স্পিতি উপত্যকার ছোট্ট জনপদ টাবো

যুগ যুগ ধরে কঠোর প্রকৃতির বুকে চলছে নিরলস সাধনা

হিমাচলে চীনের(তিব্বতের) সীমানা ঘেঁসে স্পিতি উপত্যকার ছোট্ট জনপদ টাবো। হিমাচলের কিন্নর জেলা পেরিয়ে ঢুকতে হয় স্পিতিতে।একপাশে কিন্নর, আরেক পাশে কুনজুম পাস পেরিয়ে লাহুল।বছরের অর্ধেক সময় কুনজুম পাস থাকে অগম্য, সরকারিভাবেই পথ থাকে বন্ধ। তখন ভরসা কিন্নরের পথ, তাও শীতে পুরু বরফের তলায় চলে যায়। আমরা এলাম সেপ্টেম্বরের শেষে – এখনও তেমন শীত পড়েনি। এতেই আমরা যাবতীয় গরমজামা গায়ে চাপিয়ে নিয়েছি।তবে সন্ধ্যা নামার আগে পর্যন্ত রোদের তেজ টের পাচ্ছি –‘শীতল মরুভূমি’তে।

কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে বা কালকা মেলে চন্ডিগড়। সেখান থেকে সিমলা হয়ে গাড়িতে নারকান্ডা বা সারাহান, পরদিন কল্পা। আবার সরাসরি চন্ডিগড় থেকেও গাড়ি নেওয়া যায়। কল্পা থেকে স্পিতির নাকো হয়ে টাবো। নাকোতে একরাত থাকলে ভালো লাগবে, সময় অভাবে সরাসরি টাবো। নারকান্ডা, সারাহান,কল্পাতে অনেক হোটেল থাকলেও হিমাচল প্রদেশের হোটেলই সেরা, on-line বুকিং করা যায়। নাকো এবং টাবোতে সরকারি পর্যটন নিবাস নেই, কিন্তু মাঝারি মানের অনেক হোটেল আছে। টাবোতে থাকা যেতে পারে TOW DHEY HIMALAYA হোটেলে। ফোন নং-৯১৯৪১৮২৭১১২৯। ই-মেল-towdhey@gmail.com. যোগাযোগ করে যাওয়া যেতে পারে।

কল্পা পেরিয়ে পথ যত স্পিতির দিকে এগোচ্ছে, পাহাড়ের রূপ ততই বদলে যাচ্ছে। কল্পায় সবুজে মোড়া পাহাড়, দূরে কিন্নর কৈলাসের শ্বেতশুভ্র চূড়া, পথের পাশে সবুজ আর লাল আপেলের ক্ষেত – পথ যত এগোচ্ছে সবুজের ছোঁয়া কমছে। দু’পাশে উঁচু পাহাড়ের দেয়াল, সবুজের চিহ্নমাত্র নেই, কিন্তু কী তার রূপ। পাথরেরও যে এত রঙ হতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। পাহাড়ের গায়ে মন্দিরগাত্রের মত কারুকার্য। সঙ্গী ভূগোল-বিশারদ কল্যাণ রুদ্র ও গৌরী জানালেন বাতাসের অভিঘাতে, কোথাও বা জলের অভিঘাতে সৃষ্টি হয়েছে এমন কারুকার্য। সারা পথের সঙ্গী স্পিতি নদী-পাথরের আঘাতে শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে নদী-উপত্যকা জুড়ে।তার সাথে মিশেছে আরও অনেক পাহাড়ি নদী। রুক্ষ্ম প্রান্তরে মরূদ্যানের মত উইলো আর পপলার গাছের বন, তৈরি হয়েছে ছোট ছোট জনপদ। তেমনই এক ছোট্ট গ্রাম টাবো – রুক্ষ্মপাহাড়, নদী আর পপলারে ঘেরা। হেমন্তে গাছের পাতা হলুদ; আকাশ আর পাহাড়ের নীল মিলেমিশে একাকার।

টাবো গ্রামের উচ্চতা ১০,০১০ ফুট- গ্রামের প্রতিটি বাড়ি একই ধাঁচের (পুরো স্পিতিতেই দেখলাম একই ধাঁচের বাড়ি)। দুর্গম বলেই বোধহয় এরা এদের নিজস্বতাকে আঁকড়ে থাকতে পেরেছে। গ্রাম জুড়ে আপেল ক্ষেত – এটাই এদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এখন পর্যটকদের আগমনও হচ্ছে (বছরে বেশী হলে চার মাস)। তবুও এটা বিকল্প আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে – অনেক বাড়িতেই দেখলাম ‘হোম-স্টে’র ব্যবস্থা। সৌরবিদ্যুতের আয়োজন আছে সব বাড়িতে। শুনলাম এক বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সাহায্য করেছে সৌর-বিদ্যুৎব্যবস্থায়।

টাবোর প্রধান আকর্ষণ টাবো মনাস্টারি। হোটেলে পৌঁছোতেই ম্যানেজার বললেন, দেরি না করে মনাস্টারি ঘুরে আসুন।  পাঁচটার পরে বন্ধ হয়ে যাবে আর দিনের আলো কমে এলে দেখাও যাবে না ভালো করে। আমরাও সে পরামর্শ  শিরোধার্য করে তখনই চললাম মনাস্টারির উদ্দেশে।

আগেই শুনেছি এই মনাস্টারি ভারতবর্ষে প্রাচীনতম যা কিনা এখনও কর্মচঞ্চল। এটি ৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপন করেন এক তিব্বতী বৌদ্ধ রাজা Ye-Shes-o’d। তিনি তাঁর রাজত্ব প্রসারিত করেছিলেন তিব্বত থেকে লাদাখ ও পুরাং পর্যন্ত। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তাঁর রাজত্বের বাণিজ্য-পথ ধরে তিনি তৈরি করেছিলেন অনেক বৌদ্ধ-মঠ, টাবো তার অন্যতম। মনাস্টারি চত্বরে প্রথমেই চোখে পড়ল মাটির তৈরি নয়টি মন্দির এবং অনেক স্তূপ। এই আকারের বৌদ্ধ মন্দির আগে কখনো চোখে পড়েনি। পুরোনো মনাস্টারির পাশে দাঁড়িয়ে আছে সুদৃশ্য বিশাল নতুন মনাস্টারি ও লামাদের বাসস্থান। পুরোনো ও নতুনের মধ্যে আছে এক মাটির দেয়াল। পুরোনো চত্বরের নাম CHOS-KHOR(পবিত্র চত্বর)। বাইরে ক্যামেরা জমা দিয়ে প্রবেশ করলাম Chos-khor-এর প্রধান মন্দিরে। পথপ্রদর্শক বললেন এই প্রধান মন্দিরের প্রবেশ কক্ষটিই কেবল ৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি, অন্য অংশ তৈরির কাল একাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে। অন্ধকারে প্রায় কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, একটু পরে অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে দেখলাম দেয়াল জুড়ে অপূর্ব রঙ্গিন চিত্র। গাইড মহিলা দেখালেন রাজা Ye-she-o’d এবং তাঁর দুই পুত্রের ছবি। প্রবেশদ্বারের মুখেই আছে এক দেবীমূর্তি। শুনলাম তিনি হলেন রক্ষিকা দেবী। এই দেবী বৌদ্ধধর্মের সূচনার আগেও ছিলেন আরাধ্যা, তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্মেও তিনি স্থান পেয়েছেন। এই প্রবেশকক্ষের চিত্র কখনও নাকি সংস্কার করা হয়নি, অথচ কী তার রং। কিভাবে যে এত বছর টিঁকে আছে জানি না। ভিতরের কক্ষটি তুলনায় নবীন – একাদশ শতাব্দীর। পুরো কক্ষটি (মেঝে বাদ দিয়ে) নানা রঙ্গে,নানা চিত্রে ভর্তি। দেয়ালে বুদ্ধের জীবনের নানা কাহিনী চিত্রিত।আরেক দেয়ালে আছে সুধনের ধর্মযাত্রার বর্ণনাচিত্র। আরও কত যে দেবদেবী – অবলোকিতেশ্বর, মঞ্জুশ্রী, বজ্রপাণি। মুখোমুখি দেয়ালে একই চিত্রের হুবহু প্রতিলিপি। একেবারে ভিতরের কক্ষে আছে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধদেবের চিত্র, তাঁর পায়ের কাছে দুই দিকে দুই সিংহচিত্র-হুবহু এক। দুইপাশে বোধিসত্ত্ব – একদিকে শ্বেতবর্ণ অবলোকিতেশ্বর, আরেকদিকে নীলবর্ণ বজ্রসত্ত্ব। প্রতিটি মন্দিরেই নানা চিত্র, নানা কাহিনি, তথ্য না জানায় সব কাহিনি বুঝিনি, কিন্তু সৌন্দর্য উপভোগ তো তাতে আটকায় না, দু চোখ ভরে খালি দেখেছি আর ভেবেছি কত না পরিকল্পনা আছে এই শিল্পের পিছনে, অত যুগ আগে এখানকার চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় কিভাবেই বা দিনের পর দিন এঁকে গিয়েছেন শিল্পীরা, কি ছিল তাদের উপকরণ যা কিনা ছবিগুলোকে এখনো নষ্ট হতে দেয়নি? হিমালয়ের অজন্তা বলা হয় এই মনাস্টারিকে, সার্থক নাম। আহা, যদি নন্দলাল বসু একবার আসতেন এখানে।

মন্দির থেকে বেরিয়ে আলাপ হল ওখানে কর্মরত এক সন্ন্যাসীর সাথে, শুনলাম মঠের আরও কার্যকলাপের কথা।এই মঠের সন্ন্যাসীরা বহু চেষ্টায় টাবোর রুক্ষ জমিতে তৈরি করেছেন আপেল বাগান, গ্রামের লোকেদের শিখিয়েছেন আপেল খেত করতে। মঠে রয়েছে স্কুল, সেখানে আগে লামারাই পড়ত, ১৯৯৭ থেকে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য আরেকটা শাখা খোলা হয়। স্কুলের পাশে রয়েছে হস্টেল, দূর গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখানে থেকে পড়তে পারে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি লোককেই নানা কাজে জড়িয়ে রেখেছে এই মঠ। মঠের রয়েছে এক নিজস্ব অতিথিশালা যেখানে পর্যটকরাও থাকতে পারেন। এঁদের আয়ের উৎস এই অতিথিশালা, অতিথিশালা সংলগ্ন এক দোকান ও আপেল বাগান। টাবো হয়ে উঠেছে আদর্শ গ্রাম। যুগ যুগ ধরে কঠোর প্রকৃতির বুকে এঁরা করে চলেছেন নিরলস সাধনা।

শ্রদ্ধায় ভরে গেল মন।

Developed by DXDasia