শতবর্ষে এক নক্ষত্র—অরুন্ধতী

অভিনেতা, সম্ভবত এ দেশের প্রথম মহিলা পরিচালক, প্রযোজক, সুরকার, সংগীতশিল্পী

বাংলা সিনেমায় সুচিত্রা সেনের জনপ্রিয়তাও ম্লান হতে বাধ্য তাঁর মতো বহুমুখী প্রতিভার কাছে; অনেক বেশি সমকালীন তিনি। তাঁর অভিনীত চরিত্ররাই বুঝিয়ে দেয় শুধুমাত্র জনপ্রিয় নায়িকা হওয়ার তাগিদ তাঁর ছিল না। ১৯৫০-৬০ দশকে সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, মাধবী মুখার্জিদের পাশে তিনি ছিলেন বিশেষ এক নক্ষত্র—অরুন্ধতী। অরুন্ধতী দেবী। একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, সুরকার, নৃত্য ও সংগীতশিল্পী।

তাঁর এই বহুস্তরীয় জীবনের শুরু বিশ্বভারতীতে। গানের মধ্যে দিয়ে। যদিও অরুন্ধতীর ইচ্ছে ছিল চিত্রশিল্পী হবেন। তিনি যে সময় বিশ্বভারতীতে, কলাভবন তখন জমজমাট। তিনি যখন বারো বছরের কিশোরী, শান্তিনিকেতনে এসে সরাসরি রবীন্দ্রনাথের কাছে গানের পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। ছোটো থেকেই ভালো গান গাইতেন, এই পরীক্ষার জন্য অরুন্ধতীকে দুটি রবীন্দ্রসংগীত শিখিয়েছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। ‘যদি তোর ডাক শুনে’ আর ‘আমায় ক্ষম হে ক্ষম’। দুটি গানই মন দিয়ে শুনেছিলেন কবি, মুগ্ধ হয়েছিলেন। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের ছত্রছায়ায়, অনন্য এক সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে নতুন এক জীবনে প্রবেশ করেন। গান, নাচ, আঁকা সবই চলতে থাকে। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র-রা ছিলেন তাঁর সহপাঠী। গুরু ব্রজবাসী ও বালকৃষ্ণ মেননের কাছেও নাচ শিখেছিলেন অরুন্ধতী। বহুদিন আকাশবাণীতে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে জনপ্রিয় রেডিওশিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর কাছে সাধনার বিষয় বলে পারিশ্রমিক নিতেন না। 

অরুন্ধতী দেবী সম্পর্কে ইতিহাসবিদ তথা শিল্প-ইতিহাসবেত্তা তপতী গুহঠাকুরতার ছোটো-পিসিমা। অরুন্ধতীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন করতে গত ২৮ এবং ২৯ এপ্রিল, নন্দন ৩-এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তপতী এবং গুহঠাকুরতা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। অরুন্ধতীর নানা দিক নিয়ে আলোচনা ছাড়াও এই দুদিন তাঁর অভিনীত-পরিচালিত সিনেমা দেখানো হয়।

গান নিয়েই তাঁর এগোনোর কথা ছিল, অথচ কীভাবে যেন চলে এলেন অভিনয় জগতে। ১৯৫২ সালে নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত একটি নতুন সিনেমার (মহাপ্রস্থানের পথে) জন্য নতুন অভিনেতা খুঁজছিলেন পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। পাওয়া গেল বসন্ত চৌধুরী আর অরুন্ধতীকে। সেই শুরু। পাঁচের দশকে চিত্রনাট্যকার বিনয় চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ‘নিউ থিয়েটার্সে’-র ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ এবং ‘যাত্রিক’, ছবি দু’টিতে অভিনয়ের পর তাঁর জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে সাংবাদিক রবি বসু লিখেছিলেন– “নিউ থিয়েটার্সের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ ছবিটা নিয়ে তখন বাজারে ভীষণ হইচই। তার চেয়েও বেশি হইচই ওই ছবির নতুন নায়িকা অরুন্ধতী মুখার্জীকে নিয়ে। ওরকম সুন্দরী নায়িকা তখনকার দিনে আর কেউ ছিলেন কিনা সন্দেহ। তার ওপর দুর্দান্ত অভিনয়-প্রতিভা। সব মিলিয়ে দর্শকের কাছে অরুন্ধতী দেবীর আকর্ষণ ছিল ভয়ানক।” উত্তম কুমার তখনও স্টার হননি। অরুন্ধতীর সঙ্গে ‘বকুল’ ছবিতে অভিনয় প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “ওঁর সঙ্গে যখন অভিনয় করতাম, তখন খুবই সতর্ক থাকতাম। আমার নিজের অভিনয়ের মধ্যে ইনটেলেকচুয়াল ফ্লেভার মিশিয়ে দেবার চেষ্টা করতাম। না হলে মার খেয়ে যাবার ভয় ছিল।” এমনকি মার্জিত স্বভাব, অভিজাত চেহারার জন্য অরুন্ধতী দেবীকে বলা হত ‘উওম্যান অব ক্লাস’। তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনে বৈচিত্র্যময় সব চরিত্রের মধ্যে এই কথার সত্যতা সংরক্ষিত। 

‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছবিতে অরুন্ধতীর নির্বাক অভিনয় সহজে ভুলে যাওয়ার নয়। ফিজিক্যাল এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে অভিনয় করা মুখের কথা নয় বলেই তপন সিংহ বলেছিলেন, “ছবিতে ওঁর নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য সংলাপ।” কখনও ঝিন্দের বন্দির রাণী কস্তুরি, কখনও জতুগৃহের মাধুরী আবার কখনও ভগিনী নিবেদিতা। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘চলাচল’, ‘পঞ্চতপা’, ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’, ‘কালামাটি’, ‘হারমোনিয়াম’, ‘শশীবাবুর সংসার’, ‘ন্যায়দণ্ড’, ‘ছেলে কার’, ‘বিচারক’, ‘জন্মান্তর’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘কিছুক্ষণ’ ইত্যাদি ছবিতে বৈচিত্র্যময় সব চরিত্রের মধ্যে বিচরণ করেছেন অনায়াস। 

হারমোনিয়ামকে কেন্দ্র করে যে একটা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছিলেন তপন সিংহ। একটা হারমোনিয়ামের ক্রমাগত হাতবদল হচ্ছে আর তাকে কেন্দ্র করে এক-একটি জায়গায় ঘটছে হরেকরকম ঘটনা। তখন জমিদারি প্রথা অবলুপ্তির মুখে, আসছে ব্যবসাদারদের যুগ। জমিদার ভূপেন্দ্রকিশোরের (অসিতবরণ) তার একমাত্র মা-হারা মেয়ে বিমলার (অরুন্ধতী দেবী) জন্য একটি হারমোনিয়াম কিনে আনেন। হারমোনিয়ামটি বাবা-মেয়ের নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। তারপর ভূপেন্দ্রকিশোর মারা যান এবং সম্পত্তি হারিয়ে পথে বসে বিমলা। বিক্রি হয়ে যায় সেই হারমোনিয়াম। জীবনের এই অবস্থান-পরিবর্তনকে অসামান্য ভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আবার ‘বিচারক’ ছবিতে আমরা দেখতে পাই, অরুন্ধতী অভিনীত চরিত্রটি কয়লা খনির শ্রমিকদের সন্তানদের দেখাশোনার কাজ করেন। বাড়িতে পঙ্গু স্বামী। পেশা আর সাংসারিক চাপে পিষ্ট এক বিপন্ন নারীর কথা ব্যক্ত করেছিলেন অভিনয়ে।               

 

অভিনেতা হিসেবে সবচেয়ে পরিচিতি পেলেও, দাম্পত্যজীবনের গেরোয় পড়ে অভিনয়ক জীবনকে সেভাবে বেশিদিন ধরে রাখতে পারলেন কই! পরিচালক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম পরিণয় সুখের হয়নি তাঁর জন্য। স্ত্রীকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন প্রভাত। তাঁদের তখন দুই সন্তান। সন্দেহ, নিয়মিত পারিবারিক কলহ অরুন্ধতীর আত্মসম্মানে ঘা দেয়। অতঃপর বিবাহবিচ্ছেদ। মানসিক তখন তাঁর পাশে ছিলেন তাঁর বন্ধু, পরবর্তীতে জীবনসঙ্গী পরিচালক তপন সিনহা। কী পরিমাণ শ্রদ্ধা অরুন্ধতী দেবীকে তিনি করতেন, তা তপন সিনহার লেখা বই, সাক্ষাৎকার পড়লেই জানা যাবে। 

অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমা ও সংগীত পরিচালনাও করে গিয়েছেন, যতটা সম্ভব। অথচ সেই কাজগুলি নিয়ে আলোচনা হয় না। দেখানোর ব্যবস্থা নেই তাঁর পরিচালিত ছবিগুলি। কথাসাহিত্যিক বিমল করের ‘খড়কুটো’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬৭ সালে অরুন্ধতী দেবী নির্মাণ করেন বিয়োগান্তক রোম্যান্টিক ছবি ‘ছুটি’। এই ছবির জন্য তিনি নির্বাচন করেছিলেন এক নতুন জুটিকে। মৃণাল মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিনী মালিয়ার অভিনয় মুগ্ধ করেছিল দর্শকদের। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী রণেন আয়ন দত্তর আঁকা ছবির পোস্টার আর ছবির একটি বিশেষ দৃশ্যে স্বপ্ন সম্পর্কিত কথোপকথনই জানিয়েছিল নায়ক-নায়িকার অদৃষ্ট। ছবিটি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছিল একাধিক ‘বিএফজে’ পুরস্কারও। সেরা পরিচালকের পুরস্কারও জিতে নিয়েছিলেন অরুন্ধতী দেবী। ছবিটাও তো সুপার-ডুপার হিট হয়েছিল। পরের ছবি রবীন্দ্রনাথের ‘মেঘ ও রৌদ্র’। আরও পরে পরিচালনা করেন ছোটোদের ছবি লীলা মজুমদারের কাহিনি অবলম্বনে ‘পদিপিসীর বর্মি বাক্স’। অসাধারণ অভিনয় করেন ছায়াদেবী। অরুন্ধতী দেবীর চতুর্থ পরিচালিত ছবি ‘দীপার প্রেম’। তাঁর পরিচালিত প্রত্যেকটি ছবিতেই তিনি সংগীত পরিচালনা করেছিলেন। তবে, প্রথম সুরারোপ করেছিলেন ১৯৬২ সালে পীযূষ বসুর ‘শিউলি বাড়ি’ ছবিতে। তাঁর সুরে মৃণাল চক্রবর্তী গেয়েছিলেন ‘রাই জাগো রাই জাগো’। গানটি উত্তমকুমারের লিপে। অমর পালের কণ্ঠেও গানটি ছবিতে শোনা যায়।

১৯২৪ সালের ২৯ এপ্রিল, ঢাকার অভিজাত গুহঠাকুরতা পরিবারে তাঁর জন্ম। এবছর গত এপিলেই শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে অরুন্ধতী দেবীর। জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে ঘিরে চলছে নানা স্মরণ অনুষ্ঠান, পত্রপত্রিকায় লেখালিখি। অরুন্ধতী দেবী ইতিহাসবিদ তথা শিল্প-ইতিহাসবেত্তা তপতী গুহঠাকুরতার ছোটো-পিসিমা। অরুন্ধতীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন করতে গত ২৮ এবং ২৯ এপ্রিল, নন্দন ৩-এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তপতী এবং গুহঠাকুরতা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। অরুন্ধতীর নানা দিক নিয়ে আলোচনা ছাড়াও এই দুদিন তাঁর অভিনীত-পরিচালিত সিনেমা দেখানো হয়। এছাড়া অন্যান্য কিছু সংগঠনের তরফেও তাঁর সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক জগত থেকে তিনি যতটা না পেয়েছেন, দিয়ে গিয়েছেন অনেক কিছু। শতবর্ষে এটুকু তাঁর প্রাপ্য ছিল।     

ঋণ:
তপতী গুহঠাকুরতা
অন্তরের অন্দরে রয়ে গেল গান, আনন্দবাজার পত্রিকা
অসাধারণ প্রতিভাময়ী, বাংলা লাইভ.কম 

Developed by DXDasia