২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় টিএএস সংস্থাটি
সুগন্ধি মোমবাতির চাহিদা চিরকালীন। তা সে পুজোতেই হোক বা ঘরে আনন্দদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে। সুগন্ধ আমাদের মানসিকতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুগন্ধি বস্তু আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, নিদ্রাচক্রকে স্বাভাবিক রাখে, মানসিক উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে সুগন্ধি মোমবাতি অত্যন্ত কার্যকরী। এগুলি গৃহসজ্জার কাজেও ব্যবহৃত হয়। উপরন্তু, মোমবাতিগুলি অক্ষত থাকে অনেকদিন। তাই সারা বিশ্ব জুড়েই এদের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবাদর্শে অনুপ্রণিত হয়ে ২০১৭ সালে সোহিনী এবং প্রণয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠা করেন টেগোর অ্যাপ্রিসিয়েশন সোসাইটি (Tagore Appreciation Society- TAS), যা শিলিগুড়ি-কেন্দ্রিক একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা। জন্মলগ্ন থেকেই এই সংস্থা স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নতির জন্য কাজ করে আসছে। এই সংস্থাটি প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে তাঁরা স্বচ্ছ্বল জীবন কাটাতে পারেন।
সুগন্ধি মোমবাতি মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে কার্যকরী উপকরণ
বর্তমানে নারী ক্ষমতায়ন সারা বিশ্বজুড়েই সামাজিক উন্নতির একটি উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ। ভারতে বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রান্তিক মহিলাদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়। বিভিন্ন এনজিও, প্রশাসনের সঙ্গে মিলিতভাবে মহিলাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাঁদের জন্য রোজগারের পরিসর তৈরি করে।
২০২২ সালের শেষের দিকে, টিএএস (TAS) এবং পশ্চিমবঙ্গ তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি, এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণির উন্নয়ন এবং অর্থায়ন কর্পোরেশন (WBSCSTOBCDFC) মোমবাতি তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, যেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন শিলিগুড়ি ও তৎসংলগ্ন এলাকার ৪০ জন প্রান্তিক মহিলা। তাঁরা সুগন্ধি মোমবাতি তৈরি করেছিলেন, যা সংস্থার মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করা হয়েছিল। টিএএসের আরেকটি শাখাতে ফ্লাওয়ার ওয়্যাক্স ট্যাবলেট তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে অংশগ্রহণ করেন কালিম্পং-এর একটি ছোট্ট গ্রাম সিন্ডেবঙ্গ-এর মহিলারা। গ্রামটি প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও বাসিন্দারা আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছ্বল নন। তাই এখানকার মহিলারা একত্রে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তুলছেন।
‘দ্য আজমবাড়ি টেলস’ (The Ajambari Tales) এক অপূর্ব নান্দনিক অনুভূতির সৃষ্টি করে। এই গ্রামে যেসব রঙবেরঙের ফুল পাওয়া যায়, তার সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে মোমবাতি, ফটোফ্রেম, ফুলের তোড়া, গৃহসজ্জার অন্যান্য সামগ্রী। এই কাজে ব্যবহার করা হয় শুকনো ফুলের পাপড়ি। স্থানীয়রা এই কাজে প্রচুর উৎসাহ দেখাচ্ছেন। ফুল সংগ্রহ করা থেকে জিনিস তৈরি করা, সবকিছুতে তাঁরা তাঁদের চারপাশের প্রকৃতিকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন রোজ। এই প্রকল্প তাঁদের দক্ষতা বাড়িয়ে তুলেছে প্রবলভাবে। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার আনন্দ পাচ্ছেন। মহিলাদের স্টাইপেন্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। উপরন্তু, প্রশিক্ষণ নিতে কোনও পয়সা খরচ করতে হয় না। প্রতিটি প্রকল্পের শেষে টিএএস সর্বাধিক দক্ষ শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে এবং তাঁদের রোজগারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রকল্পটি ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে। প্রচুর মহিলা প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন। প্রকল্পটির প্রধান হলেন টিএএসের কার্যনির্বাহী সদস্য রাধিকা ঘোষ কর্মকার। সহায়তায় রয়েছেন ডেপুটি প্রকল্প ম্যানেজার জিতেশ মেহতা ও ভিরাল দোশী। প্রশিক্ষকদের মধ্যে আছেন নন্দলাল শাহ, অনিন্দিতা বোস, সরোজা ছেত্রী, খুশবু শর্মা। প্রথমদিন থেকেই প্রশিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়পক্ষই সর্বোচ্চ মনোযোগের সঙ্গে আজমবাড়ি টেলস প্রকল্প-তে কাজ করছেন। আজমবাড়ি ঐ এলাকার একটি স্থানীয় ফুল। অঞ্চলের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন, আজমবাড়ি ফুল-এর মৃত্যু নেই। প্রতিটি মোমবাতি ও অন্যান্য সামগ্রী পরম যত্নে আর ভালোবাসায় তৈরি করা হয়। দ্রব্যগুলির সঙ্গে জুড়ে থাকে আবেগ, দক্ষতা, শৈল্পিক ভাবনা আর প্রকৃতি। দ্রব্যগুলিকে আজমবাড়ি লাক্সারি সুগন্ধি মোমবাতি ও ওয়্যাক্স ট্যাবলেট নামে বাজারে বিক্রি করা হয়। শুরু হওয়ার মাত্র ১০ মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি সবার নজর কেড়েছে। অন্য অনেক এনজিও এবং প্রশাসনিক সংস্থাগুলিও একে মডেল প্রকল্প হিসাবে দেখছে।

প্রাথমিক ভাবে ৪ মাসের প্রশিক্ষণ প্রকল্পটি এখন সুগন্ধি মোমবাতি তৈরির প্রকল্পে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রকল্পের সাফল্যে উৎসাহিত হয়েছে রাজ্য প্রশাসনও। সম্প্রতি মালদা জেলার জেলাশাসক এবং অন্যান্য আধিকারিকরা টিএএসের সদস্যদের একটি আলোচনাচক্রে আহ্বান করেছিলেন। টিএএস-কে অনুরোধ করা হয়েছে নতুন প্রকল্পের ধারণা দেওয়ার জন্য এবং মালদা জেলায় প্রান্তিক মহিলাদের জন্য এরকম স্বনির্ভর প্রকল্প চালু করার সম্ভাবনা সম্পর্কে খতিয়ে দেখতে।