জনপ্রিয়তায় শতাব্দী প্রাচীন দোকানও ম্লান এই বিরিয়ানির কাছে

দু’দশকের মধ্যে সমস্ত কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছে আটটি শাখা

বছর পঁচিশ আগেও কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের চারদিকে বিরিয়ানি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েনি। এখন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে হাটে-বাজারে যেটি দেখা যায়, সেটি হল বিরিয়ানির হাঁড়ি। বিরিয়ানি খুব জনপ্রিয় হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। তার আগে বিরিয়ানি যে জনপ্রিয় ছিল না সেটা নয়, কিন্তু সব জায়গায় বিরিয়ানি পাওয়া যেত না। কলকাতার বিরিয়ানি নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে, তার স্বাদ, অন্যান্য বিষয় নিয়ে বহু পত্র-পত্রিকায় নিরন্তর লেখা হয় আজও। আমি আজ এমন একটি দোকানের কথা বলব, বিরিয়ানির কথা বলতে গেলে কলকাতায় প্রথম এখন এই দোকানটির কথাই মনে আসে। যদিও দোকানটির বয়স মাত্র সতেরো বছর। 

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ‘আরসালান’। এই বিরিয়ানির দোকান অত্যন্ত দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এমনকি শতাব্দী প্রাচীন বিরিয়ানির দোকানগুলোও পেরে ওঠেনি এর সঙ্গে। কী এক অদৃশ্য জাদুতে এদের বিরিয়ানি এবং অন্যান্য খাবার জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছে। এখনও যে দোকানের সামনে সন্ধেবেলায় লাইন দিয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, সেটি হল এই আরসালান। জনপ্রিয়তার জন্য এদের ব্রাঞ্চের সংখ্যাও বাড়ছে এবং যেখানে নতুন ব্রাঞ্চ খুলছে সেখানেও তার আকর্ষণ বাড়তির দিকেই। এবার একটু আসি এই বিখ্যাত আরসালান তৈরি হওয়ার গল্পে। একটি মাত্র দোকান নিয়ে আরসালান তার যাত্রা শুরু করেছিল ২০০২ সালে পার্ক সার্কাসের সেভেন পয়েন্টে। প্রথমদিকে অতটা জনপ্রিয়তা ছিল না, কিন্তু আস্তে আস্তে বিশেষ করে বাঙালিদের পছন্দের জায়গা হয়ে ওঠে এই বিরিয়ানি ও মোগলাই খাবারের দোকানটি। কলকাতার অন্যান্য প্রাচীন দোকানগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকে এর জাদু। ২০০৫ সালের পর থেকে এদেরকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে সার্কাস এভিনিউ, রিপন স্ট্রিটে তারা ব্রাঞ্চ খুলে মোট তিনটি ব্রাঞ্চে তাদের বিশাল কর্মকাণ্ডকে ছড়িয়ে দেয়। কলকাতার মানুষরা তাদের পরিচিত বিরিয়ানির দোকানের নাম ভুলে নতুন করে আর্সালানের প্রেমে পড়তে থাকে। 

প্রতিবেদককে আরসালান কর্তৃপক্ষ জানালেন, এখন কলকাতায় তাদের আটটি ব্রাঞ্চ আছে – পার্ক সার্কাস, সার্কাস এভিনিউ, রিপন স্ট্রিট, ডায়মন্ড হারবার রোড, হাতিবাগান, চিনার পার্ক, যশোর রোড এবং রুবি ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস। সম্প্রতি তারা দুবাইতেও আরসালান বিরিয়ানির ব্রাঞ্চ খুলতে চলেছে। মাংসের কোয়ালিটি এবং সঠিক মশলা ব্যবহার করে তাদের অত্যন্ত প্রশিক্ষিত শেফদের দিয়ে তৈরি হয় এই বিরিয়ানি। বিরিয়ানি ছাড়া কাবাব বা অন্যান্য পদেরও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা আছে। এক প্লেট বিরিয়ানি দাম ২৪০ টাকা। দু পিস মাংস সহযোগে স্পেশাল বিরিয়ানির দাম ৩৪৫ টাকা, কর অতিরিক্ত। চিকেন বিরিয়ানি আর মাটন বিরিয়ানির দাম একই। মাংসের জন্য নিজেদের ফার্মহাউজে ছাগল প্রতিপালন করে আরসালান কর্তৃপক্ষ। জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতিদিন কত প্লেট বিরিয়ানি বিক্রি হয়? মৃদু হেসে মালিকদের প্রতিনিধি জানালেন, এই তথ্য আপনাদের বলা যাবে না। তবে সারাদিনে এক একটি ব্রাঞ্চে খাবার খান গড়ে এক হাজার মানুষ। রাত্রি সাড়ে এগারোটা অবধি দোকান খোলা থাকে। বিভিন্ন শাখার মধ্যে পার্ক সার্কাসের বিরিয়ানির জনপ্রিয়তা সব থেকে বেশি। এখন হোম ডেলিভারি, উবেরিটস ইত্যাদির মাধ্যমেও আরসালান পৌঁছে গেছে মানুষের দরজায়।

প্রতিবেদকের বিশেষ পছন্দ মাটন বিরিয়ানি। এছাড়া, তন্দুরি রুটি এবং মাটন স্টু। আরসালানের মাটন স্টু কিন্তু কোনো হালকা রান্না নয়, এটি বেশ ঝোল কষা, তেল দেওয়া মাংস। ওপরের তেলটি ফেলে দিয়ে রুটির সঙ্গে খেয়ে দেখবেন। আদা কুচি, মরিচ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়, অনবদ্য। কাবাবের মধ্যে বিভিন্ন রকমের চিকেন কাবাব, মাটন কাবাব পাওয়া যায়। এদের ‘আরসালান স্পেশাল’ কাবাবও আছে, যার দাম ৬৮৪ টাকা। এক প্লেট নিয়ে তিনজন মিলে খেতে পারবেন। প্রাইস লিস্ট তুলে দেওয়া হল, যাতে পাঠকদের সুবিধে হয়। বিরিয়ানিপ্রেমীদের বলি, প্রথমবার গিয়ে অর্ডার দেবেন সুখা চাওল ও গলা মাস, মানে বিরিয়ানির উপরের স্তরের যে শুকনো চাল থাকে এবং একটু নরম মাংস। আরসালানের বিরিয়ানি না খেলে কলকাতায় থাকাটাই বৃথা। আর দেরি নয়, আটটি ব্রাঞ্চের মধ্যে যে কোন একটিতে অবশ্যই চেখে দেখবেন আরসালান বিরিয়ানি, না হলে কলকাতার নিজস্ব বিরিয়ানি কী, সেটা থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন। 

Developed by DXDasia