পরিবেশ এবং ইতিহাস সচেতনতার অভিনব মেলবন্ধন তাঁর সংগ্রহশালা
ছোটোবেলা থেকেই পাখিদের প্রতি আকর্ষণ তাঁর। পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা এবং ভিন রাজ্যেরও বনবাদাড়ে, গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন অসংখ্য পাখির ডিম। লোকে তাঁর নাম দিয়েছে ‘কৃষ্ণনগরের সেলিম আলি’। অবশ্য তিনি নিজে দাবি করেন সেলিম আলি কিংবা জিম করবেটের কাছেও এত ধরনের পাখির ডিম ছিল না। শুধু পাখির ডিমই নয়, তাঁর সংগ্রহে আরও যা কিছু রয়েছে, সবই তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো।
তিনি অমরেশ কুমার মিত্র। আমঘাটা শ্যামপুর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ ৪২ বছর। এখন বয়স ৮২ পার হয়ে গেছে। শরীরে নেই আগের মতো জোর। বরং জরার আগমনে যথেষ্টই কাবু হয়েছেন। তা সত্ত্বেও কৃষ্ণনগরে নিজের বাগানঘেরা বাড়িতে আগলে রেখেছেন নিজের সংগ্রহশালা। ছোটোবেলায় যখন স্কুলে পড়তে যেতেন, তখন থেকেই বাড়ি নিয়ে আসতেন নানা রকম পাখির ডিম। কৌটোর গায়ে নাম লিখে তার মধ্যে সযত্নে রেখে দিতেন সেগুলো। এভাবেই তিনি ১২০ রকম পাখির প্রায় ৫০০ ডিম সংগ্রহ করেছেন। রয়েছে বাবুই, ছাতার, ময়ূর, নীলকণ্ঠ, জলপিপি কোকিল, কাক এবং কত অজানা পাখির ডিম। বাংলার প্রায় সব পাখির ডিমই তিনি সংগ্রহ করেছেন। এমনকি বিহার কিংবা ওড়িশার চিল্কা থেকেও পাখির ডিম নিয়ে এসেছেন।
পাখিদের নিয়ে মজার মজার সব তথ্য, যেগুলো ভুলতে বসেছে এখনকার মানুষ, সবই এই বৃদ্ধ মানুষটির নখদর্পনে। গল্পের ছলে জানান, ছেলে বাবুই পাখি বাসা অর্ধেক তৈরি করে সঙ্গিনী খুঁজতে থাকে। মেয়ে বাবুইদের নিয়ে যায় বাসা দেখাতে। যে মেয়ে পাখির সেই বাসা পছন্দ হয়, সে নিজের মতো করে বাসার বাকি অংশটা বানিয়ে নেয়। ঘুঘু পাখি একবার যার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে, সে মারা গেলে বাকি জীবনটা একাই কাটিয়ে দেয় তারা। সে স্ত্রী পাখি হোক বা পুরুষ। এখান থেকেই এসেছে ‘ভিটেয় ঘুঘু চড়ানো’-র বাগধারাটি।
ডিমের পাশাপাশি অমরেশ মিত্রের সংগ্রহে রয়েছে আরও অনেক কিছু। বাংলার হারিয়ে যাওয়া ২২০ রকমের ধান আগলে রেখেছেন তিনি। আছে চিংলিভূষি, বৌপাগলা, হনুমানজটার মতো আউশ ধান, শোলকলমা, মেটেজাবলি, সরুসেঠের মতো আমন ধান কিংবা রেশমি, পাথরকুচি, জলকলমি ইত্যাদি বোরো ধান। কবিরাজ, সেসেশাক, আলমশাক – ধানের নাম বলে শেষ করা যাবে না। ২৬ রকমের দুর্লভ পাথরও তিনি জমিয়ে রেখেছেন। তাঁর কলমের সংগ্রহও খুব সমৃদ্ধ। খাগের কলম থেকে এখনকার অত্যাধুনিক পেন – অনেক কিছুই রয়েছে। ১৯২৪ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে তৈরি হওয়া নিব দেখা যাবে তাঁর কাছে। আর আছে বিচিত্র সব ডাকটিকিট। ১৯০০ সাল থেকে প্রকাশিত এখন পর্যন্ত সব রকমের ডাকটিকিটই তাঁর সংগ্রহে রয়েছে।
অমরেশ মিত্রের দুই মেয়ে। তাঁরা এখন বাইরে থাকেন। সঙ্গী বলতে স্ত্রী আরতি। ‘পাখিবুড়ো’-র বিরল সংগ্রের ছবি তুলে পরিচিত এক যুবক একবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়েছিলেন। সেই থেকে দর্শকের আনাগোনা লেগেই আছে বৃদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে। এখন তিনি খুবই অসুস্থ। তিল তিল করে জমিয়ে তোলা এই সংগ্রহ পরবর্তীকালে কে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করবে, সেই চিন্তায় তিনি কাতর।
ছবিসূত্র – ফেসবুক