ঢেকুরগড় এবং শ্যামরূপা কালী মন্দিরের ডায়েরি

জনশ্রুতি, রাজা লক্ষণ সেনও আসতেন এই মন্দিরে নিয়মিত পুজো দিতে

২০১৭-র দুর্গাপুজোয়, ষষ্ঠীর দিন দুপুরে হঠাৎ বেড়িয়ে পড়লাম পানাগড় ইলামবাজার রোড ধরে, অজয় নদের ধারে গড় জঙ্গলে। গড় জঙ্গলের কথা এত শুনেছি, কিন্তু আগে যাওয়া হয়নি। এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে, গড় জঙ্গল ভ্রমণ, সঙ্গে রাজা সুরথের পূজিত প্রথম দুর্গাপূজার স্থান দর্শন।

NH-2 ধরে দুর্গাপুর মুচিপাড়া পৌঁছলাম। এখান থেকে কল্পনা ইন-এর পাশ দিয়ে বাঁ দিকে চলে গেছে অজয় নদ পেরিয়ে জয়দেবের রাস্তা। অতি চমৎকার রাস্তা, বিশেষ করে মলান দীঘি থেকে পুরো রাস্তার দুই দিকেই ঘন সবুজ শালের জঙ্গল আপনার মন কেড়ে নেবে। অজয় নদ পৌঁছানোর অনেক আগে ডানদিকে পথনির্দেশ আছে, গড় জঙ্গলের। এখান থেকে ডানদিক ঘুরতে হবে। বোলপুর বা পানাগড়/দুর্গাপুর থেকে বাসে এলে, গড় জঙ্গল বললে আপনাকে এইখানে নামিয়ে দেবে। কিন্তু নিয়মিত যান চলাচল নেই বলে, বাকি রাস্তাটা হেঁটেই যেতে হবে। হাঁটতে ভালোই লাগবে, গ্রামের লোকেরা তো হেঁটেই যাতায়াত করে। আমরা অবশ্য গাড়ি নিয়ে চলেছি।

 

শাল, শিরিষ, অর্জুন আরো কত নাম না জানা গাছগাছালিতে ঢাকা, লাল মোরামের চমৎকার এই পথ দিয়ে চলেছি গড় জঙ্গল। ঝাঁকে ঝাঁকে ফিঙে, বুলবুলি আর গাছের কোটরে উঁকি দিচ্ছে টিয়ার টুকটুকে সবুজ ছানা। কোনো কোনো জায়গায় ভর দুপুরেও সূর্যরশ্মির প্রবেশ নিষেধ। বেশ একটা রোমাঞ্চকর আলো-আঁধারির পরিবেশে পৌঁছলাম মেধা মুনির পৌরাণিক কাহিনী আশ্রিত আশ্রমে। সাধুবাবারা রক্তবর্ণের আভরণ ও টীকা নিয়ে ব্যস্ত পুজোর আয়োজনে। বর্তমান মন্দিরের পেছনেই আদি মেধা মুনির আশ্রমের খণ্ডহর। সেখান থেকে সামান্য দূরেই এক অতি প্রাচীন ঢিপি। বোর্ডে লেখা আছে এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে প্রথম দুর্গাপুজো করেন।

আবার ফিরে এলাম মেধাশ্রমে। তখন সদ্য মন্দিরের দরজা খুলেছে দুর্গা মা দর্শনের জন্য। মেধাশ্রম থেকে গেলাম ইছাই ঘোষের আরাধ্যা দেবী শ্যামারূপা কালী মন্দিরে। জনশ্রুতি রাজা লক্ষণ সেনও এই মায়ের মন্দির নিয়মিত পুজো দিতে আসতেন। পূজারীর কথা অনুসারে, অতীতের জীর্ণ মন্দিরের উপর এই নতুন মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। কালী পূজাতে অসংখ্য ভক্ত সমাগম হয়।

 

সেখান থেকে চললাম গোপরাজ ইছাই ঘোষের দেউল-এ। ধর্মমঙ্গল কাব্যেও ইছাই ঘোষের উল্লেখ আছে। ইছাই ছিলেন গোয়ালা, ছিলেন স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী। নিজের সৈন্যদল তৈরি করেছিলেন – বাউরি, মুচি, হাঁড়ি, বাগদি, ডোম ইত্যাদি সমাজের দুর্বলতম মানুষদের নিয়ে। এদের মনে এখনো বীর ইছাই ঘোষের স্মৃতি জাগরূক। ইতিহাস বলে, পাল রাজা নয়াপালের সময় রাজ্যের ভাঙনের সূচনা হয়। অনেক সামন্ত রাজারা বিদ্রোহ করেন, যার মধ্যে ইছাই ঘোষ অন্যতম। স্থানীয় রাজা কর্নসেনকে পরাজিত করে, বর্ধমান জেলার এক বিস্তীর্ণ অংশে গড়ে তোলেন গোপভূমি বা ঢেকুরগড়। এই অতি চমৎকার দেবালয় বা দেউলটি তৈরি করেন মাতা ভগবতীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মন্দিরটির মধ্যে একটি সুবিশাল শিবলিঙ্গ রাখা আছে বলে স্থানীয়রা একে শিব মন্দির বলেই গণ্য করে। পুরাতাত্ত্বিক মতে এটি এগারোশো শতকের। দেখতে অনেকটা ওড়িশা শিখর মন্দিরের ধাঁচের। মন্দিরটিতে পাঁচটি ধাপ দেখা যায়। তাছাড়া, বিভিন্ন সময়ে সংযুক্তি বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হয়েছে বোঝা যায়, আলাদাভাবে বিভিন্ন রকম ইঁটের নমুনা দেখে। অসম্ভব সুন্দর নৃত্যরতা নর্তকী এবং যক্ষমূর্তি, এই দেউলের অন্যতম সেরা কাজ।

 

সেখান থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ালাম অজয়ের তীরে। চতুর্দিকে আদিগন্ত বিস্তৃত কাশবনের মধ্যে দিয়ে একফালি নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে। ইতিহাস আর প্রকৃতিকে মিলিয়ে নেওয়ার এই তো সন্ধিক্ষণ!

Developed by DXDasia