মালদার জিভে কনসাটের স্বাদ

এই মিষ্টি চেখে দেখতে গেলে জানতেই হবে সেরা দোকানের হদিশ

ইন্দিরা গান্ধী মালদায় এসে কানসাট খেয়ে গণি খান চৌধুরীকে একবার বলেছিলেন, দিল্লিতে যতবার আসবে কানসাট নিয়ে আসবে। তারপর থেকে গণি পরিবারে বড় মাপের কোনো অতিথি এলে কানসাট চাই-ই। গণি খান চৌধুরী বেঁচে থাকাকালীন সেই রেওয়াজ ছিল। আজ তিনি নেই, তবুও কানসাট যাওয়া বন্ধ হয়নি। এই মিষ্টি পাতে না পড়লে নাকি ঠিকমতো অতিথি অ্যাপায়ন হয় না। মালদার এই মিষ্টি এখন বিদেশেও জনপ্রিয়। বিশেষত তার মনভোলানো স্বাদের জন্য। প্রবাসী বাঙালি ঘরে ফিরলে কানসাটের সামনে লম্বা লাইন পড়ে। টাটকা মিষ্টি তার চাই-ই। 

ওপার বাংলায় বারোটি এমন জায়গার নাম পাওয়া জায়, যেখানকার মিষ্টি বিখ্যাত। এর মধ্যে রয়েছে শিবগঞ্জের কানসাট। বাংলাদেশের বগুড়া জেলার উপজেলা শিবগঞ্জ। কানসাট এই উপজেলার এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। আম চাষের জন্য জগৎ বিখ্যাত। কানসাটের আম আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতেও প্রসিদ্ধ। সৌদিতে এই আমই বিক্রি হয় চড়া দামে। কানসাট গ্রামের নামেই মিষ্টি।

কানসাট গ্রামের ছেলে মহেন্দ্রকুমার সাহা। ব্রিটিশ আমলেই শিবগঞ্জ ছেড়ে এসেছিলেন মালদায়। ওখানেই মিষ্টির দোকান করেছিলেন। তাঁরই ছেলে বিজয়কুমার সাহা। নিজস্ব রেসিপি দিয়ে তৈরি করেছিলেন নতুন কানসাট। দোকানের নামও দিলেন এই মিষ্টির নামানুসারে। কয়েকদিনের মধ্যে সমস্ত মিষ্টিকে ছাপিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠল বিজয় কুমারের মিষ্টি। এই দোকানে নানা সাইজের কানসাট পাওয়া যায়। বাকি মিষ্টি প্রায় ব্রাত্য। খরিদ্দার অন্য মিষ্টি চাইলে যেন ফিরে না যান, সে ব্যাপারে নজর রাখতে হয়। লাইন দিয়ে কিনতে হয় এই মিষ্টি। বাপ-ঠাকুরদার ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন জয়দেব আর বিশ্বজিৎ। আধুনিক কানসাটের জন্ম তাঁদের হাত ধরেই। এখন মালদার অনেক দোকানেই পেয়ে যাবেন এই মিষ্টি। শুধু কানসাটকে প্রাধান্য দিয়ে অন্য মিষ্টি কম তৈরি হোক, এই সাহস কেউ এখনও পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেননি। দু-একবার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু সফল হননি কেউই। জয়দেব আর বিশ্বজিতের এই রহস্যময় রেসিপি আজও কেউ জানতে পারেননি। সেজন্যই কানসাট চেখে দেখার জন্য সকাল থেকে লম্বা লাইন।

মালদা স্টেশন থেকে মাত্র পনেরো মিনিট আর বাসস্ট্যান্ড থেকে দশ মিনিট। মকদমপুরে দোকানে পৌঁছে যাবেন। সেরা মিষ্টি তৈরির জন্য হাট থেকে বেছে বেছে ক্ষীর কেনেন দুই ভাই। বাজার চলতি ক্ষীর যদি নকল হয়, তাই ঝুঁকি নেন না। এই মিষ্টি বিদেশেও যায়। কাঠের জালে ছানা তৈরি হয়। বিশ্বজিৎ আর জয়দেব বলেন, কাঠে জ্বাল দিয়ে ছানা তৈরিটাই আসল। জ্বালে একটু হেরফের হলেই মিষ্টির গুণ পাল্টে যাবে। মালদায় গেলে একবার কানসাট চেখে দেখবেন। দোকানে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। বাপ-ঠাকুরদার আমলের দোকানই রয়েছে। দু-ভাইয়ের কথায়, বাহ্যিক দৃষ্টিতে কীই বা এসে যায়। মিষ্টির গুণগত মান একইরকম আছে বলেই কানসাট আজও মানুষের মনে নিজের জায়গা অটুট রাখতে পেরেছে।

Developed by DXDasia