
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের পাঠক সবাই হতে পারে না। সন্দীপন বাংলা সাহিত্যের সেই অপরাধী, শাস্তির কথা না ভেবে যিনি পাঠকের কাছে কবুল করে গিয়েছেন আগাগোড়া। যাকে বলে, ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে যাত্রা। ব্যক্তিগত ডায়েরিতে ছদ্মনাম-ছদ্মঘটনা না থাকারই কথা, তার ওপর তা যদি হয় সন্দীপনের, যাঁর প্রতিটি লেখাই যাকে বলে ‘ব্লাডি ট্রুথ’। তাই, পাঠককুলে তাঁর ‘ট্রায়াল’ চলছে বছরের পর বছর। সন্দীপনের ডায়েরি তাই আজও ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’।
১৯৬১ সালে তাঁর উপন্যাস ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ প্রকাশের পর, পাঠপ্রতিক্রিয়ায় সমসাময়িক এক তরুণ তুর্কি (সম্ভবত সুনীল গাঙ্গুলি) ঘোষণা করেছিলেন, “বাংলা সাহিত্য যদি কোনোদিন সত্যভাষী হয় তবে আজ থেকে ৩০ কি ৫০ বছর পরে এই কৃশকায় গল্পগ্রন্থটির খোঁজ পড়বে।” আষাঢ়ে গল্প হয়ে যায়নি সেই ঘোষণা। সত্যভাষী বাংলা সাহিত্য হিসেবে তরুণ প্রজন্ম আজ সন্দীপনকে খুঁজছে।
আসলে সন্দীপনের যাবতীয় গদ্য শেষত হয়ে উঠতো কবিতা। তাঁর লক্ষ্যই ছিল গদ্যের কঠিন হীরে কেটে কবিতার উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দেওয়া। সামাজিক, আঞ্চলিক, ঐতিহাসিক বা মনস্তাত্ত্বিক এরকম কোনও কবিতা যখন হয় না, উপন্যাসও হবার নয়। তাই নিজের উপন্যাসকে কোনও নির্দিষ্ট গোত্রে ঠেলে দিতে চাননি সন্দীপন। ২০০২-এ আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘আমি ও বনবিহারী’ উপন্যাসের শুরুতেই লিখে দিয়েছিলেন সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের এই বাণী, ‘আমি যতই বিশ্লেষণ করি না কেন, দেখি, সবার শেষে এক কবি বসে আছে।’ সন্দীপন উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে; সঙ্গে এ-ও লিখে দিয়েছিলেন, “১৯৬৭ থেকে ১৯৯৭—বামপন্থী রাজনীতির এই ঐতিহাসিক সময়টা বেছে নিলেও (এবং তার ব্যবহার যথাসাধ্য তথ্যনিষ্ঠভাবে করা সত্ত্বেও)—এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। … এই ক্ষুদ্রকায় উপন্যাস লেখা হয় কেবলমাত্র একটি সমস্যার সমাধানের কথা ভেবে আর সেটা হল, একটা গদ্য-রচনা করা যায় কিনা যা হবে কবিতার মুখপাত্র। বিষয়ে এবং আঙ্গিকে—উভয়ত।”
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষার সেই লেখক, মৃদু গালিগালাজ করলেও বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখকরা যাঁকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। ১৯৮৯ সালের ২৫ মার্চ দেশ পত্রিকার ‘উপন্যাসের অরণ্যে’ শীর্ষক লেখায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-এর একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া তার উদাহরণ। (নিচের ছবিতে দ্রষ্টব্য)
সূত্রঃ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ফেসবুক পেজ (https://www.facebook.com/sandipan.chattopadhay.18)
অধ্যাপক-সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘মৃত্যুর নিপুন শিল্প’ শীর্ষক লেখায় বলেছেন, “…এমনকী সন্দীপন যখন স্বপ্নে প্রবেশ করেন তখনও সে স্বপ্নের কোনও ওষ্ঠ নেই, উচ্চারণ নেই। এই সূত্রে আমরা যদি সন্দীপনকে ধারাভাষ্যকার হিসেবে চিহ্নিতও করি, তথাপি তিনি আমাদের সাহিত্যের পক্ষে অগ্রণীপুরুষ।”
রক্ষণশীল বাংলা সাহিত্যের দারোয়ানদের তৎপরতায় নির্দিষ্ট পাঠককূল এবং লেখকদের লেখক হয়ে থেকে গেছেন সন্দীপন। এরকম যে ঘটবে তা ভেবে তিনি লেখালিখি করেননি, শুধুমাত্র মারণ অসুখে রক্তবমি করতে করতে আয়না ধরতে চেয়েছিলেন। সুনীল–শক্তি–শঙ্খ–জয় উঠে আসেন যখন একুশে প্রজন্মের মুখে মুখে, বুঝতে অসুবিধা হয় না এঁরা সন্দীপনের থেকে সমাজে-সাহিত্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।“আমি প্রায় সবকিছুকেই মিথ্যে ও ভুল বলে ধরে নিয়েছি। সবচেয়ে বড় ভুল ও বেশী সন্দেহজনক মনে করেছি আমার আন্তরিকতাকে। কোনো ভোর ভালো লাগলে, কোথাও বা গড়ের পিছনে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হলে কোনোদিন, কাঁধে হাত রেখেছি নিজের, ‘সত্যি তো, নাকি বই পড়ে শিখেছ?’ জানতে চেয়েছি, ‘বা, এইরকম প্রচলিত বলে ভালো লাগছে’।” সন্দীপন তাঁর একটি বইয়ের ব্লার্ব-এ (প্রচার/পরিচয়লিপি) একথাগুলোই লিখেছিলেন। বলা যায়, এই ব্লার্ব-এর মধ্যে দিয়েই ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। এরকম অকপট পরিচয়লিপি আমার মতো পাঠকের প্রত্যাশা। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, তাঁর চেতনা থেকে শিরা, শিরা থেকে বৃদ্ধাঙ্গুলি-তর্জনী-মধ্যমা-অনামিকা-কনিষ্ঠায় – ডান হাতের পাঞ্জার ছাপ দিয়ে রেখে গেছেন নিজের বলা কথায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক তাঁকে কতটা চিনলো?
‘লাভ ইন দ্য ডেজ অফ কলেরা’, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের বিশ্বখ্যাত এই উপন্যাসের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সন্দীপন তাঁর উপন্যাসের নাম রেখেছিলেন ‘কলেরার দিনগুলিতে প্রেম’ অথবা সুনীল গাঙ্গুলির ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ থেকে ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন-

‘টেলিফোন’ নামে একটি গল্পে সন্দীপন লিখেছিলেন,
“আজ ভোরের স্বপ্নটা যেমন। প্রথমে ছিল একটা নিরীহ পিঁপড়ে। ওই ফুর্ফুরে কালো পিঁপড়েগুলোর একটা। টয়লেটের ছায়াচ্ছন্ন দেওয়ালে উদ্বিগ্নভাবে ঘোরাঘুরি করছে। কমোডে বসে আমি নিরুপায়ভাবে লক্ষ্যও করছিলাম তাকে। কারণ, আর কী বা করব! গৃহীনির বায়ুগ্রস্ততাবশত বইটই দুরস্থান, পুরনো খবরের কাগজও টয়লেটে আনতে পাই না। আহা — পিঁপড়েটির উদ্বিগ্নতা, স্বপ্নের বোধ আমাকে প্রথমে জানাল, সে দলছুট একা বলেই। ক্রমে দেখা দিল তার মুখে একটি মৃত পিঁপড়ে। ও সে তাহলে শ্মশান খুঁজছে! তখন আমি পিঁপড়েটাকে তুলে সেই দেওয়ালের সেই গর্তের সামনে রাখতে গেলাম, যেখান থেকে হাজার হাজার বাস্তুত্যাগী পিঁপড়ে বেরিয়ে গেছে (সে সেটাই খুঁজছে)। ঠিক এই সময় আমার কাছে এবারের গল্পটি দেখা দিল। যখন মৃত পিঁপড়েটি তার মুখ থেকে আমারই অপরিণামদর্শিতার কারণে, ঝরে পড়ে গেল। স্বপ্নে শোনা গেল জলস্থল-অন্তরীক্ষ জুড়ে এক হাহাকার, যখন তার মুখ থেকে মৃতের শব ঝরে পড়ে গেল।…ক্রমে সেই শব্দই রূপবদল করল টেলিফোনের শব্দে।”
চিত্রগ্রাহক সন্দীপ কুমারের লেন্সে সন্দীপন
‘ঊনষাট’ অ্যালবামের ‘জোন অফ আর্ক’ গানটিতে অঞ্জন দত্ত লিখেছেন “এর বেশি কিছুই আর রেখে যেতে পারছি না/ কুড়িয়ে বাড়িয়ে আমার আজীবন।/ যদি পারো চিনে নিও আমার ববি ডেলনকে/ আর হয়তো একটা দুটো সন্দীপন”। নামের খ্যাতিতে অনেকসময়ই লেখকের মূল বিষয়-ভাবনা ধামা চাপা পড়ে যায়। সন্দীপনের লেখা অনেকের কাছেই কালো, জনপ্রিয় সাহিত্যচর্চার আওতায় পড়ে না। তবে প্রকৃত সাহিত্যিক, সাহিত্যানুরাগী, সিরিয়াস পাঠকদের কাছে বাংলা সাহিত্যচেতনায় প্রবল ঝাঁকুনির আরেক নাম সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। কারণ, মৃত্যুর ভয়ে আতঙ্কিত জলের বূহ্যবন্দি পিঁপড়ের আর্তচিৎকার শুনতে পান না অনেকেই, সন্দীপন পেতেন। অবিনশ্বর বন্ধুতা যাপনের জন্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে যিনি অযৌন হানিমুনে গিয়েছিলেন। ডায়েরি লিখে ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ হয়েছেন। তবে, বিতর্কের সঙ্গে তিনি পাঠকের জন্য যা রেখে গেছেন, তা হল সাহিত্য – তাঁর পুরো জীবন।
সন্দীপনের “জঙ্গলের দিনরাত্রি”-তে পড়েছিলাম, এলিয়টের মৃত্যুর পর প্রকাশিত এক বিশাল কমমেমোরিয়াল ভলিউমে সবাই নাকি দিস্তে দিস্তে লিখেছিল, শুধু এজরা পাউন্ড লিখেছিলেন পাঁচ লাইন। কে আর লন্ডনের অলি-গলি দিয়ে হাঁটার সময় অমন শুখা হিউমার করবে! আর ওর কবিতা নিয়ে কী আবার বলব। শুধু বলতে পারি: রিড হিম।
পাঠকদের উদ্দেশ্যে আমিও বলতে চাই, সন্দীপনকে বুঝতে হলে, তাঁর লেখা পড়ুন। রিড হিম।
