মৃত্যুই শেষ কথা নয়, বোঝালো ‘মরদেহের মর্যাদা: আইন, ধর্ম ও বিজ্ঞান’ শীর্ষক আলোচনা

আত্মা সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার আজও দেহদানের অন্তরায়

‘মুক্তমনা’ ব্লগ (বাংলাভাষী মুক্তচিন্তক, নাস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার এবং লেখকদের প্রথম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম)-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত অভিজিৎ রায় ‘আত্মা নিয়ে ইতং বিতং’ নামে একটি সিরিজ লিখেছিলেন। যে লেখায় তিনি দেখিয়েছিলেন – আত্মা ব্যাপারটি মানুষের আদিমতম কল্পনা-  যেটা সুসংবদ্ধ রূপ পেয়েছিল গ্রীসে প্লেটোর দর্শনে এসে। প্লেটোর বক্তব্য ছিল যে, প্রাণী বা উদ্ভিদ কেউ জীবিত নয়, কেবলমাত্র যখন আত্মা প্রাণী বা উদ্ভিদদেহে প্রবেশ করে তখনই তাতে জীবনের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়। প্লেটোর এই ভাববাদী তত্ত্ব অ্যারিস্টটলের দর্শনের রূপ নিয়ে পরবর্তীতে হাজার-খানেক বছর রাজত্ব করে। এখন প্রায় সব ধর্মমতই দার্শনিক-যুগলের ভাববাদী ধারণার সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করে। আত্মা সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার শেষপর্যন্ত মানব সমাজে ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসে যা এই কালেও দেহদানের অন্তরায়।

পশ্চিমবঙ্গে বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি মরণোত্তর দেহদান করেছেন। ২০১০ সালের ১০ই জানুয়ারি সল্টলেকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার কিছু সময় পরেই যাঁর চোখের কর্নিয়া অপসারণ করেন চিকিৎসকরা, তাঁর নাম জ্যোতি বসু (Jyoti Basu)। তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ছাত্র-ছাত্রীদের গবেষণার জন্য। শোনা যায়, জ্যোতি বসু জীবিত অবস্থাতেই বলে গিয়েছিলেন–

“জানি না আমার অশক্ত শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কারো কাজে আসবে কিনা! কিন্তু আমার ঐকান্তিক ইচ্ছা যে আমার মরদেহ যেন অন্তত গবেষণার কাজে লাগানো হয়।একজন কমিউনিস্ট হিসেবে জানতাম জীবিতকালে মানুষের সেবা করতে পারব। মৃত্যুর পরেও যে মানবতার কাজে লাগা যাবে, এটা জেনে প্রফুল্ল বোধ করছি।”

আমাদের সমাজে বেশিরভাগ মানুষই এই ধরনের কাজের সঠিক মূল্যায়ণ করতে পারেন না অথবা দেহদানে ইচ্ছুক হয়েও কোথায় কীভাবে যোগাযোগ করবেন, সঠিক নিয়মাবলী ইত্যাদি বুঝতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হন।

জ্যোতিবাবু ছাড়াও এই বাংলার বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব দেহদান করে গিয়েছেন। যেমন- লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, “গণদর্পন” সংস্থার অন্যতম সংগঠক, মরনোত্তর দেহদান অঙ্গদান এবং চক্ষুদান আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ব্রজ রায় (Braja Roy), যিনি কোভিডে (Covid) প্রয়াত হয়েছেন অথচ অঙ্গদানের মতো মূল্যবান কাজটা করে যেতে ভোলেননি।

কিন্তু, আমাদের সমাজে বেশিরভাগ মানুষই এই ধরনের কাজের সঠিক মূল্যায়ণ করতে পারেন না অথবা দেহদানে ইচ্ছুক হয়েও কোথায় কীভাবে যোগাযোগ করবেন, সঠিক নিয়মাবলী ইত্যাদি বুঝতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হন। মূলত তাঁদেরকে দিশা দেখাতেই গত ১১ জুন, বিকাল ৫.৩০টায় গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অব কালচার (The Ramakrishna Mission Institute of Culture, Golpark)-এর শিবানন্দ হল-এ আয়োজিত হয়েছিল ‘মরদেহের মর্যাদা: আইন, ধর্ম ও বিজ্ঞান’ (Dignity of the Dead : Legal Religious and Scientific aspects) শীর্ষক আলোচনাসভা।

প্রয়াত অ্যাডভোকেট নির্মলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

আমরা প্রত্যেকটি পরিবার, প্রিয়জন-পরিজনকে হারিয়েছি এই মহামারিতে। গণমৃত্যু আমাদের ভাবিয়েছে নতুন করে। গণচিতা, গণকবর, নদীতে মৃতদেহ ফেলে দিয়ে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা সবই আমরা দেখেছি এই মহামারিতে। অ্যাডভোকেট নির্মলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় কোভিডে গত হয়েছেন। তাঁর স্মরণেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তাঁর পুত্র নীলোৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কন্যা শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সব জায়গাতেই বিশেষ ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় সমাধিস্থ, দাহ বা অন্য কোনও ভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। দেশের আইনেই বলা আছে, জীবিত ব্যক্তির যেমন মানবাধিকার আছে, মরদেহেরও আছে।

মৃত্যুর পর, আপনার এত আদরের, যত্নের দেহভাণ্ডটি নিয়ে সমাজ কি করবে? সমাজের কি করা উচিত? আপনার ইচ্ছা কি? কি করবে না, কি করলে ভালো হয়, এই আলোচনাসভায় সমস্ত জিজ্ঞাসার যথাসাধ্য উত্তর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞরা ছিলেন অনলাইনে তাঁদের জিজ্ঞাসা নিয়ে। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন স্বামী সুপর্ণানন্দজি মহারাজ। অংশগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা ড. দেবাশিস ভট্টাচার্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, ফ্যাকাল্টি অব ল’ ড. যতীন্দ্র কুমার দাস, রামকৃষ্ণ মিশন শিল্পমন্দিরের প্রিন্সিপাল বেদাতীতানন্দ, সমাজসেবক লেখক-সম্পাদক সুশীল সাহা, সাংবাদিক ও গবেষক ড. স্বাতী ভট্টাচার্য। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন মনীষা ভট্টাচার্য।

আলোচনা শেষে বাঁশির মুর্চ্ছনায় সমগ্র আলোচনার রেশ মন অবধি পৌঁছে দিয়েছিলেন সেনিয়া-মাইহার ঘরানার শিল্পী বাংলা গানের দল ‘দোহার’-এর অন্যতম সদস্য ঋত্বিক গুছাইত। এদিন তিনি মূলতান-এ মুগ্ধ করেন শ্রোতাদের। সঙ্গতে ছিলেন ফারুখাবাদ ঘরানার তবলিয়া নবারুণ দত্ত।

আজ এমন কোনও দেশ নেই যেখানে মানুষ মারা যাওয়ার পর মরদেহ আবর্জনার মতো দেখা হয়। সব জায়গাতেই বিশেষ ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় সমাধিস্থ, দাহ বা অন্য কোনও ভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। দেশের আইনেই বলা আছে, জীবিত ব্যক্তির যেমন মানবাধিকার আছে, মরদেহেরও আছে। অনেকেই আছেন যাঁরা কোভিডকালে বুঝতে পারেননি কীভাবে মরদেহ সৎকার করবেন, প্রিয়জনের মৃতদেহ মর্যাদা পাবে কিনা। এভাবে আমরা বহু মরদেহ গঙ্গায় ভাসতে দেখেছি।

জীবিতাবস্থায় কোনও মানুষ স্বেচ্ছায় অঙ্গদান করতে চাইলে শহরে একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, খোঁজ খবর নিয়ে সেখানে যোগাযোগ করতে পারেন। অনুষ্ঠানের অতিথি বক্তা ড. দেবাশিস ভট্টাচার্য একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলছিলেন, “আমি ১৯৭৯-এ যখন ন্যাশনাল মেডিক্যালে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হয়েছিলাম, অ্যানাটমি বিভাগ দেখাশোনা করতেন ডোম-ভাইয়েরা। তাঁদের একজন আমায় বলেছিলেন, বইকে তোমরা সম্মান করো কারণ এর থেকে জ্ঞান-শিক্ষা পাও। তেমনই মরদেহকে সম্মান করবে, এর থেকেও তো তুমি জ্ঞান পাচ্ছো। সেই ডোমভাইয়ের কথা আজও মনে রাখি আমি। এই উপলব্ধি অনেক সচেতন-শিক্ষিত ব্যক্তিরই থাকে না। অঙ্গদান এক মহৎ কাজ। মৃত্যুর পর এভাবেও তো বেঁচে থাকা যায়।”

পুরো অনুষ্ঠানটি দেখতে পাবেন কেয়ার কন্টিনিউয়াম (Care Continuum)-এর ফেসবুক পেজ-এ। রইলো লিঙ্ক-

Developed by DXDasia