ইংলিশ চ্যানেল জয়ই প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় সায়নীকে
সপ্তসিন্ধু জয়ের পথে আর মাত্র কয়েক ধাপ বাকি। ইংলিশ চ্যানেল (English Channe) ও ক্যাটলিনা চ্যানেল জয়ের পর এবার মার্কিন মুলুকের মালোকাই চ্যানেল (Molokai Channel) জয় করে নজির সৃষ্টি করলেন তিনি। ছোট বয়স থেকে বাবা রাধেশ্যাম দাসের হাত ধরে সাঁতারে হাতে খড়ি হয়েছিল তাঁর। তার পর থেকে কঠিন অনুশীলনের মাধ্যমে পূর্ব বর্ধমানের (Purba Barddhaman) কালনা (Kalna) শহরের সায়নী দাস (Sayani Das) আজকে ‘বাংলার মুখ’।
বঙ্গদর্শনের প্রতিনিধি কঙ্কনা মুখার্জীর সঙ্গে টেলিফোনে আড্ডা জমল সায়নীর। জানা গেল, নানান অজানা কথা। সেই সৎ, সাহসী, জেদি সায়নী দাসের জার্নি নিয়েই রইল সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার।
কঙ্কনা – সাঁতারু (Swimmer) হিসেবে তো এখন বাঙালির মুখে একাটাই নাম, সেটা সায়নী দাস। কিন্তু আমি প্রথমেই জানতে চাইবো বর্ধমান-কালনার মেয়ে সায়নী দাস, এই পরিচয়টা আপনার কাছে কীরকম ছিল?
সায়নী – ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের একজন মেয়ে বলতে যা বোঝেন, একেবারেই তাই। খুবই সাধারণভাবে বড়ো হওয়া। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত সংসারের সবরকম টানাপোড়েনের গল্প আমাদের জীবনেও ছিল। তবে খেলাধুলার বিষয়ে অবশ্য আমার একটা বাড়তি সুবিধা ছিল। আমার বাবা, কাকা, ঠাকুরদা সবাই অ্যাথলেটিক্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমার বাবা নিজেই অ্যাথলেটিক্স ক্যাম্প চালাতেন। প্রচুর ছেলেমেয়ে বাবার কাছে কোচিং নিতো। তাই আমার আজকাল পিছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এইসবটা আমি খানিক সঙ্গে নিয়েই জন্মেছিলাম।

কঙ্কনা – সাঁতার নিয়েই যে জীবনটা বাঁচবেন এরকমটা ঠিক করলেন কবে থেকে?
সায়নী – খেলাধুলা নিয়ে ভাবনা একেবারেই ছোটো থেকে। আমি ৭ বছর বয়সে প্রথম সাঁতার শিখতে শুরু করি। নিজেকে বারবার মিলিয়ে ফেলতে পারি মতি নন্দীর ‘কোনি’ চরিত্রের সঙ্গে। আমার জীবনে আমার বাবাই ক্ষিতীষ সিংহ। একটু জলের জন্য বাবাকে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। বাবা এবং পরিবার পাশে না থাকলে আমার আজকের জার্নিটা এতটা সহজ হতো না। ২০০৫ সালে আমাদের কালনায় প্রথম সুইমিং পুল তৈরি হলে সেখানেই সাঁতার শেখার শুরু। তারপর একে একে গঙ্গাবক্ষে জয়ের শিরোপা, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
কঙ্কনা – এখন তো পরিচিত নাম সায়নী দাস, কিন্তু যেসময়ে পরিচিত ছিলেন না সেই সময়ে আপনার পরিবার অথবা বন্ধুদের অবদান কতটা ছিল, যদি বলেন..
সায়নী – আমার স্কুল, কলেজ সবাই সবসময় পাশে ছিল। উপস্থিতির হার কিংবা সিলেবাসের গড়পড়তা চাপের মুখে সেভাবে পড়তে হয়নি। তবে, ছোটোবেলায় যখন দেখতাম, পুজোর সময় বন্ধুরা আনন্দ করছে আর আমাকে সাঁতারের প্র্যাকটিস করতে হচ্ছে, খুব মন খারাপ হতো। কিন্তু এখন যখন দেখি আমি পুজোর মণ্ডপে ফিতে কাটছি আর আমার ওই বন্ধুদেরই কেউ কেউ আমার দিকে ফুল ছুড়ছে, তখন মনে হয় সেদিনের সবটুকু কষ্ট সার্থক।

কঙ্কনা – আপনি বললেন, ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সাঁতার আপনার বন্ধু ছিল। কিন্তু সাঁতারের জন্য কি পড়াশোনার সঙ্গে আপোষ করতে হয়েছে আপনাকে?
সায়নী – সত্যি বলছি, আমি মনে করি না কোনোকিছুর জন্য কোনোকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাঁতারের জন্য আমার পড়াশোনায় কোনোদিন ক্ষতি হয়নি। আমি একদিকে সাঁতারে একটা একটা করে হার্ডেল পার করেছি, অন্যদিকে একে একে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ইত্যাদি পরীক্ষা দিয়েছি। নম্বরে কোনোরকম প্রভাব পড়েনি। আমি ইতিহাস নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে এখন মাস্টার্স করছি ইগনু থেকে। ভবিষ্যতে রিসার্চ করার ইচ্ছে আছে আমার।
জীবনে অনেক বাধা আসবে, বারবার আমাদের পা চেপে ধরতে চাইবে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। নিজের আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে জয় আসবেই।
কঙ্কনা – ইংলিশ চ্যানেল জয়, তারপর রটনেস্ট ও ক্যাটলিনা চ্যানেল জয়, অতঃপর মালোকাই চ্যানেল জয়, ঝুলি ভর্তি সব মুকুট আপনার। কিন্তু কোন জয়টা আপনার কাছে সবথেকে স্মরণীয়?
সায়নী – সে তো অবশ্যই ইংলিশ চ্যানেল। প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বলে কথা। তাছাড়া বাঙালিদের কাছে ইংলিশ চ্যানেল নিয়ে উন্মাদনা সবসময়ই অনেক বেশি! আর সবথেকে বড়ো কথা হল, ইংলিশ চ্যানেল জয়ই আমায় প্রথম পরিচিত এনে দিয়েছিল।

কঙ্কনা – না এবার সেই প্রতীক্ষিত প্রশ্নটায় আসাই যাক। এশিয়া মহাদেশের প্রথম মহিলা সাঁতারু হিসাবে আপনার এ জয় আমাদের সকলের কাছেই খুবই গর্বের। যদি আপনি এবারের সফরের গল্পটা একটু শোনান।
সায়নী – এশিয়া মহাদেশের প্রথম মহিলা সাঁতারু হিসেবে স্বীকৃতি, এ তো সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি। তবে এবারের সফরে বারবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়েছে আমাদের। ২০২০ তে এই জার্নিটা করার কথা ছিল আমার, করোনার জন্য পিছিয়ে যায়। অবশেষে এবছর শুরু করলাম। সাঁতার চলাকালীন বোটের একটা ইঞ্জিন খারাপ ছিল, সেই নিয়েও যুদ্ধে নেমেছিলাম। মাঝপথে অন্য ইঞ্জিনটিও বিকল হয়ে যায়। আমি প্রায় পনেরো মিনিট জলে ভেসে ছিলাম। উল্টো স্রোতে সাঁতার কাটতে হয়েছিল, যা আমায় অনেকটা পিছিয়ে দেয়। কিন্তু জেদ একটুও কমেনি। লড়ে গেছি। নিজেকে বুঝিয়েছি, এটা ব্যক্তি সায়নীর লড়াই নয়, এটা দেশকে স্বীকৃতি এনে দেওয়ার লড়াই। অবশেষে যখন দেখতে পেলাম ফিনিশিং পয়েন্টে আমার মা ভারতের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তখন যেন নিমেষেই সব ক্লান্তির মুক্তি হল। সত্যি বলছি, নিজের দেশের পতাকা তুলে ধরার অনুভূতির সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। বিশ্বাস করুন, এখন এই কথা গুলো বলতে গিয়েও শিহরণ হচ্ছে।

কঙ্কনা – আধুনিকতার প্রভাবে চিত্রটা অনেকটা বদলালেও, এখনও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে মেয়ে হয়ে জন্মালে খেলাধুলা করতে দেয় না পরিবার। এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আপনার পরিবার অথবা সমাজ কতটা পাশে ছিল আপনার?
সায়নী – আমি তো আগেই বলেছি, আমার পরিবার ছোটো থেকেই আমার পাশে ছিল। তবে বাংলার কোণায় কোণায় প্রতিনিয়ত আজও মেয়েরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। স্বাধীনতার খোঁজ পেতে তাদের লড়াই করতে হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বীজ যে কতটা গভীরে তা বোধ হয় বাংলার ঘরে ঘরে উঁকি দিলেই জানা যায়। কিছু প্রতিবাদ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটা কতটা? সেটা কি সামগ্রিক চিত্রকে বদলাতে পারছে? না, পুরোপুরি পারছে না। তবে হ্যাঁ আশার কথা এটুকুই যে, সমাজ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমার বিশ্বাস, ভয়কে জয় করতে পারলে একদিন বিপ্লব আসবেই। আমাদেরই দায়িত্ব সেই দিনকে এগিয়ে নিয়ে আসা।
কঙ্কনা – সবশেষে যদি নতুন প্রজন্মের সাঁতারুদের উৎসাহ দিতে কিছু বলেন…
সায়নী – আমি শুধু খেলোয়াড়দের উদ্যেশে নয়, সব মহিলাদের উদ্দেশ্যেই বলবো। জীবনে অনেক বাধা আসবে, বারবার আমাদের পা চেপে ধরতে চাইবে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। নিজের আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে জয় আসবেই। আসতে বাধ্য।