কলকাতার খালাসিটোলা : ‘কেটি’র নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত বাংলা কবিতা

ষাট-সত্তরের বাংলা সাহিত্যের ‘বিকল্প’ পীঠস্থান

সেএক নেশাগ্রস্ত অবস্থা। কেমন নেশা? শুধুই কি নেশা? সে কথায় আসছি। ষাট থেকে সত্তর, বিশেষত সেই সময়ে কলকাতার বেশ কিছু পানশালা হয়ে উঠেছিল সাহিত্যসংস্কৃতির পীঠস্থান। বারোদুয়ারী, টাওয়ার, শ্যামবাজার, ভবানীপুর, অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন ক্লাব, ছোটা ব্রিস্টল এবং অবশ্যই খালাসিটোলা। কোনও এক অমোঘ টানে সেসময় কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবিরা নিয়মিত সেইসব সুরা-পথে পা বাড়াতেন। সুরা (বিশেষত দেশি) তাঁদের কাছে বোধহয় ‘নাটোরের বনলতা সেন’ হয়ে উঠেছিল, যা দু-দণ্ড শান্তি দিতে পারতো! পানশালার ঠেকে হাসি-তামাশা, চিত্রনাট্য, কবিতা, ছবি সবই এক দেহে লীন। কলকাতার শ্রীহীন, চালচুলোহীন, আলো-আঁধারি মাখা ছাপোষা পানশালাগুলো তখন ঠিক যেন প্যারিস–মমার্তের কোনও পাব বা ক্যাফে, সারাক্ষণ নির্মাণ অথবা বিনির্মাণের সুখদুঃখে সরগরম। জল এতদূর গড়িয়ে ছিল যে, বাড়িতে না গিয়ে, কারও সঙ্গে দেখা করতে হলে, তার নিয়মিত ঠেকে গেলেই হত। দেখা হবেই। সুনীল, শক্তি, সুবিমল, তুষার, ভাস্কর, মলয়, প্রভাত, সন্দীপন, বিনয়, উৎপলকুমার, কমলকুমার, অনন্য, ঋত্বিক, বুদ্ধদেব – কলকাতার পানশালা থেকেই একসময় অসামান্য সব বড়ো বড়ো পত্রিকা, কবিতা, গদ্য বা চিত্রনাট্যের বীজবপন হয়েছে। আর সেই সমস্ত ঠেকের মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত হয়ে উঠেছিল ওয়েলিংটনের ‘কেটি’ (ডাকনাম) ওরফে খালাসিটোলা।

টোলা অর্থ পাড়া। খালাসিটোলা সেই অর্থে কৌলিন্যহীন খালাসিদের পাড়া। কলকাতা কর্পোরেশন স্ট্রিট ডায়েরিতেও যার নামগন্ধ ছিল না। শোনা যায়, ইংরেজ আমলে হুগলি বন্দরে জাহাজের যাতায়াত যখন সচল ছিল, খালাসিরা নেমে সম্ভবত এখানে ঠেক নিত। পরে যা হয়ে ওঠে ‘কান্ট্রি লিকার শপ’ বা দিশি মদের দোকান। কফি হাউসের আড্ডা মুখে করে নিয়ে ষাটের বাঘা বাঘা কবি-সাহিত্যিকরা সারাদিনের ধারাবাহিক সম্পূর্ণ করতে চলে আসতেন কেটিতে। অবশ্য, পঞ্চাশের কবি-লেখকরা ষাটের প্রথম কয়েক ধাপের পর খালাসিটোলায় যাতায়াত প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল ‘বার’প্রীতির কারণে।

শুধুমাত্র মদ্যপানের জন্যই কি এই পানশালা সেসময়ের কলকাতার সৃষ্টিশীল মানুষদের আপন ছিল? না। শুধুমাত্র মোচ্ছব বা গেলাস-প্রীতিই শেষ কথা ছিল না। খালাসিটোলার সাইনবোর্ডহীন ভাঙা টিনের চাল, বাতার বেড়া, মেঘ, জল, রোদ্দুরের আড্ডা কীভাবে যেন সৃষ্টিশীল মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। ‘খালাসিটোলা’ নামের মধ্যেই প্রলেতারিয়েত বিদ্যমান – এখানে ঠেলাওয়ালা, মুটে মজুর, রিক্সাওয়ালা, ডোম, মুচি, মেথর, কবি, বুদ্ধিজীবী সকলেই সবার বন্ধু, ভাই। বিবেকালেখ্য, জীবনবীক্ষা সে যে ভাবেই ভাবুন না কেন!

‘খালাসিটোলা’ নামের মধ্যেই প্রলেতারিয়েত বিদ্যমান – এখানে অতি সাধারণ ঠেলাওয়ালা, মুটে মজুর, রিক্সাওয়ালা, ডোম, মুচি, মেথর, কবি, বুদ্ধিজীবী সকলেই সবার বন্ধু, ভাই। বিবেকালেখ্য, জীবনবীক্ষা সে যে ভাবেই ভাবুন না কেন!

এইসবের ভিতর কারা যেন রটিয়ে দিয়েছিল, কবিদিগের যন্ত্রণা আবহমান আর যন্ত্রণা নিরাময়ের আদর্শ হল গিয়ে কোনও দুঃস্থ, রুগ্ন, কুটিল স্থানের দেশিয় শুঁড়িখানা। একথা সেসময় বেশ প্রচার পেয়েছিল এবং নাতিদীর্ঘ সময় পর প্রতিষ্ঠাও। স্বয়ং কমলকুমার মজুমদারই একদিন কৃত্তিবাসীদের চিনিয়েছিলেন বিপথের আনন্দলহরী ‘কেটি’কে। খালাসিটোলার পত্তন কবে, তা কোনও গবেষক বলে উঠতে পারেননি। মনে করা হয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে বা পরে কোনও এক সময়ে হয়ে থাকবে। অন্তত কমলকুমার মজুমদারের তাই ধারণা ছিল। পাক্কা সাহেবী কেতা থেকে যিনি একদিন সামান্য পথচারীর ঠাট্টায় হঠাৎই ধুতি পাঞ্জাবী ধরেছিলেন। বিদেশি ছেড়ে হয়েছিলেন পুরোপুরী দেশি। বস্তুত তাঁর জন্যই খালাসিটোলা বাংলা সাহিত্যে আসে, খ্যাত হয়। কমলকুমারের জন্যই দেশ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ থেকে শাঁটুল গুপ্ত – কে না খালাসিটোলায় এসেছেন! একবার ‘বিভাব’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত কমলকুমারকে ছোটা ব্রিস্টল-এ নিয়ে যান (সেদিন খালাসিটোলা বন্ধ ছিল বলে)। একটা রামের পেগ নিয়ে তিনি বসে আছেন তো আছেনই। মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছেন। ঘর ভর্তি ধোঁয়া। বললেন, “তোমরা বুঝি এখানেই আসো? এখানে কি কোনও ভদ্রলোক আসে?”। এমনই ছিল তাঁর কেটি-প্রীতি। আর সুনীল তো সেসব দিনের স্মৃতি সময়ের জন্য বাঁধিয়ে রেখেছেন তাঁর ‘বাঁধানো ছবি’-তে,

যদি ভাবতে পারতাম, শ্যামল এখন আড্ডা দিচ্ছে
কবিতা সিংহের সঙ্গে
পাশে বসে আছে শক্তি, বিমল আর শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়
মিটি মিটি হাসছে ভাস্কর দত্ত…

কেন ভাবতে পারব না, এ দৃশ্য তো রচনা করাই যায়
ফিনফিনে সাদা পাঞ্জাবি পরা, নিষ্পাপ, সরল-সাদা শ্যামলের মুখখানিতে
রাজ্যের দুষ্টু পরিকল্পনা
শক্তির কথা যখনই ভাবি, সে একটু একটু দুলছে, যেন
দাঁড়িয়ে আছে জাহাজের ডেকে
বিমল চুটকি দিয়ে খোঁচাচ্ছে শঙ্করকে
কবিতা বারবার বলছে, আমি কিন্তু খেলব না, আমি আর খেলব না
ভাস্কর হঠাৎ বলে উঠল, সুনীল কোথায়, সুনীলকে ডাক না
আমরা খালাসিটোলায় যাব
স্মৃতি দিয়ে বাঁধানো কফি হাউজের সিঁড়ি, ভেতরে

যৌবনের হলকা
হঠাৎ এসে ঢুকলেন, সক্রেটিসের মতন, কমলকুমার..

আমি এ ছবিটা ভাঙতে চাই না
শুধু মনে মনে একটু অপরাধ বোধ হয়, তখন
জানলা খুলে দিই!

কৃত্তিবাসী হয়ে খালাসিটোলা-ব্যাটন ওঠে হাংরিদের হাতে। তা সেই হাংরি আন্দোলনের জীবিত স্রষ্টা ও কবি, মলয় রায়চৌধুরীকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, কেন যেতেন খালাসটোলায়? হাংরিরা শুনেছি কেটি-তে জীবনানন্দের জন্মদিন পালন করেছিল?

“১৯৬৮ সালের সন্ধ্যা। হাংরি আন্দোলনকারীরা খালাসিটোলায় জড়ো হয়েছেন জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন পালনের জন্য । টেবিলে উঠে পড়লেন অবনী ধর আর নাচের সঙ্গে গাইতে লাগলেন গানটা, যা তিনি জাহাজে খালসির কাজ করার সময়ে গাইতেন, বিদেশি খালাসিদের সঙ্গে। উপস্হিত সবাই, এমনকি হাংরি আন্দোলনের কয়েকজন ভেবেছিলেন গানটা আবোল-তাবোল, কেননা ইংরেজিতে তো এমনতর শব্দ তাঁদের জানা ছিল না। যে সাংবাদিকরা খবর কভার করতে এসেছিলেন তাঁরাও গানটাকে ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীদের বজ্জাতি, প্রচার পাবার ধান্দা। পরের দিন ‘দি স্টেটসম্যান’ যে সংবাদ দিয়েছিল তাতে ভাসা-ভাসা উল্লেখ ছিল। সেই সপ্তাহের ‘অমৃত’পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’শিরোনামে ঠাট্টা করে দুই পাতা চুটকি লেখা হয়েছিল, অবনী ধরের কার্টুনের সঙ্গে। ‘লস্ট জেনারেশন’ তকমাটি যিনি ব্যবহার করেছিলেন তিনি জানতেন না যে এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন গারট্রুড স্টিন এবং বিশ শতকের বিশের দশকে প্যারিসে আশ্রয় নেয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, টি. এস. এলিয়ট, জন ডস প্যাসস, ই ই কামিংস, আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ, হার্ট ক্রেন প্রমুখকে বলা হয়েছিল ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সদস্য।”

আবার ২০০২ সালে এক পত্রিকার সম্পাদককে খালাসিটোলা নিয়ে লেখা দিতে গিয়ে চিঠিতে লিখেছেন, আপনার নাকি মনে পড়ে না, তাই একদিন ট্যাক্সি নিয়ে গিয়েছিলেন সেইসব স্মৃতি রোমন্থন করতে? লিখেছিলেন, “জায়গাটা খুঁজতেই পনেরো মিনিট লেগে গেল। কিন্তু কিছুই মনে করতে পারলুম না। কোনও পরিচিত মুখও দেখলুম না। এমনকি দুর্গন্ধে বমি পেয়ে গেল।” কেন?

“১৯৬১ সালে একবার খালাসিটোলায় পাশের লোকটা হাতে গেলাস নিয়ে কাঁদছিল দেখে আমারও কান্না পেয়ে গিয়েছিল; খালাসিটোলায় প্রথম গিয়েছিলুম পিসেমশায় আর পিসতুতো দাদা অজয় হালদারের সঙ্গে। পিসেমশায় বাংলা মদকে বলতেন ধান্যেশ্বরী । তখন জানতুম না যে এখানে কফিহাউসের সাহিত্যিকরাও আসে। পিসেমশায়ের সঙ্গে গিয়েছিলুম বলে সেখানকার ম্যানেজার কালীদার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। কালীদা খড়ম পরতেন আর যারা রাত ন’টার পরও বসে থাকতো তাদের পায়ে খড়মের চাপ দিয়ে তুলে দিতেন। …পরে হাংরি আন্দোলনের সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে যাতায়াত আরম্ভ করি। তখন কাঁচের বোতলে আলকাতরা দিয়ে সিল করা বাংলা পাওয়া যেতো। বোতল ফেরত দিলে তার দামের বদলে মদ পাওয়া যেতো। বোতল খুলে আলকাতরা যাতে না খেয়ে ফেলি তাই রুমালে ছেঁকে নিতুম। যখন মামলা আরম্ভ হল তখন কয়েকজন বন্ধু রাজসাক্ষী হয়ে কেটে পড়ার পর সুবিমল বসাক, দেবী রায়, ত্রিদিব মিত্রের সঙ্গে যেতুম। আদা-ছোলা সহযোগে খেতুম। এখন অবাঙালি শ্রমিকদের ভিড় বেশি। এখন প্লাসটিকের বোতলে পাওয়া যায়।”

খালাসিটোলার গমগমে চিত্রখানি শুধুমাত্র কিছু সময়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল। ষাটের শুরু থেকে সত্তরের শেষ অবধি। তারপর ও পথ মাড়ানো ছেড়ে দিতে থাকেন বাংলা সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যকে সেসময় যাঁরা গৌরবান্বিত করেছিলেন তার বেশিরভাগই।

খালাসিটোলার গমগমে চিত্রখানি শুধুমাত্র কিছু সময়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল। ষাটের শুরু থেকে সত্তরের শেষ অবধি। তারপর ও পথ মাড়ানো ছেড়ে দিতে থাকেন বাংলা সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যকে সেসময় যাঁরা গৌরবান্বিত করেছিলেন তার বেশিরভাগই। অনেক বছর পর তাঁদের কেউ কেউ যখন ওই পথের আশে পাশে গিয়েছেন, বোঁটকা গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে ছাড়া আর কিছু পাননি। পরবর্তী প্রজন্মের কেউ কেউ নস্টালজিক হয়ে কেটিতে গেলে তাদেরও ঐ অভিজ্ঞতা হয়েছে বলেই শোনা যায়। ‘হাংরি’ পরবর্তী ৮০ বা ৯০-এর দশকেও সাহিত্যজগতের কেউ কেউ দলগত ভাবে বা একা একা কেটিতে যেত। কেটির কফিনে শেষ পেরেকটা বোধ হয় তারাই মেরেছিলেন। বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের উল্লেখযোগ্য একটি নাম ‘গ্রাফিত্তি’। তার সম্পাদক শুভঙ্কর দাশ সেই সময়েরই কেটি-যাত্রী। “কেটির প্রতি আমার কোনও প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই। হাংরিদের মতো ওটাকে পোয়েটস্‌ পাব ভেবে লড়ে যাওয়ার মানসিকতাও নেই। প্রথম কার হাত ধরে কেটি চিনেছি, কোলকাতা চিনেছি কে জানে? আদৌ চিনেছি কি? অনেকের সঙ্গেই গিয়েছে… কখনো একা একা ছোলা সেদ্ধর সঙ্গে। কখনও হাতঘড়ি মেকানিক দুই পার্টনার ছিল সফরসঙ্গী। কত রকমের কত ধরনের কত বিষয়ের। খালাসিটোলা আমার কাছে এক মহাশোক। সেই মহাশোকে আমার সারাজীবনের কান্না ফুরিয়ে গেছে।”

আসলে যে আবেগ সত্তরের কবিতার ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতরে’ খেলা করেছিল তারও সূচনা হয়েছিল ষাটের শেষে, রাজনৈতিক আন্দোলনের অদৃষ্টপূর্ব বজ্র-বিদ্যুতে। রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ সত্তর ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী খণ্ডিত বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির এক জল-বিভাজিকা। ষাট দশকের খাদ্য-আন্দোলন, দীর্ঘ কংগ্রেসী শাসনের অবসান, অভূতপূর্ব উন্মাদনার মধ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা এবং তারপর সাতষট্টির মে মাসে নকশালবাড়িতে ‘বসন্তের ব্জ্রনির্ঘোষ’, এইভাবে রচিত হয়েছিল বাংলার ‘মুক্তির দশক’ সত্তেরর অগ্নিপরিধি : ‘বন্দুকের নল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস’। উত্তরের তরাই থেকে দক্ষিণের সাগর-সঙ্গম, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা—শ্রেণীশত্রু-খতম—বিপ্লবী গেরিলাযুদ্ধ—রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ণ, এইসব প্রত্যক্ষ কার্যক্রমে বিপর্যস্ত ও রক্তাক্ত সত্তর ছিল পূর্ববর্তী দশকগুলোর থেকে অনেকটাই আলাদা। বিপ্লবী হিংসা ও প্রতিবিপ্লবী প্রতিহিংসা লাঞ্ছিত বাংলার গ্রাম-শহর-শহরতলি, সন্ত্রাস ও মৃত্যু কবলিত বাংলার বিপন্নতা সত্তর দশককে দিয়েছিল শোক-দুঃখ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের এক বিষ্ফোরক সংক্রান্তি, নবারুণ ভট্টাচার্যের উচ্চকিত ঘোষণায় যে বারুদ-পরিস্থিতি অবিস্মরণীয়ভাবে চিহ্নিত হয়েছিল—‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/ এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/ এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না।’

“কৌরব” পত্রিকার ৯২ তম ‘খালাসিটোলা’ সংখ্যার মুখবন্ধে কমল চক্রবর্তী বলেছেন, “কেটিতে অদ্ভুত একধরনের স্বাধীনতা আমরা ভোগ করতাম। কারণ আমরা ‘পরাধীন’। নানা ভাবেই। সে লেখাপত্র, জীবনযাপন, অর্থনৈতিক, ছাপাখানা, সামাজিক, সূর্যচন্দ্র, পরিবেশ, সবকিছুই আমাদের ঠিক মনমতো ছিল না – নানা ভাবেই প্রতিবন্ধী-জীবন। যতটা বিছানা দরকার তার থেকেও ছোটো, এক খাটে ভাই-এর সঙ্গে। যে ভাবে প্রেম করতে চাই, পয়সা নেই, প্রেমিকাকে নিয়ে কোথাও যেতে পারি না। যেভাবে লিখতে চাই, যে বই পড়তে চাই, হত না। যেভাবে লেখাপত্র প্রকাশিত হওয়ার, না। চাকরি, যেমন করার কথা, হল না। বেড়াতে যেখানে যেতে চাই, হয় না। …মা-বাবার ম্লান অসুখী মুখ। রাজনীতির অমিল, অনিয়ন্ত্রিত, অসহ্য আচরণ, কিছু করতে পারি না। আসলে আমরা একটা খুব ক্যাপসুলে বন্দী। একটু হাত পা মেলে, একতু আকাশ আকাশ হয়ে দাঁড়াতে চাই। জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব, মানিক, তারাশংকর, বিভূতি, সতীনাথ, বনফুল ভেতরে মোচড় দেয়। …এরকম সমস্ত না হওয়া, ব্যর্থতা, যন্ত্রনা সব ঐ কেটিতে পেয়ে যেতাম, ভুলে যেতাম বা ঘোরে চলে যেতাম। একটা পরাবাস্তব অবস্থা। তলানি থেকে উত্থান। বাঁচার জন্য সাঁতার। ফলে কেটি হয়ে উঠেছিল জীবনযাপনের আদর্শ-আশ্রয়।”

কবিরা ছাড়া নরকের অমৃত কেই বা চেখে দেখতে চায়! বাংলা সমাজ-সাহিত্যে খালাসিটোলা চির রোমান্টিক উন্মুক্ত মঞ্চ হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে। তাই নয় কি? অমিতাভ কাঞ্জিলাল-কে উৎসর্গ করে আশির দশকের কবি রাহুল পুরকায়স্থ (‘কেটি’র অন্যতম প্রেমিক) ‘টেবিলসন্ধ্যারা দূরে’ শীর্ষক একটি কবিতায় লিখেছিলেন, “অপঠিত আলো/ আজো ম্লান, আরো ম্লান/ নীল অবকাশে/ ঝুঁকে আছে, রক্তগোধূলির/ অন্তিম আনন্দ আজ/ গেলাসে ও গ্লাসে/ তৃষিত আর্তের মায়া ক্রমজায়মান/ আমার আদল আমি জড়ায় আমাকে” 

ঋণঃ

কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরেজির অধ্যাপক

মলয় রায়চৌধুরী

কৌরব ৯২

Post Tags
Developed by DXDasia