
ধাপার বস্তিতে খুব ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে এক অমোঘ পরিবর্তন
কলকাতা শহরের পূর্ব প্রান্তে অনেকখানি জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কলকাতার সবথেকে পুরোনো ও সর্ববৃহৎ ভাগাড়—‘ধাপা’। গৃহস্থালির আবর্জনার মতোই মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্খা’ও এখানে চাপা পড়ে যায় নোংরার গাদায়। কয়েকশো একর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পতিত জমিটিতে প্রায় ২,৫০০ টন আবর্জনা ফেলা হয় প্রতিদিন। আর এই ভাগাড়ের মধ্যেই ঘিঞ্জি বস্তিতে পরিবারসহ বাস করে পরিযায়ী শ্রমিকেরা। দু’মুঠো ভাতের জন্য রাতদিন এক করে গাধার মতো খেটে যায় তারা। এখানকার সামগ্রিক পরিবেশটা যে ঠিক কেমন, তা হয়তো সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত। এখানে উন্মুক্ত পয়ঃনালীর উপর থিকথিক করে মশা মাছি; শূকরের বাসস্থান। কাছের ফ্যাক্টরির চিমনি থেকে নির্গত কেমিক্যালে ভর্তি ক্ষতিকারক ধোঁয়া সর্বক্ষণ মিশে থাকে এখানকার হাওয়ায়। বস্তিবাসী শ্রমিকেরা ক্রিতদাসের মতো বেগার খাটে চামড়ার কারখানাগুলোতে। বস্তির মহিলা ও বাচ্চারা ময়লার গাদা থেকে বোতল আর আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়ায় সারাদিন। আর এভাবেই, এই পরিস্থিতিতেই তারা জীবনধারণ করছে গত এক শতক ধরে। তবে কোন অবস্থাই হয়তো চিরকাল থাকে না। সম্প্রতি দুই বন্ধুর হাত ধরে, ধাপার বস্তিতে খুব ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে এক অমোঘ পরিবর্তন।
অর্পিতা চক্রবর্তী ও অনুশ্রী মলহোত্রা—দুই বন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন, বস্তির সর্বস্বান্ত শিশুদের হাতে তুলে দেবেন সমানাধিকার, যাতে অতীতের অন্ধকার সময় পিছিনে ফেলে তারা এগিয়ে আসতে পারে। এবং অন্যান্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক ভাবে যোগ দিতে পারে মূলস্রোতের জীবনধারায়। ২০০৮ সালে তাঁরা দুজনে মিলে শুরু করেন ‘তনু’জ ভোকেশনাল ট্রেনিং সোসাইটি’, আর সেই থেকে তাঁরা নিরন্তন যুদ্ধ করে চলেছেন শিশুদেরকে তাদের যোগ্য সম্মান ও অধিকার দেওয়ার জন্য।

অনুশ্রী বলেন, “জন্মের সময় সব শিশুই সমান অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। সামাজিক পরিকাঠামোই তাদের মধ্যে তফাৎ সৃষ্টি করে। বস্তির শিশুদের অধিকাংশই পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো মানুষ, কিংবা পড়াশুনো করবার মতো সুযোগ সুবিধা পায় না। ফলে তাদের মধ্যে থাকা সুপ্ত প্রতিভাগুলো কখনোই ঠিক মতো প্রকাশিত হতে পারে না। ছোটো থেকেই তারা গালিগালাজ ও অত্যাচার দেখে বড়ো হয়। তাই নিজেদের জীবনেও সেগুলোই নকল করতে শুরু করে তারা। এই শিশুদের বেশিরভাগই একাধিক ভাষা স্বাচ্ছন্দ্যে বলে যেতে পারে। শুধুমাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ইংরেজিটুকু শেখা হয়ে ওঠে না ওদের। আমরা দেখেছি, বাচিক ইংরেজি শেখাতে শুরু করলে কত তাড়াতাড়ি এই ছেলেমেয়েরা ভাষার সামান্য পার্থক্যগুলো ধরে ফেলতে পারে।”
অর্পিতা চক্রবর্তী একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। বর্তমানে ধাপার হাতগাছিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। ধাপা ভাগাড় সংলগ্ন বস্তিটির সামগ্রিক অবস্থা গভীর ভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল তাঁকে। আবর্জনার পাহাড়ের মাঝে শিশুদের বড়ো হয়ে উঠতে দেখে প্রথমটা নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয়নি তাঁর। এছাড়া, নানাবিধ অপরাধমূলক ও অসামাজিক কাজকর্মের জন্য বরাবরই আলোচিত হয়েছে ধাপার নাম। এখানে বসবাসকারী শিশুদের অধিকাংশই স্কুলে পড়বার সুযোগ পেলেও, অল্প কিছুদিন পরেই তা ছেড়ে দেয়। মদ, অবৈধ ড্রাগ কিংবা অন্যান্য নেশার দ্রব্য এখানে খোলাখুলি বিক্রি হয়, আর তার নেশাতেই বুঁদ হয়ে যায় এই শিশুরা। ড্রাগ কেনাবেচা আর শিশুপাচার এখানকার নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। দেশি মদের (হুচ) অবৈধ ব্যবসার জেরে প্রায়দিন খুনখারাপি লেগে থাকে বিভিন্ন মাফিয়া গোষ্ঠীগুলির মধ্যে। তবে, এসব শুনে চোখ-কান বুজে থাকার বদলে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন অর্পিতা।

অর্পিতা ও অনুশ্রীর সঙ্গে ধাপার খুদেরা
অন্যদিকে, অনুশ্রী বরাবরই পিছিয়ে পড়া মহিলা ও শিশুদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি ঘটাতে চেয়েছিলেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ফ্যাশন ডিজাইনার নিজের কর্মজীবন শুরু করেন একটি এক্সপোর্ট কোম্পানিতে ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার হিসাবে। সেখান থেকে প্রথমে বাংলা সিরিয়াল ও পরবর্তীতে বাংলা সিনেমা জগতের জন্য কাজ করার সুযোগ আসে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনুশ্রী তাঁর নিজস্ব বুটিক শুরু করেন। এই বুটিকে কর্মচারী হিসাবে তিনি নিয়োগ করেন পিছিয়ে পড়া মহিলাদের, যাদের তিনি হাতে ধরে সেলাই, এমব্রয়ডারি ও সেলাই-সংক্রান্ত অন্যান্য খুঁটিনাটি কাজ শেখান। এদের মধ্যে যে সব মহিলা কাজে দক্ষতার পরিচয় দেয়, তাদের অনুশ্রী সরাসরি নিয়োগ করেন তাঁর ব্র্যান্ডের কাজে। এমনকি ফ্যাশন জগতে থাকা তাঁর অন্য বন্ধুদেরও এই মহিলাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেন তিনি। “সত্যি বলতে, এই মহিলাদের হাতের কাজ দেখে আমি বুঝেছি, উপযুক্ত লোকবল আর টাকা থাকলে আমরা আজ কোথায় পৌঁছে যেতাম!” বলেন অনুশ্রী।
স্থানীয় মহিলারা অর্পিতাকে চিনতেন; তাঁকে কাছে পেয়ে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার গল্প ভাগ করে নেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে কিছুজন এ কথাও বলেন যে, নিয়মিত উপার্জনের কোনো ব্যবস্থা থাকলে পরিবারকে খাওয়াতে তাদের পক্ষে সুবিধা হয়। ঠিক এই মুহূর্তেই অর্পিতা ও অনুশ্রী সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা যৌথ ভাবে এই মহিলাদের সেলাই ও এমব্রয়ডারির কাজ শেখাবেন।
এরই মধ্যে, ২০২০ সালে যখন করোনা ভাইরাসের প্রকোপে সারা দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা হয়, তখন ধাপার প্রাত্যহিক জীবন আচমকা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। ধাপার বস্তিবাসীদের ততখানি আর্থিক স্বচ্ছলতা কোনোদিনই নেই যে তারা এমন একটা সময়ের কথা ভেবে সঞ্চয় করতে পারে। তাদের কাছে একদিন কাজে না যাওয়ার অর্থ, খালি পেটে থাকা। এ সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অর্পিতা। নিজে হাতে রান্না করে বস্তির ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। আর এ সমস্ত কাজে বরাবর তাঁর সঙ্গে ছিলেন অনুশ্রী।
স্থানীয় মহিলারা অর্পিতাকে চিনতেন; তাঁকে কাছে পেয়ে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার গল্প ভাগ করে নেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে কিছুজন এ কথাও বলেন যে, নিয়মিত উপার্জনের কোনো ব্যবস্থা থাকলে পরিবারকে খাওয়াতে তাদের পক্ষে সুবিধা হয়। ঠিক এই মুহূর্তেই অর্পিতা ও অনুশ্রী সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা যৌথ ভাবে এই মহিলাদের সেলাই ও এমব্রয়ডারির কাজ শেখাবেন। “প্রশিক্ষণ প্রাথমিক ভাবে শুরু হয় নানান হস্তশিল্প দ্রব্য তৈরি শেখানো দিয়ে। যেহেতু আগে থেকেই বহু ক্লায়েন্ট রয়েছে আমার, ফলে এই মহিলাদের তৈরি টেবল ম্যাট, ডায়রি কভার, কাপ হোল্ডার, কোস্টার প্রভৃতি হস্তশিল্প সামগ্রীগুলি খুব সহজেই বিক্রি হয়ে যায়। বিক্রি থেকে যা পয়সা আসতো, তা আমি ওঁদের মধ্যেই ভাগ করে দিতাম। আমাদের প্রশিক্ষণে যোগদানকারী মহিলাদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ৯০-তে গিয়ে ঠেকে। এমনকি আরও মহিলা আমাদের কাছে আবেদন জানান, যাতে তাঁদেরকেও আমরা আমাদের ট্রেনিং প্রোগ্রামে জায়গা করে দিই। কিন্তু জায়গা ও মূলধনের অভাবে সকলকে সুযোগ দিতে পারিনি আমরা। তাছাড়া, বাজারে হস্তশিল্পের চাহিদাও খুব বেশি নয়। আমাদের এমন কোনো টেকসই প্রকল্পের কথা ভাবতে হবে, যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলাদের সংসার চালানোর মতো অন্তত ২০০০ টাকা দিতে পারি আমরা।” অনুশ্রী।
এরপরই ছোটোদের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও অরগ্যানিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড তৈরি করবার কথা তাঁদের মাথায় আসে, যার নাম তাঁরা দেন ‘খুদে’। অনুশ্রী জানান, “পুরুষ ও মহিলাদের ফ্যাশন নিয়ে অনেক কাজ করে থাকলেও, ছোটোদের ফ্যাশনের বিষয়ে আমি একেবারেই অনভিজ্ঞ। আমি দেখেছি, নামী ব্র্যান্ডগুলোও সচরাচর ছোটোদের ফ্যাশন নিয়ে সেভাবে মাথা ঘামায় না। তাই আমি ঠিক করি, পরিবেশবান্ধব ও ত্বকের পক্ষে সুরক্ষিত এমন কাপড় ব্যবহার করে শিশুদের জন্য কিছু অভিনব পোশাক তৈরি করব। দেড় বছর আগে ‘খুদে’ নামের ব্র্যান্ডটির জন্য কাজ শুরু করি আমরা। একদল মহিলাকে আমরা প্রশিক্ষণ দিই, কিভাবে গাঁদা, অপরাজিতা, জবা, গোলাপ, পেরিউইঙ্কেল প্রভৃতি ফুল, বিভিন্ন পাতা ও পিঁয়াজের খোসা থেকে রঙ তৈরি করতে হয়। আমার নিজস্ব তাঁতি গোষ্ঠী আছে যারা জৈব খাদি কাপড় তৈরি করে। একদল মহিলা কাপড়ের উপর প্রিন্টিং করে ও পোশাকের মাপ অনুযায়ী কাপড় কাটে। এদের মধ্যে প্রায় দশজন অত্যন্ত দক্ষ কারিগর হয়ে উঠেছে এর মধ্যেই। তবে বাকিদের এখনও অনেক শেখা বাকি।”

‘খুদে’ তো তৈরি হল। সময় এল খুদে’কে জনসাধারনের কাছে পৌছে দেওয়ার। কিছু পোশাক তৈরি হয়ে যাওয়ার পর, নির্মাতারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ছোটোদের জন্য আয়োজন করা হবে একটা র্যাম্প-ওয়াকের। এই উদ্দেশে নিয়মিত ক্লাসের মাধ্যমে ধাপার বাসিন্দাদের শেখানো হয় সামাজিক আদবকায়দা, কথা বলার ভঙ্গিমা, নানান ভাষা, ফ্যাশনের খুঁটিনাটি, র্যাম্পওয়াক ইত্যাদি। গর্বিত অনুশ্রী বলেন, “সাইন্স সিটি অডিটোরিয়ামে যখন ‘খুদে’ লঞ্চ করি আমরা, তখন সুপরিচিত টলিউড তারকারা ধাপার শিশুদের সঙ্গে একই র্যাম্পে হেঁটেছিলেন।”

তিনি আরও বলেন, “সময়ের সঙ্গে আমরা নানা ভাবে চেষ্টা করেছি এই পিছিয়ে থাকা মানুষদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার। একদল মেয়েকে শেখানো হয় সামাজিক মাধ্যমগুলি ব্যবহার করে, কীভাবে তারা বিভিন্ন প্রোডাক্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে। আমাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে অমৃতা মাইতি বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের পোর্ট ফোলিও-র দেখভাল করে। আমি জানি, বিশ্বদরবারে জনপ্রিয়তার নিরিখে আমরা এখনও কিছুই তেমন করে উঠতে পারিনি। কিন্তু আমরা বিশ্বাস রাখি যে, আমাদের তৈরি জিনিসগুলোর জন্যেও সঠিক ক্রেতাগোষ্ঠী আমরা খুঁজেই নেব।”
এছাড়াও, ধাপার মহিলা পরিচালিত এন জি ও’টির পক্ষ থেকে ব্রড স্ট্রিট-এ উন্মোচিত হয়েছে একটি রুফটপ টি বুটিক, যার নাম ‘রাহি টি টাইম’। এখানকার কর্মচারীরা প্রত্যেকে ধাপার বাসিন্দা। তারা যে শুধু চা তৈরি করে, এমন নয়। শেফ হিসাবে প্রশিক্ষণ পেয়েছে তারা, এবং চায়ের পাশাপাশি তারা বিক্রি করে নানা ধরনের মুখরোচক বাঙালি খাবার। এখান থেকে প্রাপ্ত টাকার সবটাই যায় ধাপার মহিলা ও শিশুদের কল্যাণমূলক প্রকল্পের খাতে। এভাবেই দুই বন্ধুর কাঁধে ভর দিয়ে, আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ধাপার জনজীবন।
ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এখানে করুন।
