বাবর আলি : বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক আজ শিক্ষা জগতের ‘আইডল’

পাড়ার বন্ধুরা একসঙ্গে গাছ থেকে আম পাড়ছে, পুকুরের জলে ঝাঁপ দিচ্ছে, মসজিদে যাচ্ছে নামাজ পড়তে – কিন্তু একসঙ্গে স্কুলে যাচ্ছে না কেন? প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল পঞ্চম শ্রেণিতে পাঠরত বাবর আলির (Babar Ali)। বন্ধুদের স্কুলে না যাওয়ার কারণ জানতে পারে একদিন হঠাৎ। কেউ কাগজ কুড়োচ্ছে, কেউ বিড়ি বাঁধছে, কেউ রাজমিস্ত্রিকে সহযোগিতা করছে। করুণ দৃশ্যগুলো দেখে কেঁদে উঠেছিল বাবরের মন। ওই বয়সেই তাই বন্ধুদের জন্য বাড়ির উঠোনের এককোণে পেয়ারা গাছতলাতেই শুরু করে দিল স্কুল। নাম দিল – আনন্দ শিক্ষা নিকেতন (Ananda Siksha Niketan)। সেই বাবর আলিই তারপর হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক। প্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন হাজার হাজার ছেলেমেয়ের।

স্কুলের শিশুদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক বাবর আলি

যে বয়সে শিশুমন খেলাধুলার পাশাপাশি স্কুলও যায়, সহজপাঠ – নামতা – জাতীয় সংগীত নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সে বন্ধুদের ‘শিশু শ্রমিক’ (Child Labor) হয়ে যাওয়া মন থেকে মেনে নিতে পারেননি বাবর আলি। সে কথা জানিয়েছিলেন বাবা-মা’কে, জানিয়েছিলেন স্কুলের এক শিক্ষিকাকেও। ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় বাড়ির উঠোনে শুরু করা সেই স্কুলের কী নাম দেওয়া যায় ভাবতে থাকেন। বাবরের শিক্ষিকা বলেছিলেন আনন্দ সহকারে শিশুরা এখানে পড়বে, তাই স্কুলের নাম হোক আনন্দ শিক্ষা নিকেতন। সেদিন প্রিয় শিক্ষিকার কথা ভুলতে পারেননি ছাত্র বাবর আলি। তাঁর দেওয়া নামই আজ পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।

যে বয়সে শিশুমন খেলাধুলার পাশাপাশি স্কুলও যায়, সহজপাঠ – নামতা – জাতীয় সংগীত নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সে বন্ধুদের ‘শিশু শ্রমিক’ হয়ে যাওয়া মন থেকে মেনে নিতে পারেননি বাবর আলি। সে কথা জানিয়েছিলেন বাবা-মা’কে, জানিয়েছিলেন স্কুলের এক শিক্ষিকাকেও।

মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) বেলডাঙা গ্রামে বাড়ি বাবর আলির। এখন তাঁর বয়স ২৯। স্নাতকোত্তর পর্ব শেষ হয়েছে। যদিও এখনও তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছোটোবেলায় তৈরি করা ওই স্কুলটা। স্কুলের যাবতীয় দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মাত্র আটজনকে নিয়ে শুরু হওয়া আনন্দ শিক্ষা নিকেতনের আজ ছাত্র সংখ্যা তিনশোরও বেশি। সরকারি পাঠ্যসূচি অনুসরণ করেই সেখানে পঠনপাঠন হয়। ছাত্রছাত্রীদের গায়ে হাত তোলায় বিশ্বাসী নন তাঁরা। বরং আনন্দ সহকারে সেখানে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। দিন যায় উচ্ছ্বল গতিতে।

আনন্দের পাঠ

বাবর আলির সঙ্গে গল্প করতে করতে জানা যায়, স্কুলের একেবারে শুরুর দিনগুলোর কথা। বাবর বলেন, “যে স্কুলে আমি পড়তাম, ওখান থেকে চক নিয়ে আসতাম আমার স্কুলের জন্য। কারণ, চক ছিল না আমাদের কাছে। আর চক না থাকলে কী করে পড়াব বলুন? এই কারণে স্কুলে অনেক কথা শুনতে হত। অনেকে ভাবত আমি চক চুরি করছি। কিন্তু কেন চক নিচ্ছি, সেটা যখন জানতে পারলেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা, তখন তাঁরাই একবার কয়েক বাক্স চক উপহার দিয়েছিলেন আমায়।”

এই বিশাল কর্মকাণ্ডে ছোটো থেকে বাবর পাশে পেয়েছেন বাবা মহম্মদ নাসিরুদ্দিন এবং মা বানুয়ারা বিবিকে। বেলডাঙা সিআরজিএস হাইস্কুলে পড়ার পর বাবর আলি কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাঠ শেষ করেন। মাত্র নয় বছর বয়সে সারা দেশ থেকে শিক্ষায় অবদানের জন্য নানা পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৬ সালে একটি সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে আমির খান (Amir Khan) উপস্থাপিত ‘সত্যমেব জয়তে’ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বাবর। আরও নানান প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যম বাবর আলিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০০৯ সালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-আইবিএন তাঁকে ‘রিয়্যাল হিরো’ হিসেবে ঘোষণা করে। এনডিটিভি তাঁকে ‘ইন্ডিয়ান অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত করে। বাবর আলির স্বপ্নের স্কুলবাড়ি বাবরের সঙ্গে সঙ্গেই বড়ো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর সংখ্যা আটজন। জানা যায়, আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কল্যাণার্থে বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পাঠদান করা হয়।

 

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে বাবর আলি

“পড়াশোনার বাইরেও একটা স্কুল যেভাবে পরিচালিত হয় – শিক্ষক থেকে শিক্ষাকর্মী কে কীভাবে কাজ করেন, কীভাবে মিটিং করেন, স্কুল চালাতে গেলে কী কী আবশ্যিক প্রয়োজন এই সবকিছু আমি পর্যবেক্ষণ করতাম খুব ছোটো থেকেই। এবং সেভাবেই আনন্দ শিক্ষা নিকেতনকে আমি পরিচালিত করতে চেয়েছি।” জানাচ্ছেন বাবর আলি। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবর আলিকে বিশ্বের কনিষ্ঠতম প্রধানশিক্ষক (Youngest Headmaster of the World) হিসেবে ঘোষণা করে বিবিসি (BBC)। বর্তমানে বাবর আলির জীবনকাহিনি পড়ানো হয় কর্ণাটক সরকারের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে। এমনকি, সিবিএসই বোর্ডের দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকেও জায়গা করে নিয়েছে বাবর আলির অসামান্য যাত্রাপথ। ২০২০ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের মুখেও শোনা গিয়েছিল বাবরের সুখ্যাতি। এমনকি ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি আনন্দ শিক্ষা নিকেতনের বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশের আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাবর আলিকে প্রেরিত একটি চিঠিতে লেখেন, “মুর্শিদাবাদ জেলার ভাবতা গ্রামের ‘আনন্দ শিক্ষা নিকেতন’-র বার্ষিক স্কুল পত্রিকা আগামীদিনে প্রকাশিত হতে চলেছে জেনে খুশি হলাম। পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শুভেচ্ছা জানাই ও বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি।”

আনন্দ শিক্ষা নিকেতন – বর্তমানে

আনন্দ শিক্ষা নিকেতনকে আরও কীভাবে বিস্তৃত করা যায় এবং ‘সকলের জন্য শিক্ষা’-র যে স্বপ্ন বাবর দেখেছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য শুধু তাঁর এলাকা নয়, সারা দেশের প্রান্তে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও শিক্ষানুরাগী মানুষের সহযোগিতায় কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় সেই চেষ্টা জারি আছে বলে জানান বাবর আলি। বেলডাঙা অঞ্চলে শিক্ষিতের হার আগের চেয়ে অনেকটাই বেশি। তবে তরুণ প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই উচ্চশিক্ষায় অনীহা রয়েছে বলে জানান বাবর। তিনি এ-ও জানান, “সরকার সব একা করবে তা তো হতে পারে না। আমাদের মতো সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমরা প্রত্যেকে যদি একটু একটু করে এগিয়ে আসি তাহলেই পৃথিবীতে শিক্ষার হার ভরে যাবে। ‘সকলের জন্য শিক্ষা’ তখনই আমরা বুকচিতিয়ে বলতে পারব।”

বাবর আলি আজ শিক্ষা জগতের ‘আইডল’। তাঁর শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে একদল গ্রামীণ ছেলেমেয়ে। দারিদ্র সেখানে শুধুমাত্র একটা শব্দ। কারণ বাবর আলি স্বপ্ন দেখেছেন ‘সকলের জন্য শিক্ষা’ – তাই অর্থের জন্য আটকাবে না কিছুই। বাবর আলির এই প্রতিজ্ঞা অমর হয়ে থাকুক।

ফিরে দেখা কিশোর বাবর আলি

____

সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে। ছবি সৌজন্যে – বাবর আলি।

Developed by DXDasia