কলকাতার সাবেকি বাড়িগুলিতে ক্যাফে তৈরির ধুম : যেভাবে জন্ম নিল এই ট্রেন্ড

জানাচ্ছেন জনপ্রিয় কয়েকটি ক্যাফের কর্ণধাররা

মাড ক্যাফে, দ্য ভবানীপুর হাউজ, দ্য রেড বাড়ি, বুনাফিল ক্যাফে, বৈঠকখানা ক্যাফে …বলতে পারবেন ক্যাফেগুলোর মধ্যে মিল কোথায়? হ্যাঁ, প্রত্যেকটিতেই খাবার, কফি ইত্যাদি মিলবে কিন্তু তা ছাড়াও আর একটি মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্যাফেই গড়ে উঠেছে কোনও না কোনও পুরোনো বাড়িতে। যেমন মাড ক্যাফে তৈরি হয়েছে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী প্রয়াত দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়িতে, আবার নবনীতা দেব সেনের বাড়িতে গড়ে উঠেছে বুনাফিল ক্যাফে, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িটি এখন বৈঠকখানা ক্যাফে হিসাবেই জনপ্রিয়, কালীঘাটের সদানন্দ রোডের প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো এক বাড়িকে সংস্কার করে বানানো হয়েছে দ্য রেড বাড়ি। বাড়িটির মালিক ছিলেন উকিল পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা দক্ষিণ কলকাতাজুড়ে এমন অজস্র বাড়িতে গড়ে উঠছে ক্যাফে, কেবল দক্ষিণেই নয়! উত্তর কলকাতা, সল্টলেকও পিছিয়ে নেই কোনও অংশে। কিন্তু কীভাবে জন্ম হল পুরোনো বাড়িকে ক্যাফেতে বদলে ফেলার এই প্রবণতার? এটা কি একেবারেই হাল আমলের ট্রেন্ড? নাকি ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে?

দ্য রেড বাড়ি

সাবেকি বাড়ির, সাবেকিয়ানার স্বাদ পেতেই মানুষ পুরোনো বাড়িতে তৈরি ক্যাফেগুলোতে যাচ্ছেন, ভিড় করছেন। সবটাই চাহিদা আর সরবরাহের আদিম সম্পর্ক, মানুষের দাবি মেনেই একের পর এক সাবেকি বাড়িতে ক্যাফে গড়ে উঠছে। ইতিহাস, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ হচ্ছে, এটাও এই প্রবণতার ইতিবাচক দিক।

ইংল্যান্ডে এবং ইউরোপের একাধিক দেশে পুরোনো রাজপ্রসাদকে হোটেলে বদলে ফেলার একাধিক নজির আছে, এ দেশেও কিছু কিছু জায়গায় রয়েছে। আজকাল বাংলাতেও রাজবাড়িগুলোকে পর্যটন শিল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু পুরোনো বাড়িতে ক্যাফে কালচার! এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, কলেজ স্ট্রিট ইন্ডিয়ান কফি হাউজের বাড়িটির একদা মালিক ছিলেন রামকমল সেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের প্রানপুরুষ কেশব সেনের ঠাকুরদা। একালে ফেরা যাক, কেন একের পর এক পুরোনো বাড়িতে গড়ে উঠছে ক্যাফে? কথা বলেছিলাম, বেশ কয়েকটি ক্যাফের কর্ণধার এবং ম্যানেজারদের সঙ্গে।

দ্য ভবানীপুর হাউজ
নৃপেন্দ্রনাথ সরকার এবং তাঁর স্ত্রী লেডি নবনলিনী সরকার দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের বকুলতলায় তৈরি করেছিলেন তাঁদের বাড়ি। পরে সেই বাড়ি কিনে নেন দুই ব্যবসায়ী। নাম হয় দ্য ভবানীপুর হাউজ, সেখানেই রয়েছে ক্যাফে। বাড়িটির বয়স প্রায় একশোর কাছাকাছি। দ্য ভবানীপুর হাউজ ক্যাফের ম্যানেজার অতনু মাহালার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলছিলেন, পুরোনো জিনিস মানুষের মন থেকে মুছে যায়। তাঁরা স্মৃতিটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। সেকালের জিনিসগুলোকেই রেখেছেন তাঁরা। টালি দিয়ে করা ব্যালকনি, সব মিলিয়ে সাবেকিয়ানাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। অতনুর কথায়, “ক্যাফে কালচার বিদেশ থেকে নেওয়া। বাড়ির নিচে ছোটো/বড়ো ক্যাফে আছে, বিদেশে এমন অজস্র দেখা যায়। সেই কালচার দেখেই এখানে ক্যাফে খোলা হচ্ছে। এখন কলকাতার মানুষ যাঁদের পুরোনো বাড়ি আছে অথবা গ্যারেজেই ক্যাফে খুলে দিচ্ছেন। সেখানে সারাদিন অফিস/স্কুল-কলেজ করে বা অবসরে একটু আড্ডা, চা-কফি-খাবার খেতে আসছেন অনেকেই। আয়ের সঙ্গে সঙ্গে আড্ডারও একটা আধুনিক সংস্করণের জন্ম হয়েছে।” 

দ্য ভবানীপুর হাউজ

পুরোনো বাড়িতে ক্যাফে খোলা হলে ব্যবসায়িক দিকে কি বেশি লাভ হচ্ছে? অতনুর কথায়, সাবেকি বাড়ির নস্টালজিয়া ক্যাফের ব্যবসা বাড়ায়। বললেন, “পুরোনো বাড়ি, তার গল্প, স্থাপত্যশৈলী মানুষ দেখতে চায়। আগেকার দিনের সিলিং, বিশ ইঞ্চি চওড়া দেওয়াল, সেকালের আলো, ঘড়ি, আসবাবপত্র, বড়ো ফ্যান; এগুলো এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মনেও  কৌতূহল তৈরি করে। অনেকেই আসে খাবারের পাশাপাশি সে’সব উপভোগ করতে। মানুষের মুখে মুখে শুনে আসে। ছবি তোলে, ভিডিও করে।” 

বুনাফিল ক্যাফে
এই মুহূর্তে বুনাফিল ক্যাফের দুটি শাখা আছে শহরে, একটি নবনীতা দেব সেনের বাড়িতে এবং অন্যটি দেড়শো বছরের পুরোনো এক দুর্গা মন্দিরে। এই ক্যাফেটিও বাঙালিয়ানাকে তুলে ধরছে। বুনাফিল ক্যাফের কর্ণধার সোনিকা দে-র স্বামী পারোমিক দাস জানালেন, তাঁরা হেরিটেজ ঘোষিত বাড়িগুলোতেই ক্যাফে খোলেন। সাবেকি বাড়িকে ক্যাফেতে রূপান্তরিত করার প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “এটা এখন ট্রেন্ড। বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ।” জানালেন, তাঁদের ক্যাফের খাবার থেকে শুরু করে অন্দরসজ্জা সবই বাঙালিয়ানাকে মাথায় রেখে করা। খড়খড়ি জানলা, নকশাদার  বার্মাটিকের আসবাব, সেগুন কাঠের দরজা, লাল মেঝে, সাদা-কালো চেকার মেঝে, হলদে আলো, সব কিছুই সাবেকি। আরও বললেন, “আমরা বাঙালি ক্রেতাদেরই ‘টার্গেট’ করছি। তাঁরা নস্টালজিয়াপ্রেমী, তাঁরা সংস্কৃতি-সাবেকিয়ানা ভালোবাসেন। সেভাবেই আমরা তুলে ধরছি সব। আমাদের এখানে প্রবীণ-নবীন সকলেই আসেন, অনেকেই সপরিবার আসেন। এখানে সময় কাটান। এখন সবাই মোটামুটি ফ্ল্যাটে চলে গেছে, তাই কিছুক্ষণের জন্য পুরোনো বাড়ির স্বাদ পেতে, পুরোনো পরিবেশ পেতে এই ধরনের ক্যাফেগুলোতে আসছে। স্পেশ্যালিটি কফি সেন্টার হয়েও আমরা চা রাখি। বাঙালি এখনও দার্জিলিং টি-ই বেশি পছন্দ করে।”

বুনাফিল ক্যাফে

বৈঠকখানা ক্যাফে
কলেজ স্ট্রিটের বৈঠকখানা ক্যাফে চালান দুই ভাইবোন, অর্চিতা নাথ খাঁ এবং বাণীব্রত নাথ খাঁ। তাঁরা চারপুরুষ ধরে যে বাড়িতে থাকেন, তার একতলায় রয়েছে ক্যাফেটি। একদা এই বাড়ির মালিক ছিলেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন ডিরোজিয়ানদের অর্থাৎ ইয়ং বেঙ্গলের সভ্যদের আড্ডা জমত এখানে। বৈঠকখানা ক্যাফের যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে। অর্চিতা বললেন, নতুন কিছু করার তাগিদ থেকেই তাঁদের ক্যাফে খোলা। বাড়ির মধ্যে ক্যাফে তৈরির ট্রেন্ড সম্পর্কে অর্চিতার মত, “কাজের অপ্রতুলতা একটা বড়ো কারণ। এখন সবাই ভাবছে, কিছু একটা করি। বাড়িতেই ক্যাফে মানে কোথাও বেরোতে হচ্ছে না। যাতায়াত করতে হচ্ছে না। ছোট্ট ব্যবসা করে কোনও কিছু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেলে ক্ষতি কোথায়?” 

বৈঠকখানা ক্যাফে

অর্চিতা বলছিলেন একেবারে প্রথমে গুটিকয়েক মানুষ জানতেন এই বাড়ির ইতিহাস। পরে ক্রেতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচার হয়েছে, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে একটা ক্যাফে হয়েছে। এখন ইতিহাসপ্রেমী মানুষেরাও আসেন। 

বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন, চাকরির পিছনে না ছুটে তাঁরা নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করতে চাইছেন। ক্যাফের ব্যবসা অন্যতম হয়ে উঠে আসছে। সাবেকি বাড়িতে ক্যাফে খোলার সুবিধা মিলছে। সাবেকি বাড়ি ব্যবসার ইউএসপি হয়ে উঠছে। এখন রেট্রোর যুগ, ফেলে আসা দিনে ফেরার বা ফেলে আসা সময়কে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্খা বাড়ছে। রেস্তোরাঁয় গিয়ে কলাপাতা, পিতল-কাঁসার বাসনে মানুষ খাচ্ছেন, বেড়াতে গিয়ে মাটির ঘরে থাকতে পছন্দ করছেন। বাঙালির শিকড়ের টান বেশি, অতীত বিলাসে সে মেতে থাকে। সাবেকি বাড়ির, সাবেকিয়ানার স্বাদ পেতেই মানুষ পুরোনো বাড়িতে তৈরি ক্যাফেগুলোতে যাচ্ছেন, ভিড় করছেন। সবটাই চাহিদা আর সরবরাহের আদিম সম্পর্ক, মানুষের দাবি মেনেই একের পর এক সাবেকি বাড়িতে ক্যাফে গড়ে উঠছে। ইতিহাস, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ হচ্ছে, এটাও এই প্রবণতার ইতিবাচক দিক।

Developed by DXDasia