উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে এমন দোকান আর দ্বিতীয়টি নেই

বই আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসার তাগিদ থেকে ১৫ বছর ধরে রোজ দোকান খোলেন কর্ণধার

ধানসিড়ি উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জ শহরের একটি পুরোনো ও দুষ্প্রাপ্য বই পত্রিকা, হস্তশিল্প ও সমকালীন শিল্পসম্ভারের অভিনব বিপণী, যার যাত্রা শুরু হয় ২০০৩ সালের পয়লা বৈশাখ। উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে এমন দোকান, যেখানে পুরোনো-দুষ্প্রাপ্য বই, পত্রিকা পাওয়া যায়। আবার তার সঙ্গে হস্তশিল্প ও সমকালীন শিল্পসম্ভারও আছে। এমন বিপণী আগে ছিল না, বর্তমানেও নেই। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল ভায়োলিন, ল্যাটিন পারকাশন এবং বাংলা ঢোলের একনিষ্ঠ ছাত্র ধানসিড়ির কর্ণধার মলয় দে সরকারের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল সঙ্গীত সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যা তাঁর দোকানের প্রতিটি সামগ্রীতে প্রতিফলিত। সাক্ষাতে দোকানের কর্ণধার বললেন, তিনি এমন কিছু বিক্রি করেন যার সঙ্গে মানুষের অতীত বর্তমান সভ্যতার উত্থান পতনের উজ্জ্বল ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ৩ টাকা দামের দ্য মিউজিশিয়ানস অফ ইন্ডিয়া, লেখক ময়মনসিংহের রামগোপালপুরের জমিদার নরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বইটি এই প্রতিবেদকের সামনেই কিনে নিয়ে গেলেন এক সংগীত অনুরাগী ক্রেতা। উত্তরবঙ্গের এই দোকানে আঞ্চলিক ইতিহাস, রাজনীতি, স্থাপত্য, নাটক, সিনেমা, সাহিত্য, দর্শন, জেলার ইতিহাস, আন্দোলন, বিদেশি সাহিত্য- এমন সব বহুবিধ বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো ও দুষ্প্রাপ্য বই, পত্রিকা রয়েছে যা সত্যিই অবাক করে। যেমন এই দোকানে পাওয়া যাবে- ললিত কলা- নং ৬ (অক্টোবর ১৯৫৯, বঙ্গীয় সমাজ- ১৩০৬- সতীশচন্দ্র রায়চৌধুরী, সঙ্গত- ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন, প্রথম সংস্করণ- ১৯১৬), দ্য জুট ইন বেঙ্গল– নিবারণ চন্দ্র চৌধুরী (১৯০৮), প্রোটেকশন অফ হিস্টোরিকাল বিল্ডিংস: কন্টেম্পোরারি প্র্যাক্টিসেস অ্যান্ড থার্মোগ্রিক বিহেভিয়র– এর মতো পুরোনো ও দুর্লভ বই।

 

মলয়বাবু জানালেন, “এত সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ক্রেতার সংখ্যা কিন্তু খুবই কম। তবুও মাঝে মাঝে মালদা, বালুরঘাট, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, হেমতাবাদ, গাজোল সংলগ্ন উৎসাহী ক্রেতারা ফোন করে চলে আসেন। কোনো দুর্লভ বই পত্রিকা বিক্রি হয়ে গেলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। কারণ পরে ওই মানের বই কি আবার সংগ্রহ করা সম্ভব হবে এই ভেবে।” মাঝে কিছু আড্ডার আয়োজন হয়েছিল এই দোকানে, যার বিষয়গুলি ছিল ছোটোদের পত্রিকা, মৌলবাদ, মুক্তচিন্তায় আঘাত, লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎ। কথায় কথায় জানা গেল পুরোনো বই সংগ্রহ করা যেমন কঠিন, তেমনই আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে পাঠক ক্রেতা পাওয়া। ই-বুক, ফ্রি পিডিএফ, অনলাইন বই-পত্রিকা বিক্রির দাপটে ক্রেতার সংখ্যা কমছে। তবুও লড়াই চলবে বলে জানান মলয়। কারণ বই আর শিল্পের প্রতি ভালোবাসার তাগিদ তাঁকে ১৫ বছর ধরে দোকান খুলতে বাধ্য করে রোজ। আরও কিছু বইয়ের তালিকা দেওয়া যাক। যেগুলি আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস কিংবা শিকড়ের কথা বলে। যেমন- বিবেকচূড়ামণি (১৩০৪), বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার-বাখরগঞ্জ (বাংলাদেশ সরকার)। এছাড়াও ৬০ বছরেরও বেশি পুরোনো ভারতবর্ষ, প্রবাসী, শনিবারের চিঠি ইত্যাদি পত্রিকা। দোকানে এখন ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীর পুরুষরাই বেশি আসেন, মহিলার সংখ্যা খুবই কম। গবেষক, অধ্যাপক, লেখক ও অন্যান্য পাঠক ক্রেতা আসেন মাঝে মাঝে। বিক্রির অবস্থা কোনোকালেই ভালো ছিল না বলে জানালেন রায়গঞ্জ ধানসিড়ির কর্ণধার। তবুও বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পুরোনো বই সংগ্রহের প্রচেষ্টায় অবিচল না থেকে পারা যায় না। এখন ধানসিড়ি ভালোবাসা ও নেশার যাপন হয়ে উঠেছে।

 

Developed by DXDasia