“সমস্ত ফেলুদা প্রেমীদের” উৎসর্গীকৃত এই বই
টানটান সাসপেন্সের মুহূর্তে সোনালি মরুভূমির বুক চিরে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ছুটে আসছে ট্রেন আর কয়েক সেকেন্ড পরের দৃশ্যেই সেই ট্রেনকে সাদা রুমাল দেখিয়ে থামানোর চেষ্টা করছেন উটে সওয়ার গোয়েন্দা ফেলুদা, সঙ্গে অন্য উটগুলোর একটায় আছেন তাঁর সহকারী, সম্পর্কে খুড়তুতো ভাই তোপসে আর একটায় বন্ধু লালমোহন বাবু ওরফে জটায়ু।
সিনেমাপ্রেমী, বিশেষত রহস্য রোমাঞ্চকর সিনেমাপ্রেমী বাঙালিকে বলে দিতে হয় না এই দৃশ্য কোন ছায়াছবির। আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতক আগে বড়োদিনের ছুটিতে বাঙালি কিশোর কিশোরীরা পর্দার ভূতের রাজার জনকের কাছ থেকে উপহার পেলো তাদের মনের মতো ছবি ‘সোনার কেল্লা’। বলা বাহুল্য, শুধু কৈশোর না, সোনার কেল্লা আট থেকে আশি সব বয়সী বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমাপ্রেমী বাঙালির উপযোগী ছবি।

‘তোপসে’ সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং ‘ফেলুদা’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই সোনার কেল্লা দুই মলাটে আগে প্রকাশিত হলেও বড়োপর্দায় প্রথম মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর। সেই প্রথম বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে সিনেমাহলের পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠলো স্মার্ট গোয়েন্দা ফেলুদা, তাঁর সহকারী তোপসে আর রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস লেখক জটায়ু। বলা বাহুল্য, এই ত্রয়ী চরিত্র চিরচিহ্ন রেখে গেলো বাঙালির সাংস্কৃতিক মননে।
পাঠভবনের ক্লাস এইটের ছাত্র সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে সর্বজনীন ‘তোপসে’ হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনির পাশাপাশি কথায়, ছবিতে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় তারকা অভিনেতাদের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা।
শুধু চরিত্র নয়, ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ু চরিত্রের প্রথম চরিত্রাভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং সন্তোষ দত্তের অভিনয় মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের চণ্ডীপাঠের মতোই গেঁথে গেছে মানুষের মনে। সেই প্রভাবে স্বয়ং সত্যজিৎ রায় পরবর্তীকালে ফেলুদার ছবি এঁকেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আদলে। এমনকি সন্তোষ দত্ত-র প্রয়াণের পর আর ফেলুদা সিরিজের কোনো ছবি তৈরিও করেননি তিনি। তবে তাঁর পরবর্তীকালে ফেলুদার গল্প নিয়ে আরও অনেক ছবি তৈরি হয়েছে, আর অনেক অভিনেতাই এই ত্রয়ী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবু ১৯৭৪ সালে পর্দায় আসা ত্রয়ী অভিনেতাদের প্রতি দর্শকের ভালোবাসা আজও অটুট।

সোনার কেল্লা-র প্রথম টিজার পোস্টার
এই ভালোবাসার টানেই পর্দায় ‘সোনার কেল্লা’ মুক্তির সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে পত্রভারতী থেকে প্রকাশিত হলো সোনার কেল্লার তোপসে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়-এর কলমে তাঁর স্মৃতিকথার বই — ফেলুদার প্রথম তোপসে। পাঠভবনের ক্লাস এইটের ছাত্র সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে সর্বজনীন ‘তোপসে’ হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনির পাশাপাশি কথায়, ছবিতে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় তারকা অভিনেতাদের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা।
তোপসের ভূমিকায় অভিনয় করার এতবছর পর নিজস্ব ব্যবসা সামলে আরও অন্য অনেক ছবিতে অভিনয় করেও কেন তোপসে চরিত্রে অভিনয়ের স্মৃতি নিয়ে বই লেখার কথা ভাবলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গদর্শন.কম-কে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, “অন্যান্য অনেক ছবি করলেও মানুষ আজও আমাকে তোপসে হিসেবেই মনে রেখেছেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বারবার সাক্ষাৎকারও দিয়েছি। তবে অভিজ্ঞতারও তো অনেকগুলো দিক আছে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রফেশনাল অভিজ্ঞতা, ডিরেকশনাল অভিজ্ঞতা কোন দিক বলবো? তাছাড়াও স্টার অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাগুলোকে (যদিও আমার জন্য কখনও তিনি স্টার নন, তিনি আমার কাছে সৌমিত্র কাকু) এক জায়গায় এনে ভাবলাম দু-মলাটে বন্দি করি। এই চিন্তাভাবনা থেকেই লকডাউনে ঘরে থাকার সময় হাতে কিছুটা সময় পেয়ে লিখে ফেললাম এই বইটা।”

সোনার কেল্লা-য় তোপসে
“সমস্ত ফেলুদা প্রেমীদের” হাতে উৎসর্গীকৃত বইয়ের ভূমিকায় সন্দীপ রায় লিখেছেন তাঁর স্ত্রীর ফোনে সিদ্ধার্থবাবুর ফোন নম্বর সেভ করা আছে ‘তোপসে অরিজিনাল’ নামে। সত্যজিৎ পুত্র এবং পুত্রবধূর এই স্বীকৃতিই বুঝিয়ে দেয় বইটির নামকরণের সার্থকতা। প্রকাশক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “সোনার কেল্লার পঞ্চাশ বছর-এ ফেলুদা প্রেমী পাঠকদের জন্য এই উপহার আনতে আমরা আগ্রহী ছিলাম। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ শেষ হয়ে তৃতীয় মুদ্রণের কাজ শুরু হওয়া থেকেই বোঝা যাচ্ছে বইটির জনপ্রিয়তা কতটা!”
‘তোপসে অরিজিনাল’ লিখছেন, “জয়শলমিরের এই কেল্লাটা ছিল পরিত্যক্ত। সাধারণ মানুষ জানতই না। আজ কত পর্যটক যান! একটা রাজ্যের পর্যটন শিল্প অর্থনীতি চাঙ্গা করে দিয়েছে এই ছবি।”
যে ছবির পঞ্চাশ বছরে পাঠকরা এই বই উপহার পেলেন সেই ছবি সম্পর্কে ‘তোপসে অরিজিনাল’ লিখছেন, “একটা কাল্ট ছবি তৈরি হল ‘সোনার কেল্লা’। এতটাই স্মার্ট সে ছবি, আজও দেখলে নতুন মনে হয়। বারবার দেখা যায়।” তিনি আরও লিখেছেন, “জয়শলমিরের এই কেল্লাটা ছিল পরিত্যক্ত। সাধারণ মানুষ জানতই না। আজ কত পর্যটক যান! একটা রাজ্যের পর্যটন শিল্প অর্থনীতি চাঙ্গা করে দিয়েছে এই ছবি।”

ফেলুদার প্রথম তোপসে : লেখকের সঙ্গে প্রতিবেদক
১৯৭৪-২০২৪ এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে দুনিয়া বদলে গেছে অনেকটাই। ইন্টারনেটের দৌলতে বাঙালি হয়েছে বিশ্ব নাগরিক। বড়োপর্দা, টেলিভিশন ছাড়াও ওটিটিতে এখন হাতের মুঠোফোনেও মুক্তি পায় ছবি। আর সেখানে বিভিন্ন রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির রূদ্ধশ্বাস দৃশ্যায়নের ভিড়। তবু আজও বহু মানুষের মুঠোফোনে সোনার কেল্লার থিম মিউজিকের সুর মনে করিয়ে দেয় ফেলুদার পর্দায় আত্মপ্রকাশ প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছালেও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতটুকু। তাই ছোটো, বড়ো বিভিন্ন পর্দায় আবির্ভূত ফেলুদা আজও তোপসে, জটায়ুকে সঙ্গী করে দুষ্টু লোকেদের হাত থেকে মুকুলকে উদ্ধার করে পৌঁছে দেয় বাড়ির ঠিকানায়। আর পর্দার বাইরে মুকুলের ‘তোপসেদা’ কলম হাতে স্মৃতিতে ডুব দিয়ে মণি মাণিক্য খুঁজে এনে তুলে দেন ফেলুদা প্রেমীদের হাতে।
___
বইয়ের প্রচ্ছদ ও অন্যান্য পাতার ছবি সৌজন্যে: ফেলুদার প্রথম তোপসে/ পত্রভারতী || প্রাপ্তিস্থান: পত্রভারতী ও অনলাইন বুক স্টোরগুলি