দার্জিলিং বা আসাম নয়, এবার চুমুক দিন ‘ডুয়ার্স চা’-এ

দার্জিলিং বা আসাম চায়ের বদলে কাপ-এ ডুয়ার্স চা দেখে আশ্চর্য হবেন না যেন!

নামীদামী হোটেল, রিসর্ট ছাড়া সারা পৃথিবী জুড়ে যত ক্যাফে রয়েছে, কোথাও গিয়ে ডুয়ার্সের চা (Dooars tea) পেয়েছেন? সম্ভবত না। বাংলার এই চা নিয়ে চা-বাগানের মালিক থেকে শুরু করে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সংস্থা, কারোরই খুব একটা মাথা ব্যাথা আছে বলে মনে হয় না।

স্বাদ, গন্ধ ও বৈচিত্রের বিচারে বরাবরই প্রথম স্থানে রয়েছে দার্জিলিং চা (Darjeeling Tea) এবং তার ঠিক পরেই, দ্বিতীয় স্থানে আসামের সিটিসি (Assam CTC)। কিন্তু, ব্রিটিশ আমলে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ডুয়ার্স চায়ের ভালোই সুখ্যাতি ছিল। যদিও সেভাবে ব্যবসায়ীদের নজর কাড়তে পারেনি এই চা। দার্জিলিং-এর প্রবীণ টি-প্লান্টার কমলেশ বসু-র কথায়, “দার্জিলিং চা হল দামী শ্যাম্পেনের মতো, তার নিজস্ব পরিচিতি আছে। ডুয়ার্স চা কখনই তার বিকল্প হতে পারে না, এমনকী আসামের সিটিসি চায়ের সঙ্গেও এর তুলনা চলে না। ডুয়ার্সের চা বিশ্বজুড়ে জয়প্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছাতে পারেনি, তার প্রধান কারণ হলো ডুয়ার্সের প্রতিকূল জলবায়ু এবং দুর্বল মাটি।”

কমলেশবাবুর এই বক্তব্য খুব একটা অন্যায্য বলে মনে হয় না। ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত দার্জিলিং-এর মন মাতানো সব পর্বতশৃঙ্গ, আবহাওয়া, ঐতিহ্য সবকিছুই উপভোগ্য। সে সব তো ঠিকই আছে  তবে, ভারতের বাইরে আবিশ্বে দার্জিলিঙের জনপ্রিয়তা কিন্তু এখানকার চায়ের জন্যই। বিশ্ব-বাজারে যত রকমের চা পাওয়া যায়, তার মধ্যে এটিই বরাবর সেরার শিরোপা পেয়েছে ।

কিন্তু, ডুয়ার্স কেন এই জায়গাটা দখল করতে পারলো না, যেখানে আমাদের রাজ্যের এই অবিচ্ছেদ্য অংশটি জুড়ে শত শত চা বাগান রয়েছে? যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯০ থেকে ১৭৫০ মিটার উচ্চতায় চা জন্মে?

ব্রিটিশ প্লান্টাররা ডুয়ার্সে চা-চাষের প্রচলন করলেও ভারতীয় উদ্যোক্তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল তাতে, এঁরাই পর্যায়ক্রমে জমি অনুদান-প্রদানের মাধ্যমে নতুন নতুন চা-বাগানের জন্ম দিয়েছিলেন।

কোচবিহার জেলার একটি ছোটো অংশ সহ জলপাইগুড়ি জেলার চা-উত্পাদিত অঞ্চলগুলি ডুয়ার্স নামে পরিচিত। হিমালয়ের পাদদেশে দার্জিলিং-এর ঠিক নীচেই জাম্বো, গণ্ডার, পর্ণমোচী অরণ্য, ঝর্ণা এবং চা-এর গালিচা দিয়ে মোড়া এর ভূপৃষ্ঠ। এর উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে ভুটান এবং দার্জিলিং, দক্ষিণে কোচবিহার এবং বাংলাদেশ, পূর্বে আসাম। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার বলা হয় ডুয়ার্সকে (বাংলা, অসমীয়া এবং নেপালি ভাষায় এর অর্থ ‘দরজা’)। ব্রিটিশ প্লান্টাররা ডুয়ার্সে চা-চাষের প্রচলন করলেও ভারতীয় উদ্যোক্তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল তাতে, এঁরাই পর্যায়ক্রমে জমি অনুদান-প্রদানের মাধ্যমে নতুন নতুন চা-বাগানের জন্ম দিয়েছিলেন। শুরুটা ভালো ভাবে হলেও বছরের পর বছর প্লান্টারদের দ্বারা অবহেলিত হওয়া এবং প্রতিকূল জলবায়ু পরিস্থিতি এই চায়ের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হয়।

ডুয়ার্স চায়ের সবচেয়ে ভালো দিক হল অন্যান্য চায়ের তুলনায় এই চা অনেকটাই সস্তা, সেকারণে স্থানীয় অঞ্চলে এর বড়োসড়ো একটা বাজারও রয়েছে। কমলেশ বাবুর কথায়, “শুরুর দিকে রাশিয়ার মতো দেশেও রপ্তানি করা হতো কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই চাহিদা হারায় ডুয়ার্স চা। কারণ, বিদেশী গ্রাহকরা আসাম চা বেশি পছন্দ করতে শুরু করেছিল। ৮০-র দশকের শেষ দিকে এবং ৯০-এর গোড়ার দিকে রাশিয়ান ব্লেন্ডাররা কম দামে ডুয়ার্স চা কিনে ভালো মানের আসাম সিটিসি-র সঙ্গে মেশানো শুরু করে। ডুয়ার্স চায়ের ওপর শেষ আঘাতটা নেমেছিল ১৯৯১ সালে যখন ইন্দো সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়।

এই চুক্তিতে বলা ছিল যে ডুয়ার্স চায়ের দাম কেনিয়ার সিটিসি-র থেকে অনেক কম এবং ঘরে বসেই অনুকূল মুদ্রা রূপান্তর উপভোগ করা যায়। চুক্তি শেষ হলে, কেনিয়ার উন্নত মানের সিটিসি চা ডুয়ার্স চায়ের থেকেও সস্তা হয়ে যায় এবং রাশিয়ান ব্লেন্ডাররা এই চা কেনা বন্ধ করে দেয়। ১৯৯০-এর শুরুর দিকে ডুয়ার্স থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করা হয়েছিল। কিন্তু আজ সেসব অতীত, ডুয়ার্স চা আর রপ্তানিযোগ্য পণ্যের আওতায় পড়ে না।

শিল্পপতি এবং বাগান মালিকদের অভিমত যে, ফলনের গুণমানের জন্যই আসাম সিটিসি’র থেকে ডুয়ার্স চা সস্তা ছিল। চাষের জমির উচ্চতা, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং মাটির গুণগত মানের জন্য আসাম চায়ের ফলন ভালো এবং স্বাস্থ্যকর। ডুয়ার্স চা অনেক কম উচ্চতায় চাষ করা হয় তার উপর ক্ষয়িষ্ণু মাটি এবং পোকামাকড়ের উৎপাত। বাগান মালিকরাও এইসব সমস্যা প্রতিকারে উদ্যোগী হয় না। 

ব্রিটিশ আমলে ডুয়ার্স চায়ের যে সুখ্যাতি ছিল, তা ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে আসছে বাংলার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

ইন্ডাস্ট্রি’র অনুমান অনুযায়ী আসামে হেক্টর প্রতি গড় ফলন প্রায় ২২০০ থেকে ২৪০০ কেজি, অন্যদিকে হেক্টর প্রতি ১২০০ থেকে ১৫০০ কেজি ডুয়ার্স চা উৎপাদন করাটাই বেশ  ব্যয়বহুল ব্যাপার। উপরন্তু এর বাজার দরও কম। ডুয়ার্স-তরাই চা আসামের চায়ের থেকেও কিছুটা হালকা হয়।

তবে, উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ডুয়ার্স চায়ের বৈচিত্র্যকে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে আরও একবার তুলে ধরতে এগিয়ে আসছে বাংলার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। অ্যামালগামেটেড প্ল্যান্টেশন প্রাইভেট লিমিটেড লিমিটেড (Amalgamated Plantations Pvt. Limited), কলকাতায় অবস্থিত টাটা (Tata) গোষ্ঠীর একটি অংশ স্বরূপ ‘Teas from India’ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে ডুয়ার্স চা পৌঁছে দেওয়ার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রেতা-চাহিদা, বাজার দর না থাকা সত্ত্বেও ডুয়ার্স চা উৎপাদনে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকেই পাথেয় করেছে প্রতিষ্ঠানগুলি। ব্রিটিশ আমলে ডুয়ার্স চায়ের যে সুখ্যাতি ছিল, তা ফিরিয়ে আনাই এই এদের লক্ষ্য। 

‘Delightful Dooars’ (https://teasfromindia.com) নামে বিভিন্ন ধরনের ডুয়ার্স চা লঞ্চ করেছে ‘Teas from India’। এই গোষ্ঠী আশাবাদী যে এতদিন যাবৎ ডুয়ার্স চা যেভাবে বাজারে এবং ক্রেতাদের কাছে অবহেলিত হয়েছে, তাঁরা তা পুনরুজ্জীবিত করবেন। ধরে নেওয়া যায় এর মাধ্যমে বাংলার সুবিশাল চা-ভাণ্ডার জুড়ে যে সম্ভাবনাগুলো রয়েছে সেগুলো অন্বেষণের আরও রাস্তা সুগম হবে। তাই, অদূর ভবিষ্যতে আপনার কাপে দার্জিলিং বা আসামের বদলে ‘ডুয়ার্স চা’ দেখে আশ্চর্য হবেন না যেন! 

প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে  ক্লিক করুন

  

Written by
Developed by DXDasia