ধাপা-র মহিলা ও শিশুদের হাত ধরে ছোটোদের পোশাকে রূপকথার গল্প বুনছে ‘খুদে’

খাঁটি সুতির ওপর প্রাকৃতিক রং ও সুতোর কারুকাজে সেজে উঠছে ‘খুদে’-র পুজো সংগ্রহ

‘খুদে’-র পোশাক পরে ধাপা-র শিশুরা

‘খুদে’ শুধু ছোটোদের পোশাক ব্র্যান্ড নয়, আরও অনেক কিছু। তাই এ বিষয়ে কিছু কথা বলার আগে বলতে হবে তনু’জ ভোকেশনাল ট্রেনিং সোসাইটি’র কথা। কারণ এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরই একটি উদ্যোগ এটি। তনু’জ ভোকেশনাল ট্রেনিং সোসাইটি শুরু করেছিলেন অনুশ্রী মালহোত্রা এবং অর্পিতা চক্রবর্তী। এই দুই বন্ধুর কাঁধে ভর দিয়েই বদলে যাচ্ছে ধাপা’র জনজীবন। মূলত ধাপার মহিলা ও শিশুদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যেই তাঁদের এহেন কর্মকান্ড।

কলকাতা শহরের পূর্ব প্রান্তে অনেকখানি জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সবথেকে পুরোনো ও সর্ববৃহৎ ভাগাড়—‘ধাপা’। কয়েকশো একর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পতিত জমিটিতে প্রায় ২,৫০০ টন আবর্জনা ফেলা হয় প্রতিদিন। এর মধ্যেই ঘিঞ্জি বস্তিতে পরিবারসহ বাস করে পরিযায়ী শ্রমিকেরা। কাছের ফ্যাক্টরির চিমনি থেকে নির্গত কেমিক্যালে ভর্তি ক্ষতিকারক ধোঁয়া সর্বক্ষণ মিশে থাকে এখানকার হাওয়ায়। বস্তিবাসী শ্রমিকেরা বেগার খাটে চামড়ার কারখানাগুলোতে। বস্তির মহিলা ও বাচ্চারা ময়লার গাদা থেকে বোতল আর আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়ায় সারাদিন। এভাবেই, এই পরিস্থিতিতেই তাঁরা জীবনধারণ করছে গত এক শতক ধরে। তবে কোন অবস্থাই হয়তো চিরকাল থাকে না। অর্পিতা ও অনুশ্রী’স্বপ্ন দেখেছিলেন, ধাপার সেইসব শিশুদের হাতে তুলে দেবেন সমানাধিকার। তারা যেন অন্যান্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক ভাবে যোগ দিতে পারে মূলস্রোতের জীবনধারায়। ২০০৮ সালে দুজনে মিলে শুরু করেন তনু’জ ভোকেশনাল ট্রেনিং সোসাইটি, আর সেই থেকে তাঁরা নিরন্তন যুদ্ধ করে চলেছেন শিশুদেরকে তাদের যোগ্য সম্মান ও অধিকার দেওয়ার জন্য।

অর্পিতা ও অনুশ্রীর সঙ্গে ধাপার খুদেরা

অর্পিতা চক্রবর্তী একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। বর্তমানে ধাপার হাতগাছিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। ধাপা ভাগাড় সংলগ্ন বস্তিটির সামগ্রিক অবস্থা ভাবিয়ে তুলেছিল তাঁকে। আবর্জনার পাহাড়ের মাঝে শিশুদের বড়ো হয়ে উঠতে দেখে প্রথমটা নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয়নি তাঁর। এছাড়া, ড্রাগ কেনাবেচা আর শিশুপাচার এখানকার নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে, এসব শুনে চোখ-কান বুজে থাকার বদলে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন অর্পিতা। 

একটি এক্সপোর্ট কোম্পানিতে ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার হিসাবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফ্যাশন ডিজাইনার অনুশ্রী মালহোত্রা। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনুশ্রী তাঁর নিজস্ব বুটিক শুরু করেন। এই বুটিকে কর্মচারী হিসাবে তিনি নিয়োগ করেন আর্থ-সামাজিক পিছিয়ে পড়া মহিলাদের।  নিজে হাতে সেলাই ও সেলাই-সংক্রান্ত অন্যান্য খুঁটিনাটি কাজ শেখান। এঁদের মধ্যে যে মহিলারা কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন, তাঁদের সরাসরি নিজের ব্র্যান্ডের কাজে নিয়োগ করেন। 

অর্পিতা ও অনুশ্রী সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা যৌথ ভাবে এই মহিলাদের সেলাই ও এমব্রয়ডারির কাজ শেখাবেন। “প্রশিক্ষণ প্রাথমিক ভাবে শুরু হয় নানান হস্তশিল্প দ্রব্য তৈরি শেখানো দিয়ে। যেহেতু আগে থেকেই বহু ক্লায়েন্ট রয়েছে আমার, ফলে এই মহিলাদের তৈরি টেবল ম্যাট, ডায়রি কভার, কাপ হোল্ডার, কোস্টার প্রভৃতি হস্তশিল্প সামগ্রীগুলি খুব সহজেই বিক্রি হয়ে যায়। বিক্রি থেকে যা পয়সা আসতো, তা আমি ওঁদের মধ্যেই ভাগ করে দিতাম। আমাদের প্রশিক্ষণে যোগদানকারী মহিলাদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ৯০-তে গিয়ে ঠেকে। এমনকি আরও মহিলা আমাদের কাছে আবেদন জানান, যাতে তাঁদেরকেও আমরা আমাদের ট্রেনিং প্রোগ্রামে জায়গা করে দিই। কিন্তু জায়গা ও মূলধনের অভাবে সকলকে সুযোগ দিতে পারিনি আমরা। তাছাড়া, বাজারে হস্তশিল্পের চাহিদাও খুব বেশি নয়। আমাদের এমন কোনো টেকসই প্রকল্পের কথা ভাবতে হবে, যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলাদের সংসার চালানোর মতো অন্তত ২০০০ টাকা দিতে পারি আমরা।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন অনুশ্রী।

এরপরই ‘খুদে’ নামে ছোটোদের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও অরগ্যানিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড তৈরি করেন দু’জনে। অনুশ্রী’র কথায়, “পুরুষ ও মহিলাদের ফ্যাশন নিয়ে অনেক কাজ করে থাকলেও, ছোটোদের ফ্যাশনের বিষয়ে আমি একেবারেই অনভিজ্ঞ। আমি দেখেছি, নামী ব্র্যান্ডগুলোও সচরাচর ছোটোদের ফ্যাশন নিয়ে সেভাবে মাথা ঘামায় না। তাই আমি ঠিক করি, পরিবেশবান্ধব ও ত্বকের পক্ষে সুরক্ষিত এমন কাপড় ব্যবহার করে শিশুদের জন্য কিছু অভিনব পোশাক তৈরি করব। দেড় বছর আগে ‘খুদে’ নামের ব্র্যান্ডটির জন্য কাজ শুরু করি আমরা। একদল মহিলাকে আমরা প্রশিক্ষণ দিই, কিভাবে গাঁদা, অপরাজিতা, জবা, গোলাপ, পেরিউইঙ্কেল প্রভৃতি ফুল, বিভিন্ন পাতা ও পিঁয়াজের খোসা থেকে রঙ তৈরি করতে হয়। আমার নিজস্ব তাঁতি গোষ্ঠী আছে যারা জৈব খাদি কাপড় তৈরি করে। একদল মহিলা কাপড়ের উপর প্রিন্টিং করে ও পোশাকের মাপ অনুযায়ী কাপড় কাটে। এদের মধ্যে প্রায় দশজন অত্যন্ত দক্ষ কারিগর হয়ে উঠেছে এর মধ্যেই। তবে বাকিদের এখনও অনেক শেখা বাকি।”

‘খুদে’ তো তৈরি হল। সময় এল খুদে’কে জনসাধারনের কাছে পৌছে দেওয়ার। কিছু পোশাক তৈরি হয়ে যাওয়ার পর, নির্মাতারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ছোটোদের জন্য আয়োজন করা হবে একটা র‍্যাম্প-ওয়াকের। এই উদ্দেশে নিয়মিত ক্লাসের মাধ্যমে ধাপার বাসিন্দাদের শেখানো হয় সামাজিক আদবকায়দা, কথা বলার ভঙ্গিমা, নানান ভাষা, ফ্যাশনের খুঁটিনাটি, র‍্যাম্পওয়াক ইত্যাদি। অনুশ্রী বলেন, “সাইন্স সিটি অডিটোরিয়ামে যখন ‘খুদে’ লঞ্চ করি আমরা, তখন সুপরিচিত টলিউড তারকারা ধাপার শিশুদের সঙ্গে একই র‍্যাম্পে হেঁটেছিলেন।”

'খুদে'-র পোশাক পরা খুদেদের সঙ্গে র‍্যাম্প ওয়াকে সুদীপ্তা চক্রবর্তী, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, সোহিনী সরকার সহ অন্যান্য তারকারা
 

আর এখন তো ভিন দেশেও নিজেদের কাজ নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে খুদে। সম্প্রতি খুদে-র ফ্যাশন সামগ্রী পাড়ি দিয়েছিল  দুবাইয়ের এক প্রদর্শনীতে।  

পোষাকটির নাম দেওয়া হয়েছে বেলকুঁড়ি

ছোটোদের জামাকাপড় তৈরির প্রক্রিয়া, নানা ধরনের সেলাইয়ের কাজ, ইকো-প্রিন্টিং ইত্যাদি ধাপার মহিলাদের তাঁরাই হাতে ধরে শিখিয়েছেন। খুদে-র জামাকাপড় প্রিমিয়াম কোয়ালিটি তো বটেই তার সঙ্গে ইকো-ফ্রেন্ডলি উপাদান দিয়ে তৈরি। তাই খুদে-র সব পোশাককে আমরা ‘অরগ্যানিক’ বা ভেষজ-ও বলতে পারি। পোশাকগুলির বেসিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় ব্লিচহীন খাঁটি কোরা সুতি, জামদানি, খাদি। জামাকাপড়ের ওপর ফুল-পাতা দিয়ে প্রাকৃতিক ভাবে প্রিন্ট নেওয়া হয়, গাঁদা ফুল বা পেঁয়াজের খোসা দিয়ে রং বানিয়ে ডাই করা হয়, মোট কথা খুদে-র পোশাক সম্পূর্ণ ভাবেই  ছোটোদের ‘স্কিন-ফ্রেন্ডলি’। ধাপা’র মহিলাদের দিয়ে শুধু পোশাক বানানো নয়, তাঁদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের গ্রুমিং করানো স্টাইলিং-মডেলিংয়ের জন্য। এই হচ্ছে ‘খুদে’-র মূল গল্প। 

এ বছর উৎসবের মরশুমে ছোটোদের জন্য বিশেষ কিছু ভেবেছেন? অনুশ্রী বলেন, “বিশেষ বলতে, এ বছর আমরা একটু রেট্রো-লুকের দিকে ঝুঁকেছি। জামার লেসগুলো ক্রসেটের ব্যবহার করা হয়েছে, মেরিগোল্ড প্রিন্টের টু-পিস থাকছে। মোটামুটি ট্রেন্ডি জামাকাপড়ই বানানো হয়েছে এ বার, যেগুলো পরে ছোটোরা আরাম বোধ করবে। আমাদের নতুন কালেকশন দিল্লির একটা প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়েছে, তাই এই মুহুর্তে আমাদের স্টোরে গেলে হয়তো সেগুলো পাওয়া যাবে না। ৫ অক্টোবরের পর থেকে আবার পাওয়া যাবে।”

অর্পিতা, অনুশ্রীরা নানা ভাবে চেষ্টা করে চলেছেন পিছিয়ে থাকা মানুষদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার। ওঁদের কাছে প্রশিক্ষণ পেয়ে ধাপার মহিলারা এখন জানেন সামাজিক মাধ্যমগুলি ব্যবহার করে কীভাবে বিভিন্ন প্রোডাক্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোর্ট ফোলিও-র দেখভাল করতে হয়। এভাবেই দুই বন্ধুর কাঁধে ভর দিয়ে, আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে ধাপার জনজীবন।

খুদে-র ঠিকানা: 
24/A, Old Ballygunge Second Ln, Ballygunge Park, Ballygunge, Kolkata-19

ছবিঋণ:
বিজয়া দত্ত

Developed by DXDasia