শিক্ষায় সংকটকাল আনছে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগুলি, মত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের

কেন্দ্রীয় বোর্ডের স্কুলপাঠ্য থেকে বাদ পড়েছে বিবর্তনবাদ, পর্যায় সারণি, মুঘল আমল

জীববৈচিত্রে ভরপুর এই পৃথিবী। লক্ষ-কোটি বছর আগে প্রথমবার প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল এই গ্রহে। এককোষী থেকে বহুকোষী, জলচর থেকে উভচর, আকাশচারী, স্তন্যপায়ী। বহু প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, সৃষ্টিও হয়েছে নতুন প্রজাতি। কিন্তু কীভাবে এবং কেন নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়, কেনই বা ধ্বংস হয় অনেক প্রজাতি? উত্তর খুঁজেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন। তাঁর গবেষণালব্ধ ফলাফল উঠে এসেছিল তাঁর বিবর্তনবাদের তত্ত্ব-তে, যার মূল দুটি ভিত্তি- অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম এবং যোগ্যতমের উদবর্তন। পৃথিবীতে কালজয়ী বিজ্ঞানতত্ত্বগুলির মধ্যে ডারউইনের বিবর্তনবাদ অন্যতম। কারণ এটি প্রশ্ন করেছিল ঈশ্বরবাদকেই। যুক্তি এবং প্রমাণ সহকারে বলেছিল, ঈশ্বরের থেকে মানুষের সৃষ্টি হয়নি, বরং মানুষ এসেছে বাঁদর থেকেই। জীবজগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মিথকে ধূলিসাৎ করেছিল ডারউইনের বিবর্তনবাদ। সেই মতবাদ এবার থেকে আর পড়ানো হবে না কেন্দ্রীয় বোর্ডের বিদ্যালয়গুলিতে, দশম শ্রেণি পর্যন্ত। বাদ দেওয়া হয়েছে পর্যায় সারণি, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস-এর বেশ কিছু অংশও। সেই সিদ্ধান্তে ঝড় উঠেছে দেশের শিক্ষামহলে। প্রতিবাদসভা, কনভেনশন আয়োজিত হচ্ছে। প্রতিবাদ হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমেও। সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের যুক্তি যেখানে স্কুলপড়ুয়াদের উপর থেকে পাঠ্যক্রমের চাপ কমানো, সেখানে শিক্ষাবিদদের একাংশের তরফ থেকে উঠে আসছে পাল্টা যুক্তি। কিন্তু স্কুলপড়ুয়াদের কাছে ঠিক কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলি? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে বঙ্গদর্শন.কম।

সিলেবাসে মুঘল সাম্রাজ্যের একটা অংশকে ব্রাত্য রাখা এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020)-তে একাধিক ভিন্ন বিভাগের বিষয়কে একসঙ্গে পড়ার সুযোগ সম্পর্কে বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার জানান, “মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে বাদ দিলে ভারতের ইতিহাসের পর্যায়ক্রমই তো নষ্ট হয়ে যায়। মুঘলরা ভারতের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিলেন। শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদিতে। সেগুলো জানা তো জরুরি। ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে জানতে হয়। আর বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে পড়ার ব্যবস্থা অনেক জায়গায় রয়েছে। তাকে বলে ক্যাফেটেরিয়া অ্যাপ্রোচ অফ স্টাডি। কিন্তু সেখানে চাকরির ক্ষেত্র অনেক প্রশস্ত। আমাদের সমাজে তা নয়। এখানে চাকরির জন্য একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞতার দরকার হয়। নতুন নীতিতে সেই সুযোগ তো কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এই নীতি কি সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে? সেই পরিকাঠামো কি রয়েছে? আমার মনে হয়, বিদেশি নীতির অন্ধ অনুকরণ করার অবাস্তব প্রয়াস এটি।”

অন্যদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ফরাসি সাহিত্যের অনুবাদক এবং চিন্তক চিন্ময় গুহ বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “ইতিহাস পাল্টানো যায় না। অনেক দেশে অনেকবারই সেই চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সফল হয়নি। সাময়িকভাবে ক্ষতি তো হবেই। কিন্তু ভবিষ্যতে ইতিহাস আবার ঠিক পথে চলবে। আর আমাদের সমাজে দিনে দিনে বাড়ছে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের চাষ। এই সময় বিজ্ঞানকে আমাদের বেশি করে দরকার। তাই এই সিদ্ধান্ত ক্ষতিকর তো বটেই। কিন্তু বিজ্ঞান পড়লেই আমাদের দেশে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ কি সবাই হন? আর পড়া বা পড়ানো মানে তো শুধু বই পড়া বা পড়ানো নয়। টেক্সট বইয়ের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করাও বটে। আমি শিক্ষক হিসাবে চিরকাল সেভাবেই পড়িয়ে এসেছি। তাই আমি বিশ্বাস রাখছি সুশিক্ষকদের উপর, আলোকপ্রাপ্ত অভিভাবকদের উপর আর ছাত্রছাত্রীদের উপর। তাঁরা সবাই মিলে ঠিক এই সংকটকাল পার করে দেবেন।” তিনি যোগ করেন জাতীয় শিক্ষানীতি সম্পর্কে তাঁর মতামত, “নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি সম্পর্কে অনেকের ধারণাই স্পষ্ট নয়। আমারও এই ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা নেই। তবু নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান আর যেটুকু ধারণা আছে, তার ভিত্তিতে বলতে পারি, বিভিন্ন বিভাগের বিষয় একসঙ্গে পড়ার যে সু্যোগ, সেটা আসলে পাশ্চাত্যের শিক্ষানীতির অন্ধ অনুকরণ। আমাদের দেশের বহু স্তরীয় সমাজ ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে এই শিক্ষানীতি তৈরি হয়নি। শুধুমাত্র গুটিকয়েক স্বচ্ছল অংশের মানুষের জন্যেই এই নীতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।”

নতুন শিক্ষানীতির প্রসঙ্গে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রিয়ব্রত ঘোষাল জানান, “বিভিন্ন বিভাগের বিষয় একসঙ্গে পড়ার সুযোগের যে নীতি তৈরি হয়েছে, তাতে সবথেকে অসুবিধা হবে সিলেবাস তৈরি করায়। আর শুধু বিষয় নিলেই তো হবে না, সেগুলো তো পড়তেও হবে। শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে, বেশিরভাগ কলাবিভাগের ছাত্রছাত্রীরাই বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে দুর্বল। তারা কলেজ পর্যায়ের অঙ্ক, বিজ্ঞান পড়ে কতটা বুঝতে পারবে, সন্দেহ রয়েছে।”

ডারউইনের বিবর্তনবাদের তত্ত্ব ছাড়াও বাদ দেওয়া হয়েছে পর্যায় সারণি। মেন্ডেলিফের আবিষ্কৃত এই পর্যায় সারণি। যেখানে তিনি মৌল পদার্থগুলির কিছু মূল বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মৌলগুলিকে একটি সারণিতে কিছু নির্দিষ্ট ঘরে বসিয়েছিলেন। আইএসআই কলকাতার (ISI Kolkata) অধ্যাপক সুপ্রতিক পাল জানালেন, “কিন্তু যে সময় এই সারণি তৈরি হয়েছিল, সে সময় খুব বেশি মৌল আবিষ্কৃত হয়নি। তাই মেন্ডেলিফ অনেকগুলি ঘর ফাঁকা রেখেছিলেন। তিনি যুক্তিভিত্তিক ভাবে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে, আগামী দিনে অন্য অনেক মৌল পাওয়া যাবে, যাদের ধর্ম এমন হবে, যাতে তাদের ঐ ফাঁকা ঘরগুলিতে বসানো যাবে। কোন ধর্মের মৌলকে কোন ঘরে বসানো যাবে, বলে গিয়েছিলেন তাও। যা বাস্তবে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। এমনকি, মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময়ে যে পর্যায়ক্রমে মৌলগুলির সৃষ্টি হয়েছিল, তা পর্যায় সারণির অনুরূপ।” কিন্তু এই যোগসূত্রের বিষয় জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ স্কুল পড়ুয়াদের কাছে? তিনি বলেন, “এর থেকে বোঝা যায়, বিজ্ঞানে প্রতিটি ঘটনাই কার্য-কারণ সম্পর্কযুক্ত। এই কার্য-কারণ সম্পর্ক বিজ্ঞান ক্ষেত্রে সবথেকে জরুরি। এই জ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত জরুরি। যারা পরবর্তীকালে বিজ্ঞান পড়বে, তারা এই বিষয়গুলি আবার পড়ে নেবে। কিন্তু যারা অন্য বিষয় নিয়ে চর্চা করবে বা জীবনের অন্য ক্ষেত্রে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তাদের হয়তো আর সেই সুযোগ থাকবে না। গোঁড়া মানসিকতা বা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য বিজ্ঞানবোধ তৈরি হওয়া খুবই জরুরি এবং তা হওয়া উচিৎ স্কুলজীবন থেকেই।”

ডারউইনের বিবর্তনবাদের গুরুত্ব কোথায়? ডায়মন্ডহারবার শিশুরাম কলেজের অধ্যক্ষ নীলেশ রঞ্জন মাইতির কথায়, “এর ফলে ঈশ্বরবাদ এবং অস্তিত্ববাদের যেসব ধারণা তা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। ‘সৃষ্টিকর্তাই সব সৃষ্টির মূলে’, এর বিরুদ্ধে যুক্তিভিত্তিক প্রশ্ন করার অভ্যেস নষ্ট হয়ে যাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। যা বাড়াচ্ছে কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস। স্কুলস্তরেই এই অভ্যাস তৈরি হওয়া জরুরি, কারণ এরপর ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন দিকে। সবার কাছে আর এই বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা করার সুযোগ থাকে না। ইন্ডিয়া মার্চ ফর সায়েন্স কলকাতা অর্গানাইজিং কমিটির কনভেনার হিসাবে বলতে পারি, আমরা এই বিষয় নিয়ে প্রচুর আলোচনাসভা, কনভেনশন আয়োজন করছি। অসংখ্য শিক্ষাবিদ, শিক্ষাকর্মীর সই সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই সবের একটাই উদ্দেশ্য, সমাজের সর্বস্তরে এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা। আরও অনেকেই ব্যক্তিগত ভাবে বা বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে এই কাজ করছেন।” 

বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করেন যাঁরা, তাঁদের জন্য ইতিহাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বা কলাবিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিজ্ঞান? অধ্যাপকদের কথায়, প্রতিটি বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য সত্যের অনুসন্ধান করা। ইতিহাস সেই সত্যের খোঁজ দেয়। বিজ্ঞানও। সেগুলি না জানলে ছাত্রছাত্রীরা সত্য থেকেই পিছিয়ে পড়বে। পুরাতনের উপর নির্ভর করেই পরবর্তীকালে নতুন যুগের সৃষ্টি হয়। তাই পুরোনো বিষয়গুলি বা বিজ্ঞানের মতবাদগুলি জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বিজ্ঞান এবং সামাজিক চেতনার বিকাশ হওয়া জরুরি। তাই সিলেবাসের চাপ কমানোর দোহাই দিয়ে পাঠ্যক্রমের মূল বিষয়গুলিকে বাদ দেওয়ার অর্থ, সেই ক্ষেত্রে আপস করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

_____ 
*মতামত শিক্ষাবিদ-অধ্যাপকদের নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

Developed by DXDasia