চক্ষু যখন ছানাবড়া

নবাবের মিষ্টি মুর্শিদাবাদের ছানাবড়ার জিআই প্রাপ্তি

ম্প্রতি একই সঙ্গে সাতটি পণ্যের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই তকমা পেয়েছে বাংলা। তালিকায় রয়েছে মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া (Chhanabora from Murshidabad)। কোনও পণ্য বা প্রাকৃতিক সম্পদ, যদি কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় উৎপাদিত হয় বা খ্যাতি লাভ করে, ক্ষেত্রে সেই পণ্য বা সম্পদটির জিআই স্বীকৃতি পাওয়া যায়। এই তকমার জেরে পণ্যটির বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়, বিপণনে বিশেষ সুবিধাও মেলে। ফলে আগামীদিনে মুর্শিদাবাদের ছানাবড়ার আরও জনপ্রিয়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সুবে বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ (Murshidabad)। মুর্শিদকুলির পা পড়তেই যাবতীয় আলো এসে পড়েছিল মুর্শিদাবাদে, কলকাতা তখনও বঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। তবে বিশ্বাসঘাতকতা এই জেলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অচিরেই আলো হারিয়ে আঁধারে ডুবে গিয়েছিল নবাবের জেলা। ভাগীরথির দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অজস্র স্থাপত্য, মন্দির, মসজিদ আর কবরখানা; সেই সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী মাত্র! তবে অতীতের সাক্ষীগোপাল হিসাবে আরও এক জিনিস রয়েছে, সে হল ছানাবড়া (Chhanabora)।

জনশ্রুতি রয়েছে, নবাবি আমলের প্রায় শেষ লগ্নে মুর্শিদাবাদ শহরে জনৈক নিমাই মণ্ডল মিষ্টির দোকান দিয়েছিলেন। নিমাই মণ্ডলের দোকানের ছানাবড়া খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর দোকান থেকে নিয়মিত ছানাবড়া যেত নবাবের প্রাসাদে।

ছানাবড়ার জন্মকাল নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। তবে অনুমান, নবাবি আমলেই এর জন্ম। সম্ভবত নবাবি আমলের শেষ লগ্নে। জনশ্রুতি রয়েছে, নবাবি আমলের প্রায় শেষ লগ্নে মুর্শিদাবাদ শহরে জনৈক নিমাই মণ্ডল মিষ্টির দোকান দিয়েছিলেন। নিমাই মণ্ডলের দোকানের ছানাবড়া খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর দোকান থেকে নিয়মিত ছানাবড়া যেত নবাবের প্রাসাদে। নবাব, তাঁর কেল্লা নিজামতের অতিথিদের জন্য প্রস্তুত করাতেন ছানাবড়া, এক একটির ওজন হত প্রায় এক-দেড় মণ। তা রূপোর থালায় পরিবেশন করা হত। পেল্লায় সাইজের মিষ্টির দর্শনেই অনেকে হয়তো চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলতেন!

সেকালের মুর্শিদাবাদে ছানাবড়া তৈরির দুজন বিখ্যাত কারিগর ছিলেন সৈদাবাদের পটল সাহা ও গোপেশ্বর সাহা। পটল সাহা আবার পটল ওস্তাদ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর হাতের ছানাবড়ার খ্যাতি ছিল খুব। কাশিমবাজারের রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র ছিলেন ছানাবড়ার প্রেমিক। মণীন্দ্রচন্দ্রের সুবাদেই ছানাবড়ার সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সাহেবদের অবধি তিনি ছানাবড়া খাওয়াতেন।

ছানাবড়ার বয়স প্রায় দুশো বছর। তার প্রমাণ কুলীন কুলসর্বস্ব নাটক। পণ্ডিত রামনারায়ণের লেখা কুলীন কুলসর্বস্ব নাটকে ব্রাহ্মণদের ফলারের বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। উত্তম ফলারের বিবরণে ছানাবড়ার উল্লেখ রয়েছে, 

‘‘ঘিয়ে ভাজা তপ্ত লুচি
দুচারি আদার কুচি
কচুরি তাহাতে খান দুই৷
ছক্কা আর শাক ভাজা
মতিচুর বোঁদে খাজা
আহারের জোগাড় বড়ই৷
নিখুঁতি জিলিপি গজা
ছানাবড়া বড় মজা
শুনে শকশক করে নোলা৷
হরেক রকম মণ্ডা
যদি দেয় গণ্ডা গণ্ডা
যত খাই তত হয় তোলা৷
খুরি খুরি ক্ষীর তায়
চাহিলে অধিক পায়
কাতরি কাটিয়া শুকো দই৷
অনন্তর বাম হাতে
দক্ষিণা পানের সাথে
উত্তম ফলার তারে কই৷’’

কুলীন কুলসর্বস্ব-ই হল বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম নাটক। রচনাকাল ১৮৫৩ সাল। রামনারায়ণ ছানাবড়ার কথা লিখলেন যখন, তখন ধরে নিতে হয় নাটক লেখার আগে থেকে নিশ্চয় খাবারের পাতে সম্মানজনক সদস্য হয়ে উঠেছিল ছানাবড়া।

ছানাবড়ার জন্য দরকার ভালো মানের ছানা। ছানাকে ঘি-তে ভেজে এটি প্রস্তুত করা হয়, তাই এর নাম ছানাবড়া হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ছানা, ঘি, বড়ো এলাচ গুঁড়ো, ছোটো এলাচের দানা, চিনি দিয়ে প্রস্তুত করা হয় ছানাবড়া। রয়েছে তিনটি ধাপ। প্রথমে ছানাকে মিহি করে বেটে মণ্ড তৈরি করা হয়।

ছানাবড়ার জিআই প্রাপ্তির জন্য প্রায় বছর চারেক ধরে লড়াই করছিলেন স্থানীয় তিনজন মানুষ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্বর্গীয় সাধন ঘোষ। তাঁর তৈরি মিষ্টির দোকানের নাম আমন্ত্রণ, দোকানের বয়স ৩৫ বছর। বহরমপুর লোয়ার কাদাই অঞ্চলে দোকানটি অবস্থিত।

আঁটের জন্য সামান্য ময়দা দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে সেই মণ্ড থেকে ছানার গোলক গড়ে ঘিয়ে ভাজা হয় এবং সবশেষে মোটা (গাঢ়) চিনির রসে প্রায় একদিন ডুবিয়ে রাখা হয়। এই কারণেই ছানাবড়াকে অনেক দিন সংরক্ষণ করা যায়। এর বর্ণ কালো। বাইরেটা শক্ত, ভিতরটা মৌচাকের জালের মতো এবং রসে টইটুম্বুর।

ইতিহাসে, ছানাবড়া উপহার হিসাবে দেওয়ার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। ১৮৯৭-র অগাস্টের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত হয় সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন। সেই উপলক্ষ্যে মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলেন স্বামী অখণ্ডানন্দ। ফেরার সময় এক মণ ওজনের দুটি ছানাবড়া তৈরি করিয়ে বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দের জন্য নিয়ে যান অখণ্ডানন্দ মহারাজ। বহরমপুর থেকে ১৯৩৮-এ নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে একটি পেল্লায় ছানাবড়া উপহার দেওয়া হয়েছিল। জ্যোতি বসু থেকে রাহুল গান্ধী, ইরফান পাঠান থেকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, সকলেই উপহার স্বরূপ ছানাবড়া পেয়েছেন।

ছানাবড়ার জিআই প্রাপ্তির জন্য প্রায় বছর চারেক ধরে লড়াই করছিলেন স্থানীয় তিনজন মানুষ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্বর্গীয় সাধন ঘোষ। তাঁর তৈরি মিষ্টির দোকানের নাম আমন্ত্রণ, দোকানের বয়স ৩৫ বছর। বহরমপুর লোয়ার কাদাই অঞ্চলে দোকানটি অবস্থিত। সেই দোকানেও ছানাবড়া পাওয়া যায়। স্বর্গীয় সাধন ঘোষের পুত্র ইমনকল্যাণ ঘোষ এখন দোকান সামলান। তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, ‘‘বাবা বারবার কলকাতায় যেত জিআই পাওয়ার জন্য। আমাদের একটা সংগঠন আছে। আমাদের জেলায় আমার ঠাকুরদা সেটা তৈরি করেছিলেন। রাজ্যে যেমন পশ্চিমবঙ্গ মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সমিতি, আমাদের এখানে বহরমপুর মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সমিতি। আমার বাবা এক সময় তার সম্পাদক ছিলেন। জেলায় জেলায় সমিতির সম্মেলেন হত, সেখানেই জিআই নিয়ে আলোচনা হত। আমার বাবা, বাবার বন্ধু আনন্দ সুইটসের কর্ণধার, এঁরাই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এতদিনে জিআই পেয়েছে ছানাবড়া।’’

ইমনকল্যাণ মনে করছেন, জিআই পাওয়ার ফলে ছানাবড়া আরও জনপ্রিয়তা পাবে। তাঁর কথায়, ‘‘প্রচার দরকার। আমার মনে হয়, শতকরা ৯৫ ভাগ লোক জানে না জিআই কী, খায় না মাথায় দেয়। আমাদেরই জানাতে হবে। জিআই নিয়ে যতটা মহানগরের লোক জানে, গ্রাম-মফস্সলের লোকেরা জানে না। যাঁরা জানে, তাঁরাই গুণগান করতে পারবেন। আমার বন্ধুবান্ধব অনেকেই জানত না। তাঁদের বোঝাতে হল জিআই-টা কী? বললাম এক কথায় আমাদের জিনিসটা কপিরাইট বা পেটেন্ট পেয়ে গেল। যাঁরা জানেন, তাঁরা আসছেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন। বলছেন, ‘বাহ্ খুব ভালো জিনিস হল।’ আমরা নিজেরাই প্রচার করছি, ফেসবুক ইত্যাদিতে।’’

Developed by DXDasia