পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার নিল ছাত্রছাত্রীরা
পরিবেশ। বাংলা, ভারত তথা বিশ্বের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। অত্যন্ত কেন, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বোধহয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পরিবেশ দূষণ, বায়োডাইভার্সিটি শব্দগুলো বিজ্ঞানের বই থেকে ঢুকে পড়েছে সাধারনের চর্চায়। সারা বাংলা জুড়ে এখন যে হারে তাপপ্রবাহ চলছে, তার দুঃসহ পরিনাম ভোগ করছে সবাই। ঋতুচক্রের বদলে যাওয়া, বর্ষার পিছিয়ে যাওয়া, তাপপ্রবাহ, তার ফলে ভুক্তভোগী সাধারন আর প্রান্তিক মানুষ। তাই পরিবেশচর্চা দিনে দিনে হয়ে উঠছে অনিবার্য।
“এই সময়ে দাঁড়িয়ে পরিবেশকে চেনা, বোঝা, আমাদের চারপাশে থাকা প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে পরিচয় করানো, তাদের গুরুত্ব উপলব্ধি করানোই আমাদের উদ্দেশ্য।” এভাবেই নিজেদের অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও কারণ বর্ণনা করলেন, বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিকাল মিউজিয়ামের (Birla Industrial and Technological Museum) এডুকেশন অফিসার (BITM Education Officer) তরুণ দাস (Tarun Das)। এই গোটা অনুষ্ঠানে সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ভারতের প্রথম সায়েন্স মিউজিয়াম এটি। গতকাল, ৫ জুন, ২০২৩ তারিখে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হল সেখানে। হয়ে গেল বিবিধ অনুষ্ঠান।
আমেরিকান অর্নিথোলজিকাল সোসাইটির (American Ornithological Society) হিসাবে, গত দশ বছরে আমেরিকার বিভিন্ন হাইরাইজে ধাক্কা খেয়ে মৃত্যু হয়েছে ১০০ কোটি পাখির। গোটা ইউরোপ জুড়ে শুধুমাত্র ২০২২ সালেই মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ পাখির, বিভিন্ন রেডিও এবং মোবাইল টাওয়ারের জন্য। এই ভয়ঙ্কর তথ্যও পেশ করলেন তিনি। বাংলার সাঁতরাগাছি ঝিলে পরিযায়ী পাখি যে ক্রমশ কমে যাচ্ছে, সবুজের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার পরিচিত পাখি, যেমন- কোয়েল, দোয়েল, ফিঙে, পাপিয়া, বেনেবৌ, বউ কথা কও ইত্যাদি, সে আক্ষেপও ঝরে পড়লো তাঁর গলায়।
এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০০ জন ছাত্রছাত্রী। ছিলেন তাদের অভিভাবকেরাও। কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশন, আরও চারটি স্কুল এবং বিআইটিএম সায়েন্স ক্যাম্প -এর (BITM Science Camp) ছেলেমেয়েরা। প্রথমেই উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের হাতে বিভিন্ন গাছের বীজ তুলে দেন বিআইটিএমের আধিকারিকরা। বীজগুলিকে নরম মাটির মধ্যে সংরক্ষিত করা হয়েছে। মাটিগুলিকে গোলাকৃতি আকার দেওয়া হয়েছে, যাতে মেশানো আছে জৈবিক সার। ছাত্রছাত্রীদের বলা হলো, তারা সেই মাটিশুদ্ধ বীজগুলিকে বাগানে, টবে বা অন্য পাত্রে পুঁতে দিলে এবং তাতে নিয়মিত জল দিলে, তার থেকে চারাগাছ বেরোবে। তা বড়োও হবে ধীরে ধীরে। তরুণবাবু জানালেন, বাচ্চারা অঙ্কুরোদগমের যে বৃত্তান্ত বইয়ে পড়েছে, তা তারা নিজের চোখে ঘটতে দেখবে নিজের বাড়িতেই, সেই ঘটনার সূত্রধর হবে তারা, এতে পরিবেশের সঙ্গে তাদের একাত্মতা নিশ্চয়ই বাড়বে।
আরও পড়ুন: পরিবেশ বাঁচাতে রাজপথেও অবাধ হোক সাইকেল
বিআইটিএমের অডিটোরিয়ামে এই অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আয়োজিত হয়েছিল দুটি মনোজ্ঞ বক্তৃতা। প্রথমে বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং পক্ষী-বিশারদ কুবলয় ব্যানার্জী (Journalist and Bird Enthusiastic Kubalay Banerjee) গল্পচ্ছলে শোনালেন পাখিদের পরিযানের ইতিহাস। বললেন কিভাবে উত্তর মেরুর আর্কটিক নড (Arctic Nod Bird) উষ্ণ আবহাওয়ার খোঁজে সারাবছরে প্রায় ৪৯,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। জানালেন সাইবেরিয়ার পাখিরা যে উচ্চতায় উড়ে ভারতে আসে, তা মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতার থেকেও বেশি। গ্রীক বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল থেকে সুইডিশ পক্ষীবিদ ওলাউস ম্যাগনাস, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন জেমস অড্রুবর্ন, এনাদের হাত ধরে কীভাবে বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছালো আধুনিক সময়ের পক্ষী-গবেষণা, তার বিশদ বৃত্তান্ত উঠে এল তাঁর কথায়।
পক্ষী-বিশারদ কুবলয় ব্যানার্জী
আমেরিকান অর্নিথোলজিকাল সোসাইটির (American Ornithological Society) হিসাবে, গত দশ বছরে আমেরিকার বিভিন্ন হাইরাইজে ধাক্কা খেয়ে মৃত্যু হয়েছে ১০০ কোটি পাখির। গোটা ইউরোপ জুড়ে শুধুমাত্র ২০২২ সালেই মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ পাখির, বিভিন্ন রেডিও এবং মোবাইল টাওয়ারের জন্য। এই ভয়ঙ্কর তথ্যও পেশ করলেন তিনি। বাংলার সাঁতরাগাছি ঝিলে পরিযায়ী পাখি যে ক্রমশ কমে যাচ্ছে, সবুজের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার পরিচিত পাখি, যেমন- কোয়েল, দোয়েল, ফিঙে, পাপিয়া, বেনেবৌ, বউ কথা কও ইত্যাদি, সে আক্ষেপও ঝরে পড়লো তাঁর গলায়। পরিশেষে এক উৎসাহী ছাত্রের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, কেন পাখিদের বেঁচে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। “মৌমাছিদের মতন পাখিরাও বিভিন্ন গাছের বীজ একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘পলিনেশন’। এছাড়াও সাপ, বিভিন্ন পোকামাকড় খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করে পাখিরা। তাই পাখি না থাকলে পরিবেশ পড়বে সংকটের মুখে। শুধু পাখিই নয়, সমস্ত জীবজগতের প্রতিই আমাদের সচেতন হওয়া উচিৎ”বলেন তিনি।
দ্বিতীয় পর্যায়ের বক্তৃতা দেন পরিবেশবিদ এবং ওয়েদার আল্টিমা (Weather Ultima) সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা। তাঁর বক্তৃতার শিরোনাম ছিল Tales of Clouds। তিনি চেনালেন মেঘ ও তার প্রকারভেদ। বললেন কোন মেঘে বৃষ্টিপাত হয়, কোন মেঘে ঘুর্ণিঝড় হয়, কোন মেঘে বৃষ্টি হয় না। স্লাইডের মাধ্যমে ছবি দেখিয়ে বোঝালেন, আকাশে মেঘ দেখলে কীভাবে চেনা যাবে বিভিন্ন ধরনের মেঘেদের। উল্লেখ করলেন অ্যারিস্টটলের লেখা ‘মিটিওলজিকা’, যেখানে প্রথম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আকাশের মেঘেদের বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত বলা দরকার, মেঘের বিশ্লেষণ নিয়ে যে বিজ্ঞান, তাকে বলা হয় ‘নেফোলজি’ (Nephology), যেখানে Nephos অর্থ মেঘ। সেই মেঘবিজ্ঞানের হাত ধরে ছাত্রছাত্রীরা প্রাথমিক পরিচয় পেল কিউমুলাস, স্ট্র্যাটাস, নিম্বাস বিভিন্ন প্রকারের মেঘের। তিনি জানালেন, শহরে দূষণের ফলে বিভিন্ন ক্ষতিকারক কণা ও ধুলো বেড়ে যাওয়ার কারণেই এখন বজ্রপাত বেশি মাত্রায় হচ্ছে।
এছাড়াও ছিল পরিবেশ নিয়ে কুইজ শো। তা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ ছিল দেখার মতন। বিজয়ীদের জন্য ছিল উপহারের ব্যবস্থা। পরে তারা ঘুরে দেখল বিআইটিএমের মিউজিয়ামও। Pacific waste নামক একটি ভিডিও শো-এর মাধ্যমে দেখানো হল প্লাস্টিক বর্জ্যের মাধ্যমে কীভাবে দূষিত হচ্ছে সমুদ্র, মারা যাচ্ছে সামুদ্রিক মাছ। গতকাল ছিল ‘জিরো শ্যাডো ডে’ (Zero Shadow Day)। বিআইটিএমে জিরো শ্যাডো ডে-এর ডেমনস্ট্রেশনও দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের।
এসবকিছুই আসলে ছিল পরিবেশ সচেতনতার পাঠ। তরুণবাবুর দাবি অনুযায়ী, “আমরা পরিবেশ সচেতনতাকে বই থেকে ছেলেমেয়েদের মগজে পৌঁছে দিতে চাই। চাই তারা পরিবেশ নিয়ে ভাবুক, পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসুক। তাই এই উদ্যোগ। এই উদ্যোগকে আমরা শুধু এই একটা দিনে আটকে রাখতে চাই না। তাই বছরভর এধরনের আরও উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।”তাঁর এই দাবির প্রাথমিক সমর্থন পাওয়া গেলো ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের অভিভাবকদের উৎসাহে, ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নে। কয়েকজন ছাত্র জানতে চাইলো, তারা কীভাবে পরিবেশ রক্ষায়, জীবজন্তু রক্ষায় উদ্যোগ নিতে পারে। আশা করা যায়, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের মনে পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি যে কৌতুহলের বীজ বপন করা হল, তা ধীরে ধীরে মহীরূহ হয়ে উঠবে, বছরের প্রতিদিনই হয়ে উঠবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।