কাশীপুর রাসবাটির রাস উৎসব

কার্তিকে রাস পূর্ণিমা যুগ যুগ ধরে ভক্তের মনে ভক্তিরসের সঞ্চার করে এসেছে। বলা হয়, ‘রস’ শব্দ থেকে রাস নামটি আসে। রাতের অপরূপ চাঁদ যেন বিরহাতুর। জ্যোৎস্নার রূপমাধুরীতে রাস উৎসবে সকলের ধুম লাগে। ভক্তির প্লাবন বইয়ে দেয়। ব্রজধামের রাসে ভক্ত গোপীরা ও পরমেশ্বর মোহন বংশীধারীর লীলা থেকে রাসলীলা বর্ণিত হয়েছে। চৈতন্যদেব রাসলীলার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে দেয় শত সহস্র মানুষের মধ্যে। নবদ্বীপে শ্রীবাস অঙ্গন থেকে চৈতন্যর সৃষ্ট যে কীর্তন দল নামসংকীর্তনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে তখন থেকে রাস মানুষের অন্যতম প্রিয় উৎসব।

মথুর মোহন নন্দী এই রাসবাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর তিনি উইলের মাধ্যমে দে বংশের হাতে গোপীনাথ জিউ ও রাসবাটি হস্তান্তর করে দিয়ে যান। তারপর থেকে দে বংশ মন্দিরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। রাসবাটিতে রাস উৎসব তিন দিন ধরে চলে।

কাশীপুর আর বরানগর সুপ্রাচীন জনপদ। ষোড়শ শতকে পুরী ধাম যাওয়ার সময় গঙ্গা পাড়ে নৌকাযোগে মহাপ্রভু কিছুদিন রঘু পণ্ডিতের ঘরে ছিলেন। “তবে প্রভু আইলেন বরাহনগরে। মহাভাগ্যবন্ত এক ব্রাহ্মণের ঘরে। সেই বিপ্র বড়ো সুশিক্ষিত ভাগবতে।” মহাপ্রভুর স্মৃতিধন্য এই স্থান। বরানগর আর কাশীপুর বহু পু্রোনো। ১৫৫০ সালে জাও ডি ব্যারোস ও ১৬৬০ সালে ফান ডেন ব্রোক এর নকশায় এই স্থানের উল্লেখ আছে। গঙ্গা পাড়ে এখানেই আছে ঐতিহ্যবাহী কাশীপুর রাসবাটি।

কাশীপুরে ৫ নম্বর রতন বাবু রোডে, রাসবাটিতে শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউ প্রতিষ্ঠিত আছেন। ২৫০ বছরের বেশি পু্রোনো, যেখানে অসংখ্য মানুষ ঠাকুরের কাছে তাদের প্রার্থনা নিবেদন করতে একত্রিত হন। মন্দিরের বাইরে খোলা চত্বরে একটি আটকোনা রাসমঞ্চ আছে। ভেতরে আছে এক প্রশস্ত দালান। গোপীনাথ জিউ-এর মন্দিরটি ভবনের দ্বিতলে। বৈষ্ণব ভাবধারায় এখানে যে সকল উৎসব পালন হয় তার মধ্যে রাস উৎসব অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বরানগরের স্থানীয় গবেষক অজিত সেন কাশীপুরের রাসবাটি নিয়ে বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করেছেন। মথুর মোহন নন্দী এই রাসবাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর তিনি উইলের মাধ্যমে দে বংশের হাতে গোপীনাথ জিউ ও রাসবাটি হস্তান্তর করে দিয়ে যান। তারপর থেকে দে বংশ মন্দিরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। রাসবাটিতে রাস উৎসব তিন দিন ধরে চলে। শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউ-এর মন্দিরে ভক্তরা মেতে ওঠেন এই কয়েকটি দিন নাচে গানে। মন্দিরের দালানে পাঠ ও গানের অনুষ্ঠান বসানো হয়। মন্দিরে চলে বিশেষ পুজো ও আরতি।

শোভাযাত্রা করে গোপীনাথ জিউকে রাসমঞ্চতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ভক্তরা মূর্তিকে দর্শন করেন। এরপর আবার দ্বিতলে মূল মন্দিরে মূর্তি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নানা রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। পুজোর পর ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিলি করা হয়। রাসকে ঘিরে উৎসব উপলক্ষে সকাল, দুপুর ও রাতে দেওয়া হয় বিশেষ ভোগ। শোভাযাত্রার সময় এই তিন দিন রঙিন আতশবাজি জ্বালানো হয়। রাসের সময় দালানটিতে বিভিন্ন মাটির মূর্তি ব্যবহার করে পৌরাণিক দৃশ্য ফুটিয়ে বর্ণনা হয় লীলারূপ। ১৬শ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দী অবদি সর্বব্যাপী অষ্টকোনাকৃতি রাসমঞ্চ প্রচুর নির্মাণ হয়েছে। রাসবাটিতে রাসমঞ্চটি প্রতিবছর সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। পরিবারের বর্তমান সদস্যরা খুব যত্ন নিয়ে রাসমঞ্চটি দেখাশোনা করেন। রাসের সময় মঞ্চকে নতুনভাবে রং করা হয়। বহু ভক্ত আসেন এই রাসমঞ্চকে দেখতে।

১৬শ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দী অবদি সর্বব্যাপী অষ্টকোনাকৃতি রাসমঞ্চ প্রচুর নির্মাণ হয়েছে। রাসবাটিতে রাসমঞ্চটি প্রতিবছর সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। পরিবারের বর্তমান সদস্যরা খুব যত্ন নিয়ে রাসমঞ্চটি দেখাশোনা করেন।

বাইরে খোলা চত্বরে বসে আজও চোখ ধাঁধানো রাস মেলা। বহু দর্শনার্থী ভিড় জমান। মেলাতে মাটির পুতুল, ঘর সাজানোর জিনিস, কামারদের লোহার সরঞ্জাম, বিভিন্ন অলংকার, বেতের তৈরি ঝুড়ি, কুলো, চালুনি, বিভিন্ন হস্তশিল্প ইত্যাদি বিক্রি হয়। আর মেলা পরিবেশে ঝালমুড়ি, নিমকি, জিলিপি, বাদাম ভাজা, গজা এগুলি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। বহু মানুষ এই মেলাকে কেন্দ্র করে জড়ো হয়।

সাধারণ মানুষের এক অপূর্ব সমারোহ হয় রাসবাটিতে। যার মূল কথা মানুষের ভক্তি ও চেতনা। গঙ্গাপাড়ের এই জনপদ সময়ের সঙ্গে আজও বহু মানুষকে আকর্ষণ করে। রাসবাটির রাস উৎসব কীর্তনে গানে ভক্তদের সঙ্গে পালিত হয়।

______
তথ্যসূত্র: অজিত সেন, শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউ রাসবাটি

Written by