মালাবতী চালের খিচুড়ি কিংবা ঝিঙাশাল চালের পিঠে : সুন্দরবনে দেশি ধানের বীজ বাঁচিয়ে রাখার উৎসব

দক্ষিণ সুন্দরবন সুস্থায়ী কৃষি ও কৃষক সমবায়ের উদ্যোগ

করসংক্রান্তি এলেই পিঠে পুলির হিড়িক। বাড়ির কর্তার বাজারে নতুন চালের খোঁজ, গিন্নি বলে দিয়েছেন নতুন চাল দিয়েই পিঠে হবে। সেই চাল কিনে ভাঙিয়ে গুঁড়ো করে তৈরি হবে পিঠে। কিন্তু মুশকিল হল কর্তামশাই তো জানেন না নতুন চাল কীভাবে চিনতে হয়! কোন চালে পিঠে হয় সেই জ্ঞানও নেই। ফলে কর্তামশাই বাজারে যা পান তাই কিনে, গুঁড়ো করে বগলদাবা করে নিয়ে চলে আসেন। পিঠে বানানো হয় বটে, তবে সেই স্বাদ আর মেলে না। (দক্ষিণ সুন্দরবন সুস্থায়ী কৃষি ও কৃষক সমবায়)

শুধু কি স্বাদ? খাদ্যগুণ? বাজারে ছেয়ে আছে নানান জেনেটিকালি মডিফায়েড বীজ। শুধু ধান নয়, শাকসবজি ফল সবকিছুতে তার প্রভাব। সঙ্গে রাসায়নিক সার বিষের প্রভাব তো আছেই। কিন্তু কথায় যে বলে বিন্নি ধানের খই কিংবা শালিধানের চিড়া। কিন্তু কোথায় শালিধান? কোথায়ই বা বিন্নি? সবই ছিল। সবই আছে, কিন্তু আমাদের গতির সঙ্গে চলতে থাকা এই ছুটন্ত জীবনে আমরা যেমন ভাবে নিজেদের শিকড় থেকে অনেক অনেকটা পথ ছেড়ে এসেছি, ফেলে এসেছি আমাদের দেশজ সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আমাদের নিজস্ব বীজকে। (দক্ষিণ সুন্দরবন সুস্থায়ী কৃষি ও কৃষক সমবায়)

নীলাঞ্জন মিশ্র বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমাদের মাথায় নানান ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে – দেশি ধানের ফলন কম হয়। আর সেই সুযোগে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নানান High-yielding বীজ বা Genetically Modified বীজ, নানান ক্ষতিকর রাসায়নিক।”

সেই কথাই বারবার বলে চলেছেন সুন্দরবনের ভূমিপুত্র ও গবেষক নীলাঞ্জন মিশ্র। পাথরপ্রতিমার নীলাঞ্জন কয়েক বছর ধরে নানান মাধ্যমে, কখনও তা নানান সংবাদপত্র, কখনও সমাজমাধ্যমে বারবার নিজ লেখনীর মাধ্যমে মানুষকে এই ছোট্ট বিষয়টুকুতে সচেতন করে চলেছেন যে যদি সুস্থভাবে বাঁচতে হয়, যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে হয়, যদি নীরোগ একটি সমাজ ভবিষ্যতের জন্য রেখে যেতে হয় তাহলে দেশজ শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশজ বীজকে আপন করে নিতেই হবে। (দক্ষিণ সুন্দরবন সুস্থায়ী কৃষি ও কৃষক সমবায়)

তবে নীলাঞ্জনের এই উদ্যোগ শুধু সমাজ মাধ্যমের বিপ্লব হয়েই থেমে থাকেনি। নিজের জন্মভূমিতে, নিজের কর্মভূমিতে নীলাঞ্জন তাঁর অঞ্চলের অসংখ্য কৃষককে জড়ো করে তৈরি করেছেন, দক্ষিণ সুন্দরবন সুস্থায়ী কৃষি ও কৃষক সমবায়। নীলাঞ্জন মিশ্র বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমাদের মাথায় নানান ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে – দেশি ধানের ফলন কম হয়। আর সেই সুযোগে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নানান High-yielding বীজ বা Genetically Modified বীজ, নানান ক্ষতিকর রাসায়নিক, কিন্তু দক্ষিণ সুন্দরবন কৃষক সমবায়ের কৃষকেরা প্রমাণ করে দিয়েছে যে এই ধারণা ভুল।” (দক্ষিণ সুন্দরবন সুস্থায়ী কৃষি ও কৃষক সমবায়)

তাদের অনেকেই নিজের জমিতে দেশি বীজ চাষ করে রীতিমতো ভালো মানের ধান শুধু তৈরিই করেননি, সেই ধানের চাল বাজারে এনে বাকি ধানের সঙ্গে রীতিমতো টেক্কা দিতে শুরু করেছে। সমবায়ের এই কর্মকাণ্ড, সাফল্য ও আগামী দিনের আশু কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা করতে সুন্দরবনের বুধাখালি গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনগর শ্রীনাথগ্রাম বাণী বিদ্যাপীঠ স্কুলে গত ১১ জানুয়ারি আয়োজিত হয় এক অভূতপূর্ব উৎসব ও আলোচনাসভা: কৃষকের শরীর, কৃষকের মন। যেকোনো সভ্যতার মূল ভিত্তি হল তাঁরাই, যাঁরা খাদ্যের উৎপাদন করেন, অর্থাৎ কৃষক। সেই কৃষক কেমন আছেন, তাদের বক্তব্য কী, কীভাবে তাঁরা দেশীয় ফসল চাষ করছেন এই সব কিছু নিয়ে আলোচনা হয় যা শুনতে ও কৃষকদের সঙ্গে নিজের মনের কথা ভাগ করে নিতে আসেন কলকাতা শহরের নানান পেশার, নানান বয়সের মানুষ। নীলাঞ্জনদের এই উদ্যোগে ক্ষণিকের জন্য গ্রাম-শহর যেন এক ছাতায় মিলেমিশে যায়। আর এই মিলেমিশে যাওয়ার মধ্যে থেকে যায় শহরের মানুষের জন্য এক বিস্ময়। যে শহর মানুষকে শুধু ছুটে চলতে শিখিয়েছে, একের থেকে অন্যকে বিচ্ছিন্ন হতে শিখিয়েছে সেই শহরও কোথাও যেন অবাক হয়ে উপলব্ধি করে রসনা কতখানি তৃপ্ত হয় যদি দেশি মালাবতী চালের খিচুড়ি খাওয়া যায় কিংবা ঝিঙাশাল চালের পিঠে।

নীলাঞ্জনের কথায়, “এখন ঘরে ঘরে নানান রোগ। খুব কম বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে ক্যান্সার নেই, কোলেস্টেরলের সমস্যা নেই, কোনো জটিল রোগ নেই। অথচ বছর কুড়ি আগেও তো এমন ছিল না” অর্থাৎ আমাদের খাদ্য তালিকায় এমন বিষাক্ত জিনিস জায়গা নিতে শুরু করেছে এবং আমরাও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে তাকে আপন করতে শুরু করেছি যে আমরা বুঝেও উঠতে পারিনি আমরা আধুনিক হতে গিয়ে ঠিক কতটা ‘ভালো থাকা’ হারিয়েছি।

আলোচনা সভার শুরু হয় সোমশুভ্র সাহু, নমিতা ঘোড়ই, মাধবী জানা, সোমা সামন্ত, দীপালি, মামণি রাজদের মতো কৃষক ও সংগঠকদের বক্তব্য দিয়ে। তাঁদের দীপ্ত কণ্ঠে উঠে আসে নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক ও জলবায়ুগত সমস্যা, প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁদের লড়াইয়ের কথা। পরীক্ষানিরীক্ষা ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে দেশি ধানের বীজ বুনে ভালো ফলন তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আর তার জন্য কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রয়োজনও হয়নি তাঁদের। পাশাপাশি তাঁরা রক্ষা করছেন খামার ও আশপাশের জীববৈচিত্র্য, জল, মাটি ও বাতাস যেগুলি না ঠিক থাকলে চাষবাসই উঠে যাবে।

অনুষ্ঠানের চারদিকে ছিল নানান পোস্টার ও প্রদর্শনীর আয়োজন। যে প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে নানান দেশি ধানের সমাহার। একই সঙ্গে উঠে এসেছে রংবেরঙের হরেক রকমের পিঠে পুলি। সবকটাই দেশি ধানের চালে। তার রং রূপ গন্ধ মনোমুগ্ধকর। ঝিঙাশাল, চামরমণি, গোবিন্দভোগ, দুধের সর চালের গুড়পিঠা, পুরপিঠা, সরুচাকলি, চিতই, পাটিসাপটা, পালং গাজরের পিঠা, কদমপুলি। সবই সমবায়ের কৃষাণীরা তাদের নিজস্ব দেশীয়, চাল, গুড়, সবজি ব্যবহার করে বানিয়েছেন। 

আর সেই প্রদর্শনীর মাঝে জায়গা পেয়েছে গোটা কৃষি ব্যবস্থার প্রাণ, মধ্যমণি – পরাগমিলনকারীরা। নীলাঞ্জনের কথায়, “পরাগমিলনকারীদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মৌমাছি। কিন্তু আমরা মানুষেরা শুধুমাত্র এই সমস্ত মৌমাছিদের নিয়ে মাথা ঘামায় যারা মধু দেয়। কিন্তু এর বাইরে ও অসংখ্য মৌমাছি আছে যারা মাটির তলায় বাস করে”। যেহেতু তাদের দিয়ে মানুষের মধু, মোম, পরাগের ব্যবসা হয় না তাই জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় তারা সেভাবে জায়গা করে উঠতে পারে না। নীলাঞ্জন তাই চেষ্টা করেছেন সেই সমস্ত প্রাণকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের সবার গুরুত্ব এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরতে।

এ কথা খুবই সত্য যে মানুষ নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মনে করে এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেই সে গোটা পৃথিবীকে দেখে। সে আদতে বুঝেই ওঠে না যে পিঁপড়ে বা মথ বা বাদুড় তার খাদ্যতালিকায় সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও তাদের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে, পরাগমিলন বা বীজ ছড়িয়ে গাছেদের বিস্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতরণ করে এই গোটা প্রাণ প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে, বলা বাহুল্য মানুষের অস্তিত্বকেও টিকিয়ে রাখে। 

বাংলার কৃষি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল মহিলারা। তাদের হাত ধরেই বাংলার ফসলের জন্ম হয়। প্রসঙ্গত, এই সমবায়তেও কৃষক হিসাবে মহিলাদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো।

প্রদর্শনীতে ছিল সুন্দরবনের সাহিত্য। মূলত যারা চাষ করেন, মাছ ধরেন সেইরকম মানুষেরা সুন্দরবনে বসে যা লেখেন সুন্দরী ও দোখনো ভাষায়৷ সেইসব লেখা। তাদের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস। সুন্দরবন মানে শুধু বাঘ-কুমির নয়। সেখানে অনেক মানুষ থাকে। তারা সুন্দরবন সম্পর্কে লেখে তাদের ভাবনা। সুন্দরবনের ভালোমন্দ সম্পর্কে তাদের ভাষ্য, আলোচনা, সমালোচনা, ভাবনা, যন্ত্রণা, ভালোবাসা সব লেখা থাকে এই সাহিত্যে। সুন্দরবনের নবান্ন সুন্দরবনের সাহিত্য ছাড়া অপূর্ণ। 

আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী ভবতোষ সুতার, যিনি বিগত দুর্গাপুজোতে এই একই ভাবনা নিয়ে একটি ইনস্টলেশন বানিয়েছিলেন টালা প্রত্যয়ে – যার নাম ছিল ‘বীজাঙ্গন’, অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে তিনিও একই বার্তা দিলেন এবং ভাগ করে নিলেন বীজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, অস্তিত্ব ও ইতিহাস কীভাবে কালের সঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে। আর সেই বীজ আর বীজের রাজনীতি, খাদ্য সংকট ও খাদ্যের উদ্বৃত্ত হওয়ার রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন শিক্ষক, থিয়েটার ও খাদ্যসুরক্ষা আন্দোলন কর্মী অংশুমান দাশ।

প্রকৃতি মানেই নারীত্ব। পৃথিবীতে সমস্ত সৃষ্টিশীলতার মধ্যেই থাকে নারীত্ব। অদ্ভুতভাবে বাংলার কৃষি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল মহিলারা। তাদের হাত ধরেই বাংলার ফসলের জন্ম হয়। প্রসঙ্গত, এই সমবায়তেও কৃষক হিসাবে মহিলাদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়, যিনি বাংলার হারিয়ে যাওয়া গান – যে গানের প্রতিটি লাইনে ধরা পড়ে বাংলার সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা ভূমির কথা, বাংলার শাকসবজির কথা ও একইসঙ্গে বাংলার মেয়েদের কথা। সেই গান ও গানের কথা শুনিয়ে গবেষক বারবার বুঝিয়ে দিলেন কালের বিবর্তনে আমরা যত এগিয়েছি, সভ্য হওয়ার নামে, উন্নত হওয়ার নামে ঠিক যতটা শহুরে হয়েছি ঠিক ততখানি আমরা নিজেদের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। 

যে সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল কৃষিকাজ। আজ আমরা মন্দির আর মসজিদ কোথায় বানাবো তাই নিয়ে তর্কে মেতেছি অথচ জানিই না কোন ধানের চালে পায়েস বানাতে হয়, কবে নবান্ন হয় কিংবা নলসংক্রান্তিতে কী কী আচার পালন করতে হয়। এই বিচ্ছিন্নতা কোনো সুস্থ লক্ষণ নয়, যা নীলাঞ্জন বারবার নিজের আলোচনায় তুলে এনেছেন। এতদিনে আমরা নিজেরাও বুঝে গিয়েছি যে জলবায়ু পরিবর্তন নামে যে ভয়ঙ্কর দানবের জন্ম আমরাই দিয়েছি তার হাত থেকে নিস্তার আর নেই, তার হাতে আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। নীলাঞ্জন, সোমশুভ্র, মানসী, শ্রীনাথদের এই চেষ্টা সেই সময়কে খানিক বাড়ানোর, যাতে নতুন প্রজন্মকে আরেকটু বেশি সময়ের জন্য এই সুন্দর পৃথিবী দেখানো যায়।

Developed by DXDasia