বাংলাদেশি রিকশার রাজকীয় সাজ

জানেন কি, ঢাকায় প্রথম রিকশা যায় কলকাতা থেকে?

বাংলাদেশে পরিবহনের সাবলীল মাধ্যম হিসেবে রিকশা খুবই জনপ্রিয়। বিশেষত ঢাকায়। এখানে বেশিরভাগ অঞ্চলই সমতল, যার ফলে রিকশায় যাতায়াতের সুবিধে বেশি। পরিবেশ-বান্ধব এই বাহনের ভাড়াও আম-জনতার সাধ্যের ভিতরেই থাকে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে বলা হয় ‘রিকশার শহর’। এই শহরের ছোটো-বড়ো রাস্তায় রংবেরং-এর প্রচুর রিকশা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এদেশের গ্রামাঞ্চলেও রিকশা পরিষেবা যথেষ্ঠ সহজলভ্য।

বিশ্বে প্রথম রিকশার প্রচলন হয়েছিল জাপানে। কলকাতা পুরসভা ১৯১৪ সালে প্রথম রিকশা পরিবহনের ছাড়পত্র দেয়। তার আগেই মায়ানমারে রিকশা বেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। মায়ানমার থেকে চট্টগ্রামে রিকশার প্রচলন হয়। আর ঢাকায় রিকশা প্রথম যায় কলকাতা থেকে। ১৯৩০-এর দশকে পূর্ববঙ্গে রিকশা এক গুরুত্বপূর্ণ যানে পরিণত হয়। তবে পূর্ববঙ্গে রিকশায় অলংকরণ শুরু হয় মোটামুটি ৫০-এর দশকে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর সেখানে শিল্পচর্চার বেশ কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারা গড়ে ওঠে। যেমন, সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং, রিকশা পেইন্টিং, ট্রাক পেইন্টিং। ৬০-এর দশকে রিকশায় অলংকরণ পূর্ব পাকিস্তানের শহুরে শিল্পের মর্যাদা পায়। রিকশায় অলংকরণ করে বিখ্যাত হন আর কে দাশ, আলি নূর, দাউদ উস্তাদ, আলাউদ্দিনের মতো শিল্পীরা। এঁদের মধ্যে অনেকেই অন্য পেশা ছেড়ে পুরোপুরি রিকশা অলংকরণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যেমন চামড়ার পৈত্রিক ব্যবসা ছেড়ে রাজকুমার দাশ এবং তাঁর ছেলে এখন রিকশার অলংকরণকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বাংলাদেশে রিকশার অলংকরণে বিষয়ের বৈচিত্র্য সবাইকে মুগ্ধ করে। প্রাকৃতিক নানান দৃশ্য, পশুপাখি, ফুল-ফল, শহরের দৃশ্য, গ্রামের জীবনযাত্রা, সিনেমার নায়ক-নায়িকা, ধর্মীয় গল্প, কিংবদন্তি, রাজনৈতিক ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ – অনেক কিছুই রিকশার ছবিতে উঠে আসে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি রিকশায় মানুষের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হলে শিল্পীরা অন্য সব বিষয় নিয়ে অসাধারণ সব ছবি আঁকতে থাকেন। স্কুল ব্যাগ কাঁধে খরগোশ ছানা, শিয়াল ট্রাফিক পুলিশ – এরকম ছবিতে রিকশা-শরীর ভরে ওঠে।

বাংলাদেশের রিকশা শিল্পের খ্যাতি বিশ্বের দরবারেও পৌঁছে গেছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে সুসজ্জিত বাংলাদেশি রিকশা। জাপানের ফুকুয়োকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামের প্রদর্শনিতে দর্শকরা বাংলাদেশের রিকশা দেখতে ভিড় করেছেন। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের রিকশা নিয়ে আরও বেশ কিছু প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। নানা দেশের ক্রেতারা ছবি আঁকা রিকশা নিয়ে যান বাংলাদেশ থেকে। তবে, এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগে হাতে আঁকা অলংকরণের কদর কমে গেছে। অনেকে রেক্সিন গ্রাফিক্স করেই রিকশা সাজান। এরই মধ্যে রাজকুমার দাশ, টেক্কা মিস্ত্রির মতো কেউ কেউ এখনও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যমটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ছবি- সংগৃহীত

Developed by DXDasia