তিতে দেখেছি, তাঁকে দেখেছি বিলাসবহুল হোটেলের সোফার গায়ে হাত বুলিয়ে ‘স্বপ্ন না সত্যি’ পরখ করতে, এবং, মুগ্ধ হয়েছি। 

আর এইখানেই, পরিচালকের সঙ্গে একটু মতান্তর ঘনিয়ে উঠেছে আমাদের। ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে, উড়োজাহাজে করে ফেরার সময় শঙ্কুর বন্ধুরা নকুড়বাবুর চোখ দিয়ে দেখতে চাইলেন স্বর্ণ-শহর এল ডোরাডোর অলীকদৃশ্য, তখন নকুড়বাবুকে থামিয়ে দিয়ে শঙ্কু নিজেই তাঁদের দেখালেন কল্পনার এল ডোরাডো। কারণ, শঙ্কুর দেওয়া নার্ভের ওষুধ খেয়েই নাকি নকুড়বাবুর ক্ষমতাবৃদ্ধি ঘটেছে। এই ব্যাপারটি মনে হয়, আরেকটু বিবেচনা করে দেখা যেত। শঙ্কুই যে এই গল্পের নায়ক, তাতে তো আমাদের কারোরই কোনও সন্দেহ নেই! তাঁকে এইভাবে “নকুড়বাবুর চেয়েও বড়ো” প্রমাণ করাটা খুব একটা দরকার ছিল না! 

আমরা অপেক্ষায় থাকলাম। অপেক্ষায় থাকলাম আরও সংহত ও সুন্দর আরেকটি শঙ্কু-চলচ্চিত্রের জন্য। 

Developed by DXDasia