জয়নগরের মোয়া : পাড়া গাঁয়ের হাট থেকে জিআই স্বীকৃতির ‘মিষ্টি’ সফর

ঘ্রাণের শেষ, বাতাসে লেগেছে হিমেল পরশ। পুজোর মরশুমে তৈরি নাড়ু, মোয়ার ভাণ্ডার এতদিনে ফুরিয়েছে। ঠিক এমন সময় বাংলার মিষ্টি প্রেমীদের রসনা-তৃপ্তিতে কনকচূড় খই আর নলেন গুড়ের মিলনে জন্ম নেয় তুলতুলে নরম সেই মিষ্টান্ন। মোয়া, স্থান মাহাত্ম্যে যার নাম জয়নগরের মোয়া। শীতকালের যে কোনো অনুষ্ঠান, পিকনিক হোক বা পুজো ঘি আর ক্ষীরে মাখামাখি কাজু-কিসমিসে সাজানো মোয়া ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ। তবে যাঁদের হাতের জাদুবলে সৃষ্ট এই অপূর্ব মিষ্টি, তাঁদের কথা আমরা জানি কি? তাছাড়া, বিশ্বায়নের যুগের হাওয়া কতটা লেগেছে এই আঞ্চলিক মিষ্টির গায়ে? পৌষের প্রায় শেষ লগ্নে মোয়ার স্বাদ আস্বাদন করতে করতে চলুন জেনে নিই মোয়ার জাদুকরদের কথা।

ক্রেতাদের মধ্যে বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন চকোলেট মোয়া বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে দিনে দিনে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য No added Sugar মোয়া পাওয়া যাচ্ছে।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা-র নিজস্ব মিষ্টি এখন জগৎবিখ্যাত। একদা জয়নগর, বহড়ু অঞ্চলের আঞ্চলিক মিষ্টি এখন জেলা, রাজ্য, দেশের সীমা অতিক্রম করে বিদেশের মাটিতেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এই মোয়া নিতান্তই মরশুমি মিষ্টি। নভেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি অবধি মোয়া তৈরি হয়। এই সময় ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। জয়নগরের বিখ্যাত মোয়া ব্যবসায়ী রাজেশ দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “মোয়া তৈরির জন্য শুধু কারিগর না, নেপথ্যে আরও অনেক মানুষের অবদান থাকে, কনকচূড় ধান থেকে খই তৈরি, শিউলিদের খেজুর রস সংগ্রহ সবই এই শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। মোয়া তৈরি করতেও অনেকের শ্রম প্রয়োজন।” সারাদিনে কতক্ষণ কাজ করতে হয়? মোয়া তৈরির ব্যস্ততার মাঝেই এক কারিগর বললেন, “রাত তিনটে থেকে এগারোটা, প্রায় কুড়ি ঘণ্টা কাজ হয়। দু-তিনটে শিফটে কারিগররা কাজ করেন।”  কিন্তু এটা তো মরশুমি মিষ্টি, বছরের অন্যান্য সময় কীভাবে উপার্জন করেন তাঁরা? রাজেশ জানান, শুধু এর ওপরে সারাবছর আর্থিকভাবে নির্ভর করা সম্ভব নয়, ফলে বছরের অন্য সময় অন্যান্য কাজে নিযুক্ত থাকেন। তাঁর মতে, এটা সত্যিই একটা সমস্যার জায়গা যেখানে তিন মাস পরে একসঙ্গে অনেক মানুষকে আবার অনিশ্চিত কাজের জীবনে ফিরে যেতে হয়।

কনকচূড় খই আর নতুন গুড়ের ‘খইচূড়’ কীভাবে হয়ে উঠলো জয়নগরের মোয়া, ঘরোয়া মিষ্টি থেকে জিআই পণ্যের শিরোপা লাভ, কীভাবে বাণিজ্যিক ভাবে এতটা পথ পেরোলো। জয়নগরের বিখ্যাত মা কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের (খোকনের মোয়া) কর্ণধার রাজেশ জানালেন, “১৯০০ সাল নাগাদ জয়নগরের মোয়ার বাণিজ্যকরণ শুরু হয়। তখন বাড়ির পুরুষরা হাঁড়িতে করে গঞ্জের হাটে, কখনও কখনও কলকাতায় গিয়ে মোয়া বিক্রি করতেন। দোকানে বিক্রি হওয়া শুরু হয় ১৯৩০ সাল নাগাদ। তারপরেও পেরিয়েছে অনেকটা সময়, জয়নগরের মোয়ার মূল বাণিজ্যকরণ শুরু হয় গত শতকের নব্বইয়ের দশকে।” বর্তমানে শুধু দোকানে গিয়ে নয়, ঘরে বসেও অনলাইনে অর্ডার দিয়ে পাওয়া যেতে পারে সুস্বাদু ও খাঁটি জয়নগরের মোয়া।

শুধু মোয়া তৈরি নয়, তার গুণগত মান পরীক্ষা ও উন্নতির জন্য রয়েছে পরীক্ষাগারও। তবে মোয়া-শিল্পে কিছু অসুবিধাও আছে বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। মোয়া তৈরি এবং বাজারজাত করা বেশ পরিশ্রমের ও খরচ সাপেক্ষ। কনকচূড় ধানও অন্য জায়গায় পাওয়া যায় না, ফলে এখন অনেক জায়গাতেই স্থানীয় উপাদান দিয়ে নিম্নমানের মোয়া তৈরি করে ‘জয়নগরের মোয়া’ নাম দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে, অনলাইনে মোয়া কেনার সুবিধা থাকার ফলে অনেকেই এখন অনলাইনে অর্ডার করে আসল মোয়ার স্বাদ নিতে চাইছেন। জানা গেল, সারা ভারত থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাতশো থেকে আটশো অর্ডার আসে অনলাইনে, এমনকি ভারতের বাইরে থেকেও অর্ডার আসছে। রাজেশ জানাচ্ছেন, “অনলাইনে এত বিপুল সংখ্যক অর্ডার আমরা প্রথমত আশা করিনি, তাই এখনও হয়তো পরিষেবার ক্ষেত্রে কিছু খামতি আছে, কিন্তু ক্রমশ উন্নতির চেষ্টা করছি।” তবে, কনকচূড় খই এবং নলেন গুড়ের অপ্রতুলতা মোয়া তৈরির ক্ষেত্রে অসুবিধার কারণ বলে স্বীকার করছেন ব্যবসায়ীরা।

শুধু মোয়া তৈরি নয়, তার গুণগত মান পরীক্ষা ও উন্নতির জন্য রয়েছে পরীক্ষাগারও। তবে মোয়া-শিল্পে কিছু অসুবিধাও আছে বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলার বিভিন্ন জায়গার নানান বিখ্যাত মিষ্টি চিরকালই রসনা তৃপ্তি করেছে আপামর বঙ্গবাসীর। তবে কালের নিয়মে তাতেও এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। কলকাতার রসগোল্লা যেমন বেকড্ হয়েছে, তেমনই জয়নগরের মোয়ার গায়েও লেগেছে চকোলেটের ছোঁয়া। ক্রেতাদের মধ্যে বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন চকোলেট মোয়া বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে দিনে দিনে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য No added Sugar মোয়া পাওয়া যাচ্ছে, ফলে, শরীরের ক্ষতি না করেও শীতকালে মোয়ার স্বাদ আস্বাদন করতে পারছেন ডায়াবেটিস রোগীরা।

২০১৫ সালের ২৩ মার্চ, জয়নগরের মোয়া পেল জিআই অর্থাৎ Geographical Indicationএর- শিরোপা। ভারতের মানচিত্রে জয়নগর আরও বেশি করে পরিচিত হলো বিখ্যাত মোয়ার জন্য। তবে মানুষের রসনা সরকারি স্বীকৃতির অনেক আগেই জয়নগরের মোয়াকে দিয়েছে ভালোবাসার স্বীকৃতি। তাই গঞ্জের হাটে বা পাড়ায় পাড়ায় মাটির হাঁড়ি থেকে অনলাইনের দৌলতে প্যাকেটবন্দি হয়ে বিদেশ পাড়ি, জয়নগরের মোয়া এগিয়ে চলেছে মিষ্টি ভবিষ্যতের দিকে।

Written by