ইলা মজুমদার : বাংলার তথা ভারতের প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার

বাংলার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজ স্থাপনের নেপথ্যে ছিলেন তিনিই

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা যান্ত্রিক পদ্ধতির যাবতীয় পড়াশোনা শুধুমাত্র পুরুষদের আগ্রহের বিষয়, আমাদের সমাজ সবসময় এরকমই ভেবে এসছে। এই ভাবনা কতটা ভুল, ১৯৫২ সালেই তা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন ইলা মজুমদার (Ila Majumdar)। নিজের অজান্তেই সেসময় ইতিহাস তৈরি করেন তিনি। ইলা মজুমদার – বাংলা তথা ভারতের প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি) থেকে স্নাতক হওয়া প্রথম মহিলা।

পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর গ্রামে জন্ম ইলা মজুমদারের। বাবা যতীন্দ্র কুমার মজুমদার ছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস)। ইলার সমস্ত প্রচেষ্টায় বরাবর উৎসাহ দিতেন তিনিই। মা ছিলেন গৃহিণী। বাবার বদলির চাকরির জন্য, ইলার স্কুলজীবন কাটে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে। ১২ বছর বয়সে সাইকেল চালানো শেখা  এবং ১৬ বছর বয়সে জীপ চালানো রপ্ত করা, তাঁর বন্ধু, পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের অবাক করেছিল।   

অবশেষে, ১৯৪৫ সালে ইলারা সপরিবারে কলকাতায় এসে পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন। ইলা প্রাইভেটে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলেন নিয়মমাফিক বয়সের বছর দুই আগেই। পড়াশোনায় বরাবর ভালো হলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে মাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তবে, হাল না ছেড়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেন ইলা। এরপরই কলকাতার আশুতোষ কলেজে যোগ দেন আইএসসির জন্য ও প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।

সেই সময়ে খুব কম মেয়েরাই পেশাগত জীবনে প্রবেশ করতে পারতেন। ইলার বেড়ে ওঠা ছিল সমসাময়িক মেয়েদের থেকে খানিক অন্যরকম, তুলনামূলক মুক্ত পরিবেশে। ১৯৪৭ সালে, ভারতের স্বাধীনতার পর ভারত সরকার ঘোষণা করলেন যে, শিক্ষার সমস্ত ক্ষেত্র মেয়ে এবং ছেলে উভয়ের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পেলেও ইলা  ডাক্তারি পড়তে চাইলেন না। তিনি কারিগরি শিক্ষার বিষয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। চাইলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে, যেটা এতদিন শুধুমাত্র পুরুষরাই পড়তো। ইতিমধ্যেই তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নিকুঞ্জ বেহারি মাইতি শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দরজা মহিলাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। 

বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিই) কলেজেও প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ইলা। যেহেতু বিই কলেজে মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো পরিকাঠামো ছিল না, তাই তাঁকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। তবে, শুধু ইলা নন, তাঁর সঙ্গে আর একজন মহিলাও প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি অজন্তা গুহ, দ্বিতীয় বর্ষে বাদ পড়েন। সে সময় শিবপুরের কয়েকশো ভারতীয় এবং ইউরোপীয়ান ছাত্রের মধ্যে ইলাই হয়ে উঠেছিলেন একমাত্র ছাত্রী। ইলা চেয়েছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে, কিন্তু এই শাখায় অত্যন্ত ভারী যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ হওয়ায় অধ্যক্ষ তাঁকে অনুমতি দেননি, সেই জন্য শেষ পর্যন্ত তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন।

কেমব্রিজে কক্তব্য রাখছেন ইলা

লা মজুমদারের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব বাংলার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজ স্থাপন করা। ১৯৬৩ সালে কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। ইলা মজুমদার ছিলেন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে রাষ্ট্রপুঞ্জের পক্ষ থেকে ইলাকে বাংলাদেশের ঢাকায় একটি পলিটেকনিক কলেজ স্থাপন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন ক্যাম্পাসে, ইলা চারশোর বেশি ছেলেদের মধ্যে একা ছাত্রী ছিলেন। চেনা পরিবেশ থেকে দূরে এই পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হলেও তাঁকে এইসব সমস্যার মোকাবিলা নিজেকেই করতে হয়েছিল। সে সময়ে আর কোনও ছাত্রী না থাকায় ছাত্রী আবাস ছিল না, সেইজন্য ইলাকে থাকতে হত কলেজের লাইব্রেরি সংলগ্ন একটি ঘরে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক পুলিন বিহারি ঘোষ বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন ইলাকে, তিনি প্রায় ইলার স্থানীয় অভিভাবকের মতো ছিলেন। এমনকি তিনি ইলার পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করতেও চেয়েছিলেন।

 

১৯৫১ সালে ইলা স্নাতক হন, ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্থায়ী করেন। সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী, স্নাতক হওয়ার পর সেই ছাত্রকে শিক্ষানবিশ হিসাবে কিছু সময় কাজ করতে হত। কিন্তু বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ মনে করেন, ভারতের কোনও সংস্থা তখনও শিক্ষানবিশ হিসাবে মেয়েদের নেওয়ার জন্য তৈরি ছিল না। সেইজন্য ইলাকে ইউরোপের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে যেতে হয় শিক্ষানবিশির জন্য। সেখানে ‘বার অ্যান্ড স্টাইড’ সংস্থা থেকে তিনি স্নাতকোত্তর স্তরের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর দেশে ফিরে এসে ইলা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি দেরাদুনে (OFD) একটি ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় যোগ দেন। স্বভাবতই তিনি ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং উৎপাদন বিভাগে কর্মরতা প্রথম ভারতীয় মহিলা। এখানে ইলা ছয় মাস চাকরি করেন। এরপর তিনি ১৯৫৫ সালে দিল্লি পলিটেকনিক কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালে, বিয়ের পর তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসেন এবং ইন্সটিটিউট অফ জুট টেকনোলজি-তে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যে, তিনি দুটি বইও প্রকাশ করেন, ‘অ্যাপ্লাইড মেকানিক্স থ্রু ওয়ার্কড এক্সাম্পলস’ এবং ‘হাইড্রলিক্স থ্রু ওয়ার্কড এক্সাম্পলস’।

ইলা মজুমদারের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব বাংলার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজ স্থাপন করা। ১৯৬৩ সালে কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। ইলা মজুমদার ছিলেন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে রাষ্ট্রপুঞ্জের পক্ষ থেকে ইলাকে বাংলাদেশের ঢাকায় একটি পলিটেকনিক কলেজ স্থাপন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশে যান এবং সফলভাবে পলিটেকনিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৭ সালে, তিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত মহিলা প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৮৫ সালে, তিনি বাংলাদেশের ঢাকায় মহিলা পলিটেকনিক স্থাপনের জন্য ইউনেস্কো-স্পন্সর প্রকল্পে প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা (CAO) নিযুক্ত হন।

২০১৯ সালের নভেম্বরে ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হন ইলা মজুমদার ঘোষ। আজীবন সাহস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করে যাওয়া ইলাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দীর্ঘ এবং সফল কর্মজীবনে তিনি লিঙ্গ পক্ষপাতের মুখোমুখি হয়েছেন কিনা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “অবশ্যই, আমি আমার পেশাগত জীবনে সব সময় লিঙ্গ পক্ষপাতের সম্মুখীন হয়েছি। আমার মনে হয়, সমাজের মানসিকতা বদলাতে অনেক সময় লাগবে, ততদিন সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। কর্মক্ষেত্রে যখন কোনও মহিলার পদোন্নতির সময় আসে, কর্তৃপক্ষ তখন অজুহাত খুঁজতে থাকে কীভাবে সেটা আটকানো যায়। কিছুতেই তাকে উপযুক্ত জায়গা দেওয়া হয় না কারণ এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কেউই চান না মহিলা-কর্তৃত্ব।”

Developed by DXDasia