‘আঁচল’ পেতে মানুষকে ভালোবাসা শেখাচ্ছে মেমারির তরুণ প্রজন্ম

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে ক্রাউড ফান্ডিং- এইভাবেই টাকা জমাচ্ছেন তাঁরা

চেনা শহর-মফস্‌সল-গ্রাম সব একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে মানুষ-পরিবার-বিচ্ছেদের সমীকরণ। মানসিকতাও বদলাচ্ছে ক্রমশ। পরিস্থিতি বদলালেও কিছু মানুষ তাঁদের যাপনে খুঁজে নিতে চান নতুন কিছু। এই একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তির উপায়। চেনা ছক থেকে সম্পূর্ণ বাইরে আসার চেষ্টা। এমনই কিছু চিন্তাভাবনা চলছিল কয়েকজন তরুণের ভিতর। অর্ক পাল, সুমনা সরকার, শর্মিষ্ঠা নায়েক, অনীশা হালদার, শেখ সাজাহান, বুবাই চক্রবর্তী, সুদীপ্ত পোদ্দার- ‘আঁচল’ পেতে দিয়েছেন প্রত্যেকে। নিজেদের মতো করে মানুষদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করছেন কোনোরকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই। এখনও রেজিস্ট্রেশন নম্বরও পাননি। তাতে কী! নিজেদের অবাধ স্বাধীনতা আর কাজের অদম্য ইচ্ছে থাকলে সম্ভব হয়ে ওঠে অনেককিছুই। অর্ক পাল পেশায় ব্যবসায়ী। সেখান থেকে টাকা জমিয়ে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে ক্রাউড ফান্ডিং- আঁচলের জন্য এইভাবেই টাকা জমাচ্ছেন। অর্ক ছাড়াও টিমে রয়েছেন আরও ছয়-সাতজন। আঁচলের প্রত্যেক সদস্যের বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলার মেমারিতে। তাই কাজও শুরু হয়েছে মেমারির আশেপাশের এলাকা থেকেই।

গাছ লাগানো, দুঃস্থদের জন্য চিকিৎসা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা, রমজান মাসে মুসলিমদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের পড়াশোনা শেখানো- প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু কাজের মাধ্যমে নিজেদের যুক্ত রাখেন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস। একটি আসিবাসী গ্রামে পৌঁছে গেলেন প্রত্যেকে। গ্রামে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে যারা সই করতে পারেন না, তাদের সাক্ষরতা প্রদান, গ্রামের বাচ্চারা নিয়মিত স্কুলে যায় না, এমনকি জাতীয় সঙ্গীত ঠিকমতো গাইতে পারে না, তাদের জাতীয় সঙ্গীত শেখানো, গ্রামের ঋতুমতী মেয়েদের ন্যাপকিনের ব্যবহার শেখানো- এইভাবেই শুরু হয়েছিল আঁচলের পথ চলা। খুব সম্প্রতি মেমারির বেশ কয়েকটি এলাকায় বৃক্ষরোপণ শুরু করেছেন। পাশে পেয়েছেন এলাকার মানুষদেরও। বেল, সবেদা, লিচু, জাম, বকুল, পেয়ারা, নিম, চালতা, আমড়া, আমলকি, কাঁঠাল, আতা এইসব গাছ বসানো হয়েছে মেমারি হাসপাতালের পিছনে। সদস্যরা বলছেন শুধুমাত্র গাছগুলি বসালেই হবে না, “গাছেদের যত্ন নিলে তারা আপনার যত্ন নেবে। তাই পাশে থাকবেন এবং মানবতায় বিশ্বাস রাখবেন।”

অর্ক পাল বঙ্গদর্শনকে জানাচ্ছেন, “আমাদের অনেকগুলি প্রকল্প চিন্তা-ভাবনার স্তরে রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি স্বনির্ভরগোষ্ঠী তৈরি করা। তাছাড়া গাছ লাগালেই শুধু হবে না। সেগুলিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় তার জন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে। একটা গাছ যখন আমরা লাগিয়ে আসছি তারপর সেটা কিন্তু সেখানকার মানুষদেরই দেখ্‌ভাল করতে হবে। মানুষকে সচেতন করার জন্য কিছু ব্যানার তৈরি করা হয়েছে। দরজায় দরজায় গিয়ে বিভিন্ন লিফলেট দেওয়া হচ্ছে। ওই সমস্ত এলাকার অনেকেই আছেন যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন না। এরফলে হয়ত অনেককিছু জানতে পারেন না। তাদেরকেও যাতে আমরা সচেতন করতে পারি, তরুণ প্রজন্মকে আরও কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারি সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।” গাছে গাছে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি স্লোগান, “গাছ আমাদের জন্য ছিল/ আমরা গাছের জন্য কই/ আসুন আজ সবাই মিলে/ গাছের নতুন বন্ধু হই”। এখন যখন ভারতবর্ষের বহু শহরে বড়ো বড়ো ফ্ল্যাট বা রাস্তা তৈরি করার জন্য অসংখ্য গাছ কেটে দেওয়া হচ্ছে, তখন আঁচলের বন্ধুদের এই দায়িত্ববান কাজ ইতিবাচক এবং ইঙ্গিতবহ বৈকি। এটাই তাঁদের প্রতিবাদ। বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষদের শিক্ষা দান তাঁদের নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করেন। এমনকি দুঃস্থ কারোর বাড়িতে কেউ মারা গেলে শ্রাদ্ধে চাল, ডাল, ফল হাতে তুলে দেন অর্করা।

সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে অর্কদের মতো হয়ত অনেকেই আছেন। নিজেদের উদ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের হয়ে কথা বলার লোক চিরকালই কম। কিন্তু এটা হার নয়। বরং সমাজের মূল স্রোতের বাইরে বেরিয়ে কীভাবে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায় আর কীভাবে ভালোবাসা যায়, তার একটা অন্যরকম সংজ্ঞা দিতে চাইছেন আঁচলের সদস্যরা। এইভাবে, ঠিক এইভাবেই মানুষ মানুষের পাশে থাক। শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো বহুকাল আগেই বলে গেছেন, “মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও,/ মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও,/ মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।/…এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও।”

Developed by DXDasia