মালদা জেলায় নির্মিত ছোটো ছবি পৌঁছে গেল ল্যাটিন আমেরিকায়

ব্রতশ্রী ভট্টাচার্যের প্রথম ছোটো ছবি ‘বেগুনি ফুল’

ভাই-বোনের ভালোবাসা এই পৃথিবীতে চিরন্তন। শিল্পের মাধ্যমে এই ভালোবাসা বিশ্বজনীন করে গেছেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়। ‘পথের পাঁচালি’-র অপু-দুর্গা মাঠের আল আর কাশবন পেরিয়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন দেখতে। এই দৃশ্য বিশ্ব চলচ্চিত্রে অমোঘ হয়ে আছে। বাংলা ছবিতে এরকম দৃশ্য বিরল হলেও ভাই-বোনের ভালোবাসা আরও বহু ছবিতে উঠে এসেছে। কিন্তু এই সম্পর্ক নিয়ে এত কথা বলার কারণ খুব সম্প্রতি দেখা গেল ‘বেগুনি ফুল’ নামক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি। সেখানেও ভাই-বোনের সম্পর্ককে নিপুণভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

ছবির একটি দৃশ্য

বেগুনি ফুল আসলে এই ছবিতে সংকেত হিসেবে কাজ করেছে। একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে বড়ো হওয়া দুটি ছেলে-মেয়ে একে অপরকে জড়িয়ে বাঁচতে চায়। ভাই হাঁটুতে চোট পেলে যেমন দিদির চিন্তা বেড়ে যায় এবং মা কী বলবে – সারাক্ষণ সেইসব মাথায় চলতে থাকে; ঠিক তেমন আবার মেলায় যখন দিদির হাতের চুড়ি পছন্দ হয়, তখন তা না কিনে মায়ের জন্য সে একটা চা-ছাঁকনি জোগাড় করে ফ্যালে। পুকুরে ফুটে থাকা বেগুনি ফুল নিয়ে ভাই বায়না করলে দিদি তাকে কথা দেয়, এই ফুল একদিন ঠিক এনে দেবে। এনে দেয়ও। কিন্তু এর মাঝে বয়ে গেছে অঘটন আর অনেকটা ঝড়ঝাপটা। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বেগুনি ফুল। তার জন্য দর্শকদের দেখতে হবে এই ছবি।

ছবির একটি দৃশ্য

‘বেগুনি ফুল’ ছবির পরিচালক ব্রতশ্রী ভট্টাচার্য। এটিই তাঁর প্রথম কাজ। ভালোবাসার জায়গা সাহিত্যচর্চা এবং লেখালেখি। এই ছবির গল্পটি তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার একটি সাহিত্য গ্রুপে পোস্ট করেন। সেখানে প্রবল জনপ্রিয়তা পায় এই গল্প। ব্রতশ্রীর স্বামী কৌশিক ভট্টাচার্য তখন মালদা জেলার ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত। সেই সূত্রে ব্রতশ্রী মালদাতেই ছিলেন। সেখানে মালদা কলেজে একটি শর্টফিল্মের সেমিনারে প্রথম আলাপ হয় কিছু সিনেমাপাগল ছেলে-মেয়ের সঙ্গে। পরবর্তীতে ব্রতশ্রী তাঁর ‘বেগুনি ফুল’ গল্পটিকে চলচ্চিত্রের মোড়কে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। পাশে পেয়েছিলেন মালদার বিভিন্ন থিয়েটার দলকে। এই ছবির প্রত্যেক অভিনেতাকেই তিনি বেছে নিয়েছেন থিয়েটার দল থেকে। 

শিশু অভিনেতাদের দৃশ্য বোঝাচ্ছেন পরিচালক

ব্রতশ্রী ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “সকল অভিনেতারই এটা প্রথম কাজ। আর আমারও পরিচালক হিসেবে প্রথম কাজ। সেই অর্থে আমরা সবাই শিখতে শিখতে একটা পরিবার হয়ে গিয়েছিলাম। সহকারী পরিচালক অনামিক সাহা আমাকে শুরু থেকেই খুব সাহায্য করেছেন। এই ছবির মধ্যে হয়তো কোনও সামাজিক বার্তা নেই। কিন্তু একটা চিরন্তন ভালোবাসা আছে। আমার প্রথম ছবি এমনই করতে চেয়েছিলাম।”

বেগুনি ফুল

এই ছবির সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে মালদার আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট। সেই কারণেই প্রাণ পেয়েছে প্রত্যেকটি চরিত্র। অভিনেতারা (আনন্দী সেনগুপ্ত, শ্রয়ণ রহমান, শুভদীপ চক্রবর্তী, মাসুমা পারভিন) প্রত্যেকেই যথাযথ কাজ করেছেন। ছবিতে খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে ভাই-বোনের ভালোবাসা, মায়া, মনখারাপ, পিছুটান। তবে ‘বেগুনি ফুল’ ছবির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল আবহ সংগীত। পুরো ছবিটি দেখার পর একটা রেশ থেকে যায় দর্শকমনে। আবহ নির্মাতা অনিন্দ্য ভট্টাচার্যকে কুর্নিশ।

ছবির পরিচালক ব্রতশ্রী ভট্টাচার্য

আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে বেশ প্রশংসিত হয়েছে ‘বেগুনি ফুল’। ল্যাটিন আমেরিকা শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফার্স্ট ডিআইএফএফ ফিল্ম ফেস্ট, ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল আর্টিফ্যাক্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ইন্ডিয়ান গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে কলকাতা শর্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে।

Developed by DXDasia