বৈশাখী উৎসবে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করলে ইদে কেন নয়, প্রশ্ন তুললেন বিবি রাসেল

ইদের প্রাক্কালে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উত্থাপন করেন বাংলাদেশের এই ‘ফ্যাশন-আইকন’

বাঙালি গামছা অন্ত প্রাণ। তবে, এই গামছা যে একদিন স্নানঘর থেকে ডিজাইনার পোশাক হিসেবে, স্বতন্ত্র ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে, এ ছিল বাঙালির কল্পনা বাইরে। অকল্পনীয় এই ব্যাপারটি করে দেখিয়েছিলেন বাংলাদেশের (Bangladesh) ‘ফ্যাশন-আইকন’ বিবি রাসেল (Bibi Russell)। বিশ্ববিখ্যাত ফটো ও র‍্যাম্প-মডেল এবং পরবর্তীকালে বিখ্যাত ফ্যাশন-ডিজাইনার(Fashion Designer) হিসেবে আবিশ্বে পরিচিত তিনি। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে যে বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে সৃজনশীল অর্থনীতি বিষয়ে বক্তব্য রাখেন ‘ফ্যাশন অফ আর্থ’-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বিবি। কিছুদিন আগেই, ইদের প্রাক্কালে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন—“বৈশাখী উৎসবে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করলে ইদে কেন নয়?”

বিবির পণ্য মানেই বাংলাদেশ (Bangladesh)। যাঁরা বিবি’র কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানবেন  গ্রাম বাংলার তাঁতিদের (Bengal's Textile) শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নে তিনি কতটা সচেষ্ট। হাজারো তাঁতি, তাঁদের পরিবারের চেষ্টা ও স্বপ্নের কাণ্ডারি তিনি। শুধু তাই নয়, দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্ত দেশিয় কাপড় পরার করার পরামর্শ দেন বিবি। গামছা বা তাঁতের কাপড়ের তৈরি জামা, জুতো, ব্যাগ, গয়না, গৃহস্থালীর শোভা বাড়ানোর বিভিন্ন পণ্য বিবি’র ‘সিগনেচার’।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ইংরেজরা বাংলায় আসার পর তাদের পোশাকের ছাপ পড়তে শুরু করে এ দেশের মানুষের পোশাকে। তবে মোঘলদের পোশাকের মতোই ইংরেজদের পোশাকও রাতারাতি সাধারণ মানুষের মধ্যে জায়গা করে নেয়নি। প্রথমে অভিজাত এবং পরে সাধারণ মানুষদের মধ্যে ইংরেজদের অনুকরণে পোশাক পরার প্রচলন শুরু হয়। মোঘলদের পতনের পরেও অনেকদিন পর্যন্ত এদেশের হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বীরাই মোঘলদের মতো পোশাক পরতো। সমাচার দর্পণ পত্রিকায় ১৮৩৫ সালে উল্লেখ করা হয় যে, বাবু, জমিদার, সেরেস্তাদার ও উকিল ইত্যাদি মহাশয়রা জামা, নিমা, কাবা, কুর্তা ইত্যাদি পোশাক পরতেন। রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুরদের ছবিতেও তাঁদেরকে এ ধরনের পোশাক পরতেই দেখা যায়। এসব পোশাকই ছিল অভিজাতদের পোশাক। রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দসহ সেকালের সব অভিজাত ব্যক্তি তখনও মাথায় পাগড়ি পরতেন। নবাবী আমলের পোশাক ইংরেজ আমলে এসে অক্ষুণ্ণ থাকলেও নতুন করে যুক্ত হয় চেইন আর ঘড়ি।

প্যালানাথ বাবু তাঁর ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা'য় পূজা দেখতে যাওয়া মানুষের পোশাকের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা হলো: কোঁচানো ধুতি, ধোপদুরুস্ত কামিজ, শান্তিপুরী উড়ুনি বা ক্রেপ এবং নেটের চাদর। কামিজ, রামজামা বা লম্বা জামা, জোব্বা থেকেই সম্ভবত পরবর্তীতে পাঞ্জাবীর উদ্ভব। এ সময়ে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় ইংরেজদের মতো পোশাক পরার প্রচলন দেখা যায়। এদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি পুরোদস্তুর ইংরেজদের মতো পোশাক পরতেন। বাঙালিদের মধ্যে শার্ট খুব জনপ্রিয় হলেও বিশ শতকের আগে বাঙালি শার্ট পরতো না। এমনকি বিশ শতকেরও অর্ধেক সময় জুড়ে বাঙালিদের মধ্যে খুব একটা শার্ট পরার চল ছিল না। বাংলায় হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলা হত। মহিলাদের ব্যাপারে রক্ষণশীলতা এতটাই প্রকট ছিল যে বিভিন্ন সময়ে পুরুষদের পোশাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও মহিলারা সবসময় শাড়িই পরেছে। একশো বছরেরও কম সময় আগে বাঙালি সাধারণ মহিলারা শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ বা পেটিকোট পরতো না। অভিজাত মহিলাদের ক্ষেত্রে অবশ্য সে কথা চলে না; ব্রিটিশ শাসনের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে এসে তাদের ফুল-হাতা গলাবন্ধ ব্লাউজ পরতে দেখা যায়। সেসব দিন গিয়েছে। আবহাওয়া আর জলবায়ুর সাথে সবচেয়ে মানানসই, ঐতিহ্যবাহী, আরামদায়ক পোশাক ধুতি বা লুঙ্গি পরতে বাঙালির এখন অপছন্দের তালিকায়। বিবর্তনের ফল। কিন্তু এখনো গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং নিম্নশ্রেণীর শ্রমজীবী মানুষের প্রধান পোশাক লুঙ্গি। অর্থাৎ প্রাচীন বাংলা থেকে আজকের বাঙালির পোশাকে পার্থক্য থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির পোশাক প্রায় একই রয়ে গেছে, বদলেছে খুব সামান্যই। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি শ্রমজীবী মানুষের পোশাক দিয়েই ফ্যাশান-ওয়ার্ল্ডে বিপ্লব এনেছিলেন বিবি রাসেল।

প্রাচীন বাংলা থেকে আজকের বাঙালির পোশাকে পার্থক্য থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির পোশাক প্রায় একই রয়ে গেছে, বদলেছে খুব সামান্যই। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি শ্রমজীবী মানুষের পোশাক দিয়েই ফ্যাশান-ওয়ার্ল্ডে বিপ্লব এনেছিলেন বিবি রাসেল।

বিবি'র ফ্যাশন-পণ্য

‘বিবি’ তাঁর ডাকনাম, প্রকৃত নাম মাসুমা। বাংলাদেশ এবং প্রাচ্যে বহু বছর ধরে ফ্যাশন দুনিয়ায় কাজ করছেন। মুসলিম পরিবারের বড়ো হয়েও এহেন ফ্যাশন-চেতনা তৈরি হল কীভাবে, এই প্রশ্নের উত্তরে বিবি জানাচ্ছেন, “আমাদের বাড়িতে গ্রামের মানুষরা এলে হাঁ করে দেখতাম তাদের পোশাক—লুঙ্গি, গামছা, সাধারণ সুতির কাপড়। খুব ভালো লাগতো আমার। দারিদ্রের মধ্যে যে সৌন্দর্য আছে তা আমাকে আকর্ষণ করতো। আমার ফ্যাশন-সেন্স তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের মানুষদের দেখেই, ওঁরাই আমার অনুপ্রেরণা।”

বিবি রাসেল

মা, বাবা, দুই বোনের সঙ্গে তাঁর বেড়ে ওঠা বাংলাদেশেই। ছোটোবেলায় তাঁর মা তাঁদের জন্য জামা-কাপড় বানিয়ে দিতেন। তখন প্রতি ঘরেই একটা করে সেলাই মেশিন ছিল। তাঁর মায়ের বানানো জামাকাপড় দুই বোনের পছন্দ হলেও, বিবি ঘ্যানঘ্যান করতেন। “তখন আমার দশ বছর বয়েস, সেই বয়সেই বাবা আমাকে একটা সেলাই মেশিন কিনে দেন। সেই বয়সে কাঁচিও ঠিকঠাক ধরতে পারতাম না, কিন্তু যা পারতাম, যেভাবে পারতাম, খুব খারাপ হলেও নিজেই বানাতাম।” বলছিলেন বিবি।

লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন। ‘লন্ডন কলেজ অফ ফ্যাশন’ থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিং গ্রাজুয়েট হয়েছেন। তিনি যখন বড়ো হচ্ছেন, সেসময় মানুষের ধারণা ছিল না ফ্যাশন নিয়ে পড়াশোনা করা যায়, তাও বিদেশে গিয়ে। সকলে মনে করতেন দেশ-গ্রামের দর্জিরা তো পড়াশোনা না করেই কাপড় সেলাই করে, তার জন্য আলাদা করে পড়াশোনা করার কী দরকার! তাঁর কথায়, “মুঘল আমলে রাজা-বাদশারা যে ধরনের পোশাক পরতেন, ওঁরা কিন্তু অনেক বেশি ফ্যাশন-সচেতন ছিলেন। এক্ষেত্রে আমি রবীন্দ্রনাথের কথাও বলতে পারি। আমার মনে হয় সেসময় মানুষ পোশাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে অত্যধিক শৈল্পিক ছিলেন। যেকোনও মানুষের বড়ো হওয়ার নেপথ্যে পরিবারের ভূমিকা থাকে। আমার মা পাঁচবার নিয়ম করে নামাজ পড়তেন তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিন্তু আমাদেরকে কখনও কিছুতে বাধা দেয়নি, বাবাও খুব মুক্তমনস্ক ছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই নাচ গান ইত্যাদি শিখিয়েছেন। আমার বাবা ভাবতেন ফ্যাশনের মাধ্যমেও একটা দেশের উন্নয়ন সম্ভব। যেকারণে আমি ফ্যাশন নিয়ে পড়াশোনা করতে পেরেছি।”

ফ্যাশনের একটা প্রধান দিক হল যেকোনও দেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিকড় চেনা-জানা। বিবি’র মত, “তা না হলে কিন্তু একজন ফ্যাশন-ডিজাইনার কখনই সফল হতে পারবেন না।”

বিবি'র ডিজাইনে শাড়ি

ফ্যাশনের একটা প্রধান দিক হল যেকোনও দেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিকড় চেনা-জানা। বিবি’র মত, “তা না হলে কিন্তু একজন ফ্যাশন-ডিজাইনার কখনই সফল হতে পারবেন না।” এবছর ইদ উপলক্ষ্যে বিবি’র স্টোর-এ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন দেশিয় পণ্য। দামও সাধ্যের মধ্যে। বিবি’র কথায়, “কোনও দেশের ভৌগলিক পরিচয় পাওয়া যায় পোশাক দেখে। যেমন আমি, দেশের ট্র্যাডিশনের বাইরে বেরিয়ে কোনও ফ্যাশন করি না। দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে দিয়েই রং, নকশা ইত্যাদি '‘এক্সপেরিমেন্ট’ করি। পৃথিবীর যেকোনও দেশের জন্য পোশাক তৈরি করতে হলে আমি সেদেশের ফ্যাশান-সেন্স মাথায় রাখি কিন্তু, ব্যবহার করি আমার দেশের কাপড়। ফ্যাশন নির্দিষ্ট কোনও সীমানা, শ্রেণী বা ধর্মের জন্য নয়। সবার জন্য। পোশাকের মাধ্যমে চাইলে ‘সোশ্যাল-ইকোনমিক্যাল ডেভেলপমেন্ট’ করা যায়।”

ঘর সাজানোর সরঞ্জাম

বাংলাদেশ অনেক কিছুর জন্যই পৃথিবীতে পরিচিত তবে, ত্রয়োদশ শতাব্দিতে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে পৌঁছেছিল নিজেদের এক টুকরো কাপড়—মসলিন নিয়ে। যেমনটা আমরা শুনেছি–দেশলাই বাক্সের মধ্যে ধরে যেত। সেই মসলিন। সেই ঐতিহ্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। বিবি এ বিষয়েও কাজ করে চলেছেন, গবেষণা করছেন মসলিন নিয়ে। ফ্যাশন সময়কে ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনে বা ফ্যাশনে সময় ফিরে ফিরে আসে, যেভাবেই বাক্য সাজাই না কেন, বিবি রাসেল শুরু থেকে একথা বিশ্বাস করেই কাজ করে চলেছেন বাংলাদেশে।

 

*সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা

অন্যান্য তথ্যসূত্রঃ

https://roar.media

http://www.kholakagojbd.com

বিবি রাসেলের ফেসবুক প্রোফাইল

Developed by DXDasia