
আড়ংঘাটা গ্রামের খেটে-খাওয়া মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষকদের টাকায় তৈরি হচ্ছে ‘দুধপিঠের গাছ’
সম্ভবত, ২০১২ সালে প্রচেত গুপ্তের ছোটোগল্প ‘মিছিল’ প্রথম পড়ি। তারপর, আরো কয়েকবছর পরে চিত্রনাট্য তৈরি করে বিভিন্ন প্রযোজকের সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু, ওই যা হয় আর কী, নতুন পরিচালকদের সঙ্গে। সেভাবে কেউ আগ্রহ দেখালেন না। দু-একজন যদিও রাজী হয়েছিলেন, কিন্তু তাদের বায়নাক্কা মেটানো সম্ভব ছিল না। অবশেষে, প্রায় গল্পের ছলেই একদিন আমার এক পূর্ব পরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে এবিষয়ে আলোচনা করতে করতেই ভদ্রলোক ছবিটি প্রযোজনার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাশাপাশি আমরা দুজনেই যৌথভাবে ছবিটি পরিচালনা করি।
এই ‘মিছিল’ ছবিটি করতে গিয়েই বেশ কিছু প্রশ্ন আমার মধ্যে তৈরি হয়। সে এক অস্থির সময়। কিছু ভাবনা আমাকে কুরে-কুরে খাচ্ছিল। এর পর কী হবে? নতুন পরিচালক, নতুন প্রযোজক, বাজেটও কম। এ ছবি কি মানুষের কাছে সেভাবে পৌঁছাবে? হয়তো কিছুদিন কয়েকটা প্রেক্ষাগৃহে চলবে, কয়েকটি ফেস্টিভ্যাল ঘুরে কিছু লতাপাতা লাগানো ছবি পোস্টারে দেখা যাবে। কিন্তু তারপর? আবার পরের ছবির জন্য আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে প্রযোজক খুঁজতে। আবারো হয়তো একই ঘটনা ঘটবে। এভাবে কতদিন? আর, যেভাবে এক এক করে সিনেমাহলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাতে বিপদ আরো বাড়ছে। সিনেমা শুধু শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। মফঃস্বলে এখনো হাতে গোনা যে ক’টা সিনেমাহল রয়েছে, কয়েকবছর পরে হয়তো তাও থাকবে না। মানুষকে তখন সিনেমাহলে বসে ছবি দেখার কথা ভাবতে হলেও ছুটতে হবে শহরে। এবং, সেক্ষেত্রে খরচও কিছু কম হবে না। এই সমস্ত ভাবনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।

একজন পরিচালক হিসেবে আমি অবশ্যই চাই, আমার ছবি বহু মানুষ দেখুক, বিভিন্ন দেশে আমার ছবি দেখানো হোক, পুরস্কার জিতুক। কিন্তু, এসবের থেকেও আমার কাছে বেশি গুরুত্ব আমার রাজ্যের, আমার দেশের। আমি যে ভাষায় কথা বলি, আমার সংস্কৃতি, আমার রাজনৈতিক চেতনা, মূল্যবোধ, আমার দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, আমার যাপন– এই বিষয়গুলোই তো স্থান পাবে আমার ছবিতে। আমি চাইব আমার রাজ্য বা দেশের মানুষ আমার ছবি দেখুক। নিজেদের মতন বিচার করুক। শুধু শহরের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ নয়, জেলার মানুষরাও দেখুক। আমরা বড্ড বেশি শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের সমস্যা নিয়ে ছবি বানালেও, গ্রামের দর্শকদের সে ছবি দেখানোর কথা ভাবি না। কিছু মাল্টিপ্লেক্স আমাদের ভরসা।
কিছু ছবি তৈরি হচ্ছে পুরস্কারের জন্য, আর কিছু ছবি বাণিজ্যিক কারণে। আর ভালো ছবিগুলোর ক্ষেত্রে আবার খরচের টাকা তোলার একমাত্র ভরসা শহর বা সদর শহরগুলোর হাতে গোনা কিছু প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু, বাকি এলাকা, গ্রামগুলো? তারা ভালো ছবি দেখা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
এইরকম বেশ কিছু এলোমেলো ভাবনা থেকেই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের কথা মাথায় আসে। কিন্তু ক্রাউড ফান্ডিং তো আমাদের দেশে নতুন নয়। বেশ কিছু ছবি হয়েছে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে। তবে, ক্রাউড ফান্ডিং এমন এক বিষয় যেখানে একটি ছবির শুরু থেকেই দর্শকদের ইনভলভমেন্ট থাকে সরাসরি। একজন দর্শক ছবিটির শুটিং শুরুর আগেই যদি মিনিমাম তার টিকিটের টাকাটুকুও ইনভেস্ট করে, তাহলেই সে অপেক্ষা করে থাকবে ছবিটি দেখার জন্য। পরিচালকের দায়বদ্ধতাও সেক্ষত্রে অনেক বেড়ে যায়। কারণ সেখানে বাণিজ্য নয়, ছবির বক্তব্যই প্রধান। অন্যের টাকা ফেরত দেওয়া এবং যথেষ্ট মুনাফা লাভের আশায় আকারণে একটি কুরুচিকর, অবাস্তব ভিডিও তৈরির চাপটা আর থাকে না। আর, ছবি বাণিজ্যও করবে অবশ্যই। কারণ, একটি ছবির সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত। তাদের রুটি রুজি। কিন্তু, শুধু বাণিজ্যের কারণে ছবি বানানো নয়। এভাবে ভালো ছবি হতেও পারে না।
আরও পড়ুন
‘শেষের কবিতা’ কাট-টু ‘শেষের গল্প’
ঠিক করলাম ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমেই ছবি করব, কিন্তু অন্যভাবে। একটি গ্রাম থেকে ক্রাউড ফান্ডিং হবে। চলে গেলাম আমার গ্রামে। আমার জন্ম, আমার বেড়ে ওঠা। আড়ংঘাটা। প্রথমে বন্ধু মানবেন্দ্রর সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারপর, এক এক করে বেশ কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে।
বেশ কয়েকটি চিত্রনাট্য লেখা ছিল। ঠিক করলাম, ‘দুধপিঠের গাছ’ নিয়েই ছবি বানাব। বাজেট তৈরি করলাম। আনুমানিক ২৫ লক্ষ টাকা। বন্ধুরা এবং আমার নিকট-আত্মীয় ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু, মাত্র কয়েকজন ছাড়া সবাই বললেন, এত টাকা উঠবে কী করে? এভাবে রিস্ক নেওয়া ঠিক নয়। বোঝালাম, এতকিছু ভাবতে হবে না। তোমরা যে যা পারো কন্ট্রিবিউট করো। ছবি না বানাতে পারলে টাকা ফেরত দিয়ে দেব। কয়েকজন ব্যবসায়ী-বন্ধু অবশ্য এগিয়ে এসেছিলেন। ২০-২২ জন মিলে যদি ছবিটি বানানো যায়। আমি রাজি হইনি। কারণ, ২০ বা ২০০ নয়, আমার গ্রামে ২৭০০০ মানুষের বাস। আমি চাই, এই ছবির সঙ্গে প্রত্যেকটা মানুষ যুক্ত থাকুক। যার সামর্থ্য ও ইচ্ছে আছে সে বেশি কন্ট্রিবিউট করবে। যার দৈনিক আয় ২০০ টাকা, সে ১০ টাকা দেবে। আজ যদি আমরা এভাবে ছবি বানাতে পারি, ভবিষ্যতে প্রত্যেক গ্রাম থেকে ছবি হবে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য না থাকায়, পরিচালকও তার ছবির প্রতি যথেষ্ট সৎ থাকতে পারবেন। গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা এবং মৌলিক বিষয়ও ছবিতে উঠে আসবে।

আমি প্রথমে বিভিন্ন প্রাইমারি ও হাই স্কুলগুলোতে যোগাযোগ করি। সমাজে শিক্ষকদের অনেক ভূমিকা, তাই প্রথমে তাদেরকেই জানাই আমার চিন্তাভাবনা। কেন আমি একটা গোটা গ্রামকে দিয়ে ইনভেস্ট করিয়ে ছবি বানানোর কথা ভাবছি, সেটা যে সবাই বুঝতে পেরেছিলেন বা বুঝেও সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন– তা নয়। তবে অনেকেই সাহায্য করেছিলেন। এরপরে বিভিন্ন পেশার মানুষদের সঙ্গে, যেমন চাষি, সব্জিবিক্রেতা, মাছবিক্রেতা, বিদেশে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন এমন মানুষজনের পরিবারের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। তুলনামূলক ভাবে দেখলাম, সেই সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষদের উৎসাহ অনেক বেশি। কোরিয়া, ইরান বা বাইরের দেশের ছবির কথা ছেড়েই দিলাম, এইসব মানুষদের অনেকেই এখনও অনেকে ‘পথের পাঁচালী’ও দেখেননি। কিন্তু, তারা আমাদের কথা বুঝতে পারছেন। তাদের নিজেদের টাকায় একটা আস্ত সিনেমা তৈরি হবে এটা তাদের কাছে খুব রোমাঞ্চকর। এভাবেই শুরু। আর এখন তো প্রায় ৩০০ পরিবার কন্ট্রিবিউট করেছেন।
‘দুধপিঠের গাছ’ ছবির শুটিং হবে আড়ংঘাটায়। কলকাতার শিল্পীদের পাশাপাশি এখানকার বাসিন্দাদেরও ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যাবে। আড়ংঘাটা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাইমারি ও হাইস্কুলের ৬-১২ বছর বয়সের কম বেশি ৪০ জন শিশু-শিল্পী এই ছবিতে অভিনয় করবে। তাদেরকে নিয়ে নিয়মিত ওয়ার্কশপও হয়। শুটিং শুরু ডিসেম্বরে।
এছাড়াও, কলকাতা থেকে অভিনয় করছেন দামিনী বেণী বসু, কৌশিক রায়, ছন্দা চ্যাটার্জী। ছবির সঙ্গীত করছেন পন্ডিত তন্ময় বোস। ক্যামেরা শান্তনু ব্যানার্জী, সম্পাদনা অনির্বাণ মাইতি এবং কস্টিউম করছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার-প্রাপ্ত গোবিন্দ মণ্ডল (অপু)।
