ইয়ং বেঙ্গল দলের সভা বসত এই বাড়িতে
বাংলায় বর্তমানে রমরমিয়ে চলে ক্যাফে-সংস্কৃতি। শুধু কলকাতা নয়, তার ছোঁয়া পেয়েছে মফসসলও। শহরের অলিতে-গলিতে নিত্যনতুন ক্যাফে খুলে যাচ্ছে প্রায়শই। সুস্বাদু পানীয়, জিভে জল আনা খাবারের সঙ্গে সেখানে ছড়িয়ে থাকে অভিনব থিম, অসাধারণ শিল্পভাবনা, আরামদায়ক পরিবেশ। আর থাকে আড্ডা, গল্প, একত্রযাপন। আসলে বাঙালিয়ানা আড্ডা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। চায়ের দোকান, রোয়াকের আড্ডাগুলো সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে উঠেছে, তা বদলে গিয়েছে ক্যাফেতে।

আড্ডা বললেই মনে পড়ে উত্তর কলকাতা-র কথা। পুরোনো সময় এখানে এখনও আড্ডা দেয় নতুনের সঙ্গে, মনখারাপ করা বিকেলের ছোঁয়া লেগে মন ভালো হয়ে যায়। সেই আড্ডা আর স্মৃতিমেদুরতা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলেজ স্ট্রিটের বৈঠকখানা ক্যাফে। বিধান সরণীতে অবস্থিত এই ক্যাফে, যার প্রতি কোনায় রয়েছে সাবেকিয়ানার নস্টালজিয়া। ক্যাফেটির মালিকানা এখন খাঁ পরিবারের হাতে। অর্চিতা নাথ খাঁ এবং বাণীব্রত নাথ খাঁ- দুই ভাইবোন মিলে দেখাশোনা করেন। ক্যাফের দেওয়াল জুড়ে রঙিন ম্যুরাল, গ্রাফিতি এঁকেছেন বাণীব্রতর স্ত্রী শ্রাবণী নাথ খাঁ। বাড়িটির পূর্বতন মালিক ছিলেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বোন ত্রৈলোক্যমোহিনী দেবীর ছেলে নিবারণ মুখোপাধ্যায় পেশায় ছিলেন উকিল। বাণীব্রত খাঁয়ের বাবা বলাইচাঁদ নাথ খাঁ, নিবারণবাবুর কাছ থেকে বাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ইয়ং বেঙ্গল দল (young Bengal group)-এর সদস্য। এই বাড়িতেই সভা বা আলোচনায় বসতেন ডিরোজিও, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামতনু লাহিড়ীরা। ইতিহাসের আলো লেগে থাকা এই বাড়িটিকে খাঁ পরিবার বদলে দিয়েছেন ঘরোয়া ক্যাফেতে, যেখানে সাবেকি বৈঠকখানার আড্ডার স্বাদ পায় আজকের প্রজন্ম।

গোটা ক্যাফের পরিবেশটাই ঘরোয়া। স্বল্প আয়োজনে সুন্দরভাবে সাজানো গোটা জায়গাটি। নরম আলোয় নয়নাভিরাম হয়ে উঠেছে ঘরগুলি। ছাদে কড়িবরগা আর দেওয়ালে গ্রাফিতি- কলকাতার ইতিহাস আড্ডা দেয় আজকের কলকাতার সঙ্গে। আর সেই নীরব গল্প শুনতে শুনতে গ্রাহকেরা পেয়ে যাবেন চা, কফি, স্যান্ডউইচ, স্যুপ ইত্যাদি সুস্বাদু খাবার।

এখনকার প্রায় সব ক্যাফেই থিমেটিক। কিন্তু বৈঠকখানা ক্যাফেতে যেহেতু ঘরই হয়ে উঠেছে ক্যাফে, আর ছোঁয়া পাওয়া যায় আসবাবেও। টেবিল, চেয়ার, বাঁশের টুল, বেঞ্চ, কুশন আর ঘরের বাইরে রোয়াক- বাড়ি বাড়ি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চায়ের পাত্র জুড়ে, জমে ওঠে আড্ডা- কলকাতা থাকে কলকাতাতেই। এখনকার সময়ে পুরোনো বাড়ি প্রায়শই চলে যায় প্রোমোটারের হাতে। সেখানে এত বড়ো, পুরোনো, ঐতিহাসিক বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখা- ঝাঁ-চকচকে সময়ে এ যেন দুলকি চালের কলকাতাকে বাঁচিয়ে রাখা, যে কলকাতা আলগা আলোর, যে কলকাতা শত দুঃখেও আনন্দময়।
খাবারের মেনু