চাষে এসেছে নয়া পদ্ধতি, বাংলার হাটে-বাজারে যা নতুন সবজির চাহিদা পূরণ করছে
আপনি কি সম্প্রতি সুপারমার্কেট কিংবা স্থানীয় বাজারগুলিতে এমন কিছু দেখেছেন, যা হয়তো দেখতে ফুলকপির মতো কিন্তু আমাদের পরিচিত ফুলকপি বলতে যা বুঝি, তা ঠিক নয়। এ আমাদের সেই চিরন্তন সাদা রঙের ফুলকপি নয়, রঙের নানা রকমফের। কখনও বেগুনি, কখনও কমলা কখনও বা তার রঙ সবুজ। গত কয়েক বছর ধরেই বাজারে আসছে এই ধরণের রঙিন ফুলকপি। এবং ক্রমশ তা জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু কী এই রঙিন ফুলকপি? কেমন হয় তার স্বাদ? আর কীভাবেই বা রান্নার পরও এই রঙিন ফুলকপিগুলি ধরে রাখছে তাদের রঙিন জৌলুস? এ নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকে বই কি!
গোটা বিশ্ব পরিবেশে আজ পরিবর্তনের আবহাওয়া, চলছে বিপর্যয়। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় ঘটেছে আকস্মিক পরিবর্তন। অসময়ের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে রাজ্য জুড়ে কৃষকদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। সারা বছর ধরে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে ফসল ও আবাদি জমি নষ্ট হয়েছে। চাষাবাদের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আনার জন্য দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা শীতকালে বিকল্প ফসল চাষের পদ্ধতির পথ খুঁজেছেন।

দামোদর নদী সংলগ্ন সোনাইচন্ডীপুর, বিস্তীর্ণ উর্বর জমি। প্রতিবছর শীতকালে এই এলাকায় আলু চাষ করতেন কৃষকেরা। অথচ এ বছর তাঁদের বেশিরভাগই বাধ্য হয়েছেন বিভিন্ন রঙের ফুলকপি এবং বাঁধাকপি চাষে ঝুঁকতে। একদিকে দাম বেড়েছে আলু বীজের, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের দামও বেড়েছে অনেকটাই। তার ওপর অসময়ে বৃষ্টি, সব মিলিয়ে আলু চাষের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এমনিতেই শীতকাল মানে বাজার জুড়ে ফুলকপি এবং বাঁধাকপির চাহিদা। তার ওপর বাড়তি পাওনা তাদের রঙিন বৈচিত্র্য, আবার পুষ্টিগুণেও আগের মতোই ভরপুর তারা। তাই সহজেই স্থানীয় বাজারে জায়গা করে নিতে পেরেছে এই শীতকালীন রং বেরঙের সবজিরা।
বেগুনি ফুলকপি তার রঙ পায় ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ থেকে, এটি একটি প্রাকৃতিক ফাইটোকেমিক্যাল যা অন্যান্য লাল, নীল বা বেগুনি রঙের ফল এবং সবজির পাশাপাশি লাল ওয়াইনেও পাওয়া যায়। কমলা ফুলকপির রঙের পিছনে ‘ক্যারোটিনয়েড’-এর ভূমিকা রয়েছে। এই ক্যারোটিনয়েডগুলি গাজর, স্কোয়াশ এবং অন্যান্য হলুদ শাকসবজি এবং ফলগুলিতেও পাওয়া যায়। কমলা ফুলকপি আসলে একটি জেনেটিক মিউটেশন হিসেবে এসেছে যা এটিকে তার সাদা অংশের তুলনায় বেশি বিটা ক্যারোটিন ধারণ করতে দেয়।
চিরন্তন সাদা রঙের ফুলকপি ছাড়াও আজকের বাজারে রয়েছে হলুদ, সবুজ, বেগুনি রঙের ফুলকপি। পাশাপাশি রয়েছে রঙিন বাঁধাকপিও। শহরের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতি পিস ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এই সবজি। যদিও খুচরো বাজারে এর দাম থাকছে অনেক বেশি। আগে সাদা ফুলকপিই ছিল একমাত্র বিকল্প, এখন বাজারে জায়গা করে নিয়েছে তার রঙিন বন্ধুরাও। এই সমস্ত রঙিন ফুলকপিও সাদা ফুলকপির মতো, ক্রুসিফেরাস উদ্ভিজ্জ পরিবারের সদস্য। স্বাদে এবং গঠনে কোনও তফাৎ করা যায় না তাদের। তফাৎ শুধু রঙে। এছাড়া পুষ্টি-মূল্যের সামান্য পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

এ যেন কৃষি বিজ্ঞানীদের এক আশ্চর্যজনক বৈকল্পিক পদক্ষেপ। যার দ্বারা ঐতিহ্যবাহী সাদা ফুলকপিগুলিকে পরিবর্তিত করে কমলা, বেগুনি এবং সবুজ করা হচ্ছে। এই অভিনব ‘রেনবো ফুলকপি’ স্বাদে হয়তো রয়েছে একই রকম কিন্তু রঙের গুণে তা সহজেই খাবার টেবিলে অন্য চমক তৈরি করছে। এই রঙিন কপিগুলি হল ঐতিহ্যবাহী বিশেষ প্রজননের ফলাফল। কিছু বিজ্ঞানী এমনও দাবি করেছেন যে এই নতুন ফুলকপিগুলি নাকি যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর।
সাদা ফুলকপিগুলিকে সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখা হত যাতে আলোর প্রভাবে সাদা ফুলকপিগুলি হলুদ রঙে পরিণত না হতে পারে। তাই পুরোনো জাতগুলিকে ব্লাঞ্চ করার দরকার পড়ত(আলোর অনুপ্রবেশের পরিমাণ কমাতে ভিতরের পাতাগুলি ছোট মাথার উপর আলগাভাবে বাঁধা হয়)। কিন্তু নতুন জাতগুলি নিজে থেকেই ব্লাঞ্চিং হয় কারণ গাছপালা অভ্যন্তরীণ পাতা তৈরি করে যা আলোর অনুপ্রবেশ রোধ করে মাথাকে শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে।
বেগুনি ফুলকপি তার রঙ পায় ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ থেকে, এটি একটি প্রাকৃতিক ফাইটোকেমিক্যাল যা অন্যান্য লাল, নীল বা বেগুনি রঙের ফল এবং সবজির পাশাপাশি লাল ওয়াইনেও পাওয়া যায়। কমলা ফুলকপির রঙের পিছনে ‘ক্যারোটিনয়েড’-এর ভূমিকা রয়েছে। এই ক্যারোটিনয়েডগুলি গাজর, স্কোয়াশ এবং অন্যান্য হলুদ শাকসবজি এবং ফলগুলিতেও পাওয়া যায়। কমলা ফুলকপি আসলে একটি জেনেটিক মিউটেশন হিসেবে এসেছে যা এটিকে তার সাদা অংশের তুলনায় বেশি বিটা ক্যারোটিন ধারণ করতে দেয়। সবুজ রঙের ফুলকপি, ‘ব্রোকোফ্লাওয়ার’ নামেও পরিচিত, যা ব্রকলি এবং ফুলকপির একটি সংকর। সবুজ ফুলকপিতে সাদা ফুলকপির চেয়ে বেশি বিটা ক্যারোটিন থাকে, তবে তা ব্রকলির চেয়ে কম।

যদিও সনাতনবাদীদের মতে, এই একাধিক রঙের সবজির প্রচলন এই প্রথমবার নয়। এর আগেও উদ্ভিদ প্রজননকারীরা সবজির চেহারা পরিবর্তন করেছেন। ১৭ শতক পর্যন্ত, ইউরোপে বেশিরভাগের খাদ্যতালিকায় ‘কমন’ ছিল সাদা, হলুদ অথবা বেগুনি রঙের গাজর। হল্যান্ডের রাজপরিবারকে উদযাপন করে ডাচ উদ্ভিদ প্রজননকারীদের দ্বারা কমলা রঙের রঞ্জক যোগ করা হয়েছে আগেই।

গত কয়েক বছর ধরে ব্রিটেনের সুপারমার্কেটে হলুদ টমেটো এবং বেগুনি আলু সহ বেগুনি গাজরের প্রচলন দেখা গেছে। আমেরিকায়, এই রঙিন ফুলকপি বেশ কয়েক বছর ধরে পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয় আমেরিকার বাজারে যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছে তারা। কমলা ফুলকপিতে বিটা ক্যারোটিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকে। এটি ভিটামিন এ-এর একটি রূপ যা ত্বককে স্বাস্থ্যকর করে। বেগুনি রঙটি আসে অ্যান্থোসায়ানিন থেকে, যা রক্ত জমাট বাঁধা কমিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। আমেরিকায় কমলা ফুলকপির পরীক্ষায় দেখা গেছে যে সাধারণ ফুলকপির তুলনায় এতে বিটা ক্যারোটিনের ঘনত্ব প্রায় ২৫ গুণ বেশি থাকে।
নেদারল্যান্ডস এবং ফ্রান্সে রঙিন ফুলকপি এবং বাঁধাকপির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশের কৃষকরা এ ধরনের চাষে আগ্রহও দেখাচ্ছেন। তাঁরা এই সবজির বাণিজ্যিক মূল্য বুঝতে পেরে ব্যাপকভাবে এই চাষে ঝুঁকছেন। দুর্গাপুর মহকুমার বিভিন্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক কৃষক এ বছর রঙিন সবজি চাষ করেছেন। এই রঙিন ফুলকপি কাঁচা কিংবা ভাজা অথবা ভাপা, সবেতেই মন ভরাতে পেরেছে খাদ্যপ্রেমীদের।
প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে