ট্যানডেম সাইকেলে চড়ে সবুজ পৃথিবী গড়ার ডাক দিচ্ছেন চুঁচুড়ার প্রদীপ-সঙ্গীতা

ভালোবেসে বাহনটির নাম রেখেছেন ‘ইচ্ছেডানা’

বাঙালির ডিএনএ-তে খানিক বোহেমিয়ান সত্তা আর অ্যাডভেঞ্চারপ্রেম বিদ্যমান। চুঁচুড়ার দম্পতি প্রদীপ বিশ্বাস ও সঙ্গীতা দেবনাথের জীবন কাহিনি অন্তত সেই প্রমাণই দেয়। তাঁদের কথা জানলে বোঝা যায়, আজও বাঙালির বোহেমিয়ান সত্তা সজীব। সবুজ পৃথিবী গড়ার সংকল্পে ট্যানডেম সাইকেল নিয়ে ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছেন চুঁচুড়ার যুগল। ভালোবেসে বাহনটির নাম রেখেছেন ‘ইচ্ছেডানা’। ‘ইচ্ছেডানা’য় চেপে প্রায় তেরো হাজার কিলোমিটার পথ তাঁরা পাড়ি দেবেন। সম্ভবত তাঁরাই ভারতে প্রথম দম্পতি, যাঁরা ট্যানডেমে চেপে এই কাজ করছেন। তাঁদের দেখতে জায়গায় জায়গায় মানুষজন ভিড় জামচ্ছেন, সেই সুযোগে তাঁরা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সবুজের বার্তা। ডাক দিচ্ছেন সবুজ পৃথিবী গড়ার।

কথা হচ্ছিল প্রদীপ বিশ্বাসের সঙ্গে, তখন তাঁরা দেওঘরে। সেদিনের মতো ভ্রমণ শেষ করে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থিতু হয়েছেন। শুনলাম তাঁদের অনুপ্রেরণার কথা। বরাবর ঘুরতে ভালোবাসতেন প্রদীপ ও সঙ্গীতা, নিজেদের সামর্থ্য মতো ছোটোখাটো ‘সোশ্যাল ওয়ার্ক’ও করতেন। সাইকেল নিয়ে ভারত ঘোরার ভাবনা প্রথম আসে ২০২০ সালে। এ বিষয়ে তাঁদের অনুপ্রেরণা সাইকেলিস্ট পরিমল কাঞ্জি এবং আরও অনেকে। প্রদীপ বলছিলেন, “২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর আমরা প্রথম বের হই। দক্ষিণ ভারত ঘুরি। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরলা, ১২৮ দিনে চার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করি। তারপর ফিরে ক'দিন বিশ্রাম নিয়ে দ্বিতীয়বার যাই উত্তরবঙ্গে। উত্তরবঙ্গ, অসম, মেঘালয়, চেরাপুঞ্জি, ৬৬ দিনে দু'হাজার কিলোমিটার। তারপর বর্ষায় দক্ষিনবঙ্গে যাই। ৫৬ দিনে ১৭০০ কিলোমিটার। আমরা বেরিয়েছিলাম চুঁচুড়া থেকে শুরু করে কালীঘাট হয়ে গঙ্গাসাগর। তারপর সুন্দরবন, দুই ২৪ পরগণা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান হয়ে চুঁচুড়ায় ফিরি।" সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেন। আমজনতাকে প্রকৃতিকে বাঁচানোর উপায় জানান। জল নষ্ট না করতে, গাছ লাগাতে বলেন পথচলতি মানুষদের।

দক্ষিণবঙ্গ ভ্রমণের সময় সাইকেলিস্ট উজ্জ্বল পালের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁদের অভিযানের দিশা বদলে দিয়েছে। প্রদীপের কথায়, "সাইকেলিস্ট উজ্জ্বল পালের নাম হয়তো শুনে থাকবেন। তিনি সাইকেল নিয়ে আফ্রিকার মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো অভিযান করেছিলেন। তাঁর বাড়ি সাঁইথিয়ায়। দক্ষিণবঙ্গ ভ্রমণের সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি নতুন পথ দেখান। এছাড়াও অসমে দু'জন মানুষ নিজেদের এলাকায় গাছ নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গেও আলাপ হয়, এই সাক্ষাতগুলো আমাদের ভ্রমণের দিশা বদলে দিয়েছে। এখন স্কুলে স্কুলে ভিজিট করি। প্রতিদিন অন্ততপক্ষে একটি স্কুলে যাবো ঠিক করে নিয়েছি। বাচ্চাদের পরিবেশ সচেতনতার বিষয়ে জানাবো। জীবনে তারা যেন অন্তত একটি গাছ লাগায় এবং তাকে বড় করে তোলে, এটুকুই আমাদের চাওয়া। আজকেও স্কুল ভিজিট করেছি। স্লাইড শো করে স্কুলে বাচ্চাদের দেখাই। অযথা যেখানে সেখানে প্লাস্টিক না ফেলা, জল অপচয় না করার কথা বলি। নিজের চোখে দেখেছি দক্ষিণ ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামে সপ্তাহে একদিন এক ঘণ্টার জন্য পানীয় জল আসে। মনে ভাবনা এসেছে এগুলো নিয়ে বলা দরকার। তাই আরও বেশি করে বেরোনো। এখন প্রধান উদ্দেশ্য স্কুলগুলোতে গিয়ে সচেতনতার বার্তা প্রচার করা। আমাদের প্রচার বার্তা Go Green, Save Earth. আমরা বাচ্চাদের বোঝাই কেন বাঁচাবো, কীভাবে বাঁচাবো।"

প্রদীপের মতে, বাচ্চাদের আনুষঙ্গিক চিন্তা থাকে না। পড়াশোনো, পেশাগত, সাংসারিক চাপ থাকে না, তাদের গ্রহণ করার ক্ষমতাও বেশি। তাই পরিবেশ রক্ষা করতে বাচ্চাদেরকেই বেছে নিয়েছেন বিশ্বাস দম্পতি। বাচ্চারা যদি পরিবেশ বাঁচাতে নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করে, সেটাই তাঁদের সাফল্য হবে। 

বরাবর ঘুরতে ভালোবাসতেন প্রদীপ ও সঙ্গীতা, নিজেদের সামর্থ্য মতো ছোটোখাটো ‘সোশ্যাল ওয়ার্ক’ও করতেন। সাইকেল নিয়ে ভারত ঘোরার ভাবনা প্রথম আসে ২০২০ সালে। এ বিষয়ে তাঁদের অনুপ্রেরণা সাইকেলিস্ট পরিমল কাঞ্জি এবং আরও অনেকে।

এবার প্রদীপ-সঙ্গীতা তাঁদের ইচ্ছেডানায় ভর করে চতুর্থ অভিযানে বেরিয়েছেন। যাত্রা শুরু করেছেন চলতি বছরের ২০ নভেম্বর। ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, রাজস্থান মিলিয়ে প্রায় ৬৫০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করার ইচ্ছে তাঁদের। ফিরতি পথে উত্তর ভারত, বিহার হয়ে বাংলায় ফিরবেন। লক্ষ্য মোট ১৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া। তাঁরা কেবল দিনে চলাফেরা করেন। সকাল সাড়ে ছটা-সাতটার সময় বের হন, নির্দিষ্ট একটা গন্তব্য থাকে। না পৌঁছতে পারলে জনবসতি রয়েছে এমন স্থানে থেকে যান। ক্লাব, মন্দির, কোনও পার্টি অফিস, প্রাইমারি স্কুল, (দক্ষিণ ভারতের ক্ষেত্রে) চার্চ ইত্যাদি জায়গায় রাত কাটান। জনসাধারণের থেকে সবরকম সাহায্য পান বলেই জানালেন প্রদীপ। 

সাইকেল প্রসঙ্গে প্রদীপ জানাচ্ছিলেন, তাঁদের সাইকেলের নাম ইচ্ছেডানা, ডাক নাম ফুলটুসি। ব্যাটারি মোটর রয়েছে সাইকেলে, পাশাপাশি প্যাডেলও করতে হয়। দিনে ৬০-৭০ কিলোমিটার সফর সারেন তাঁরা। সাইকেলের ওজন প্রায় ৪০ কেজি। প্রায় আড়াই কুইন্টাল ওজন বহন করে ফুলটুসি। প্রদীপ-সঙ্গীতার ইচ্ছে ছিল ঘোরার, সাইকেল সে ইচ্ছে পূরণ করেছে, তাই নাম ইচ্ছেডানা। যেকোনও জায়গায় সাইকেলটিকে দেখলেই কমপক্ষে জনা পঞ্চাশেক লোক দাঁড়িয়ে যায়। ট্যানডেম নিয়ে তাঁদের আগ্রহের শেষ নেই। তাই আদুরে নাম ফুলটুসি। চুঁচুড়ার এক দোকানে সাইকেলটি তৈরি হয়েছে। প্রভাত কুমার সেটি তৈরি করেছেন, রঙ করেছেন প্রদীপ ও সঙ্গীতা। এ সব শুনে মনে হল, বাঙালির হাতে তৈরি যানে বাঙালির ভারত জয়ের অভিযান কোনও রূপকথার গল্পের চেয়ে কম কিছু নয়। প্রদীপ বলছিলেন, তাঁদের লক্ষ্য গোটা দেশ ঘোরা। মানুষের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। এই কাজ আগামীতেও তাঁরা করে যাবেন। 

কলম হাতে বাঙালি নোবেল পেয়েছে, ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে অস্কার জিতেছে। বাঙালির জয়ের তালিকায় নয়া সংযোজন প্রদীপ-সঙ্গীতার সবুজ পৃথিবী গড়ার অভিযান। তাঁরা দু'জনেই বেসরকারি ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। গাড়ি বিক্রি করে, চাকরি ছেড়ে, শেষ মাসের বেতন নিয়ে পরিবেশ বাঁচানোর তাগিদে বেরিয়েছেন স্বামী-স্ত্রী। নিশ্চিত আয় ছেড়ে, নিজেদের ভবিষ্যতের চিন্তা না করে তাঁরা ছুটছেন। বাঙালি নির্ভীক, ঝুঁকি নিতে ভালোবাসে জাতটা। জাত্যাভিমানের সে'ছাপ দেখছি প্রদীপ-সঙ্গীতার অভিযানে। ওঁদের অভিযান সফল হোক।

ছবিঃ প্রদীপ বিশ্বাস

Developed by DXDasia