
‘স্যাগিটারিয়াস এ-স্টার’-এর নতুন বাংলা নাম ‘গভীর মল্লিকা’
‘গভীর মল্লিকা’! হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যে এই নামেও পরিচিত হবে মহাবিশ্বের ‘স্যাগিটারিয়াস এ-স্টার’ (Sagittarius A*) নামের বিশাল ব্ল্যাকহোলটি। কেবল আমাদের ডাকাডাকিতে নয়, বিশ্বের অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীই হয়তো স্বীকৃতি দেবেন এই নতুন নামটিকে। শুনে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সত্যিই এমন সম্ভাবনার জন্ম দিতে পেরেছেন এক বঙ্গসন্তান। নাম, শংকর লাহিড়ী।
আশির দশকের কবি শংকর লাহিড়ী পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। তবে, সাহিত্য-জগতেও তিনি বেশ পরিচিত নাম। দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ‘কৌরব’ পত্রিকার সঙ্গে। এঁকেছেন বেশ কিছু প্রচ্ছদও। মহাকাশ তাঁর অন্যতম প্রিয় চর্চার বিষয়। এই সৌরজগত যে গ্যালাক্সির ভিতরে একচিলতে হয়ে রয়েছে, তার নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা ‘আকাশগঙ্গা’ ছায়াপথ। এরই কেন্দ্রে রয়েছে ‘স্যাগিটারিয়াস এ-স্টার’ নামের সেই বিশাল কৃষ্ণগহ্বর। কয়েক দিন আগে শংকর লাহিড়ী এই কৃষ্ণগহ্বরের নামকরণ করেন– ‘গভীর মল্লিকা’।
শংকরবাবু জানিয়েছেন, ‘গভীর মল্লিকা’ শব্দবন্ধটি তিনি পেয়েছিলেন শূন্য দশকের বাঙালি কবি অরিত্র সান্যালের একটি কবিতায়। নিজের ফেসবুক ওয়ালে ‘স্যাগিটারিয়াস এ-স্টার’-এর এই নতুন নামটি পোস্ট করার পরেই তা নিয়ে বিপুল আলোড়ন পড়ে যায়। এ দেশের সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ এই প্রথম। পোস্টটি শেয়ার হয় বিদেশেও। এমনকি, ইতালিতে কবি পিনা পিকোলো তাঁদের ওয়েবসাইট ‘দা ড্রিমিং মেশিন’-এও শেয়ার করেন ‘গভীর মল্লিকা’ নামটি।
শংকর লাহিড়ী এরপরই চিঠি লেখেন ক্যালিফোর্নিয়ায় আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের (IAU : International Astronomical Union) বিভাগীয় প্রধান শ্রীমতী মারিয়ান-কে। উদ্দেশ্য, ‘স্যাগিটারিয়াস এ-স্টার’-এর এই নতুন নামকরণ সম্পর্কে বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলকে অবহিত করে রাখা। নিজের ফেসবুক ওয়ালে শংকরবাবু লিখেছেন, “আমার মনে হয়েছিল এটা পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলকে, বিশেষত: যাঁরা গভীর মহাকাশের গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, গ্যালাক্সি, নীহারিকা, নেবুলা, পালসার, ব্ল্যাকহোল ইত্যাদির নামকরণ করেন, তাঁদেরও জানিয়ে রাখা উচিত। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাভাষার সৃজনশীল অস্তিত্বকে বৃহৎবিশ্বের কাছে আরেকটু স্মরণীয় করে রাখা।”
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘে লেখা চিঠি ও তার উত্তর
সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ‘গভীর মল্লিকা’-নামের অর্থ ও উৎস। জানিয়েছিলেন, কবিদের প্রিয় সুগন্ধী এই ফুলের খোঁজ মেলে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও। কৃষ্ণগহ্বরের নতুন নামের প্রস্তাব পেয়ে দুদিন পরেই প্রত্যুত্তর দেন আইএইউ-এর বিভাগীয় প্রধান শ্রীমতি মারিয়ান। তিনি লেখেন, এই নতুন নামটি সম্পর্কে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি টেকনিকাল ম্যাগাজিনে পেপার লিখে সবাইকে জানাতে হবে। নামটি পছন্দ হলে, অন্যান্য অনেকেই এরপর ব্যবহার করা শুরু করবেন এই নাম। এছাড়া, নতুন নামকরণের আর কোনো নিয়মকানুন নেই বলেই চিঠিতে জানান Marion Schmitz। তিনি নিজেই অবশ্য উদ্যোগী হয়ে শংকরবাবুর চিঠিটি পাঠিয়ে দিয়েছেন বিভাগীয় অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছেও।
ভবিষ্যতে, ‘স্যাগিটারিয়াস এ-স্টার’ কৃষ্ণগহ্বরের নাম সারা দুনিয়ায় ‘গভীর মল্লিকা’ হবে কিনা, তা জানা নেই। কিন্তু, বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আলোচনায়, সেমিনারে একটি বাংলা নামকরণ নিয়েও যে চর্চা শুরু হবে, এটাই বা কম কী? বাংলা নাম নিয়ে আলোচনা মানে তো বাংলা ভাষাটি নিয়েও আলোচনা। শংকর লাহিড়ী তো এটাই চেয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছেপূরণ হয়ে গেছে। কিন্তু, এখন আমরা অপেক্ষায় বড়ো ইচ্ছেটি পূরণের জন্য, সেই দিনটির জন্য, ওই কৃষ্ণগহ্বরটিকে বিশ্বের অনেকেই যেদিন থেকে ‘গভীর মল্লিকা’ নামেই চিনবেন; অন্তত কবিরা।
