গ্রহকে গিলে নিচ্ছে নক্ষত্র! বাঙালি গবেষকের চোখে ধরা পড়লো অত্যাশ্চর্য দৃশ্য

বাঙালি গবেষক কিশলয় দে-র যুগান্তকারী আবিষ্কার

“বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা।/ বাজে অসীম নভোমাঝে অনাদি রব/ জাগে, অগণ্য রবিচন্দ্রতারা।” — 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হস্যময় মহাবিশ্ব। অনন্ত আঁধারজুড়ে রূপকথার মতো ঘুরে বেড়ায় নক্ষত্র, গ্রহ, গ্রহাণু, উপগ্রহ, ধূমকেতু, আরও অসংখ্য জানা-অজানা বস্তু। সেই রহস্যের পর্দা সরিয়ে মানুষ বারবার জানতে চেয়েছে, বুঝতে চেয়েছে এই ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’-কে। তার প্রশ্ন কখনও কাব্যিক, কখনও দার্শনিক, কখনও বা বৈজ্ঞানিক। আমাদের পূর্বপুরুষেরা অসীম অজানার দিকে তাকিয়ে দেখতো, যেসব নাম না জানা গ্রহের গতিপথ, নাছোড়বান্দা খোঁজের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আজ আমরা তার নাম রেখেছি প্ল্যানেট, যা পরিব্রাজকের (Wanderer)-এর গ্রীক নাম। আমেরিকান মহাকাশবিজ্ঞানী কার্ল সাগান (Carl Sagan)-এর কথা ধার করে বলা যায়, “We have wandered among the wanderers… we are surrounded by a new world ocean, the depth of space… we are now in the knee deep water, and the shores seem to be enlightening”। সেই খোঁজ চলছে। শুক্রগ্রহের অবস্থানের গণনা করা প্রাচীন ইনকাদের হাত থেকে ব্যাটন নিয়ে, কেপলার, কোপারনিকাস হয়ে সে দৌড় চলেছে আজও। আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন গ্যালাক্সি, ব্ল্যাকহোল, নেবুলা, বাইনারি স্টার, সুপারনোভা। সেই পথে হেঁটে আরও এক অত্যাশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী হলেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (MIT) গবেষক কিশলয় দে আর তাঁর দল। বাঙালি বিজ্ঞানী কিশলয় দে (Bengali Scientist Kishalay De)-রা পর্যবেক্ষণ করেছেন স্টেলার মার্জারের (Stellar Merger) মতন একটি ঘটনা। এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী কিশলয় দে

বাঙালি গবেষক কিশলয় দে (Bengali Researcher Kishalay De)-র সঙ্গে এই বিষয়েই কথা বললো বঙ্গদর্শন.কম। তিনি জানালেন, “পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে বসানো বিভিন্ন টেলিস্কোপের মাধ্যমে আমরা ভ্যারিয়েবল স্টার (Variable Star) পর্যবেক্ষণ করি এবং তার পিছনের বিজ্ঞানকে বোঝার চেষ্টা করি। এই টেলিস্কোপগুলির কোনওটা আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, কোনওটা হাওয়াইতে, চিলিতে, কোনওটা আবার মহাকাশে।” তাঁর কথা অনুযায়ী বলা যায়, এমন অনেকরকমের নক্ষত্র আছে, যারা নিজেদের ঔজ্জ্বল্য পাল্টায়। এক এক সময়ে তাদের ঔজ্জ্বল্য এক এক রকমের হয়, কখনও বাড়ে, কখনও কমে। এই ঘটনা কোনও ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক হয়, কখনও হয় না। এই ঘটনার কারণও আলাদা আলাদা। কিছু নক্ষত্রের আকার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে-কমে। কারণ তাদের শরীরে কিছু তরঙ্গ প্রবাহের ঘটনা ঘটার জন্যা ঐ নক্ষত্রের স্তরগুলি স্থিতিশীল থাকে না। আবার বাইনারি স্টারের ক্ষেত্রে (যেক্ষেত্রে দুটি নক্ষত্র কাছাকাছি অবস্থানে থাকে), একটি নক্ষত্রের আলোকে অন্য নক্ষত্র মাঝেমধ্যে খানিকটা আটকে দেয়, ফলে সেই আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছায় না। তখন আমরা প্রথম তারাটিকে কম উজ্জ্বল দেখি। এছাড়াও অন্য অনেক কারণও আছে।

অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কিশলয় দে (Astrophysicist Kishalay De) এবং তাঁর টিম এমন কিছু নক্ষত্রকেই পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর জবানিতেই ঘটনাটা বলা যাক। “২০২০ সাল নাগাদ আমরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই (Milky Way Galaxy) এমন একটি নক্ষত্র খুঁজে পাই যার উজ্জ্বলতা অবিশ্বাস্যরকম ভাবে পাল্টাচ্ছে। সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ১০০ গুণ ঔজ্জ্বল্য বেড়ে আবার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা সাধারণত দেখা যায় না।” তাঁরা এই ঘটনার পিছনের কারণ খুঁজতে শুরু করেন। কাজে লাগান হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত কেপ টেলিস্কোপকে। তার মাধ্যমে সেই নক্ষত্র থেকে আসা আলোর স্পেকট্রাম (Spectrum) বিশ্লেষণ করে নক্ষত্র ও তার আশেপাশে কী ধরনের পদার্থ আছে তা খুঁজতে শুরু করেন। প্রসঙ্গত, স্পেকট্রাম বিশ্লেষণকে সহজ ভাষায় এভাবে বলা যায় যে, আলাদা আলাদা পদার্থ আলাদা আলাদা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ এবং নিঃসরণ করে। ফলে একটি নির্দিষ্ট পদার্থের ক্ষেত্রে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট হয়। ফলে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও অন্যান্য ধর্ম বিশ্লেষণ করে বোঝা যায় পদার্থটি আসলে কী। এই স্পেকট্রাম বিশ্লেষণ করে কিশলয়বাবুরা দেখেন যে, নক্ষত্রটির আশেপাশে ঠান্ডা গ্যাসজাতীয় পদার্থ আছে। “ঠান্ডা বললে আমরা যেমন তাপমাত্রার কথা ভাবি, এই ঠান্ডা কিন্তু তেমন নয় মোটেই। এই গ্যাসীয় পদার্থের তাপমাত্রা মোটামুটি ২০০০-৩০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু সেটা নক্ষত্রের তাপমাত্রার থেকে অনেকটাই কম, কারণ যে নক্ষত্রটিকে আমরা পর্যবেক্ষণ করছিলাম, তার আকার অনুযায়ী তাপমাত্রা হবে মোটামুটি ৫০০০-৬০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাই গ্যাসীয় পদার্থটিকে ঠান্ডা বলছি”, জানালেন তিনি। কিন্তু গ্যাসটি যে ঠান্ডা তা বোঝা গেলো কীভাবে? কিশলয়বাবু জানান, তাঁরা স্পেকট্রামের মধ্যে কিছু অণুর শোষণ বৈশিষ্ট্য (Molecular Absorption Features) পেয়েছেন, অর্থাৎ তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে গ্যাসটির মধ্যে কিছু অণু রয়েছে। আমরা জানি যে একাধিক পরমাণু মিলে একটি অণু তৈরি হয়, আর একটি পরমাণু তৈরি হয় ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন দ্বারা। এরা সবাই নিউক্লিয়ার শক্তির (Nuclear Force) মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু এদের সবারই গতিশক্তি আছে। তাপমাত্রা বাড়লে সেই গতিশক্তি বাড়ে। একসময় গতিশক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে তা নিউক্লিয়ার শক্তির আকর্ষণ বলকে অতিক্রম করে। ফলে অণু-পরমাণুগুলি ভেঙে যায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে Dissociation Force। কাজেই কোনও নমুনাতে অণু রয়েছে মানে বুঝতে হবে নমুনাটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা। 

কিশলয়রা তখন নক্ষত্রটিকে ইনফ্রারেড আলোতে দেখতে শুরু করেন, কারণ মহাজাগতিক এইসব বস্তুকে ইনফ্রারেড আলোতে আরও পরিস্কার ভাবে দেখা যায়। এর জন্যে তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি টেলিস্কোপ এবং নাসার ভাইস টেলিস্কোপ। মহাজাগতিক বস্তুগুলি বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো নিঃসরণ করে। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, যে বস্তু যত বেশি গরম, সে তত বেশি অতিবেগুনি রশ্মি নিঃসরণ করে এবং যে যত বেশি গরম, সে তত বেশি ইনফ্রারেড রশ্মি নির্গত করে। টেলিস্কোপগুলিতে লাগানো ছিলো ইনফ্রারেড অ্যাবসর্পশন সেন্সর (Infrared Absorption Sensor), যার মাধ্যামে নক্ষত্রের চারপাশের গ্যাসীয় পদার্থটি থেকে ইনফ্রারেড আলোর নমুনা সংগ্রহ করে চলতে থাকে বিশ্লেষণ। 

বাইনারি স্টার সিস্টেম

অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কিশলয় দে (Astrophysicist Kishalay De) এবং তাঁর টিম এমন কিছু নক্ষত্রকেই পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর জবানিতেই ঘটনাটা বলা যাক। “২০২০ সাল নাগাদ আমরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই (Milky Way Galaxy) এমন একটি নক্ষত্র খুঁজে পাই যার উজ্জ্বলতা অবিশ্বাস্যরকম ভাবে পাল্টাচ্ছে। সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ১০০ গুণ ঔজ্জ্বল্য বেড়ে আবার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা সাধারণত দেখা যায় না।” তাঁরা এই ঘটনার পিছনের কারণ খুঁজতে শুরু করেন। কাজে লাগান হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত কেপ টেলিস্কোপকে। তার মাধ্যমে সেই নক্ষত্র থেকে আসা আলোর স্পেকট্রাম (Spectrum) বিশ্লেষণ করে নক্ষত্র ও তার আশেপাশে কী ধরনের পদার্থ আছে তা খুঁজতে শুরু করেন।

এই পর্যবেক্ষণটি (একটি তারার উজ্জ্বলতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এবং তার চারপাশে ঠান্ডা গ্যাস তৈরি হওয়া) একটি বিশেষ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে, যাকে বলে স্টেলার মার্জার (Steller Merger)। কিন্তু কী এই স্টেলার মার্জার? যখন দুটি নক্ষত্র বাইনারি সিস্টেমে থাকে, তখন কখনও কখনও একটি নক্ষত্র ফুলে-ফেঁপে উঠে অন্য নক্ষত্রটিকে গিলে ফেলে। তারার মৃত্যু (Death of Star) ঘটে। কিশলয়রাও প্রথমে ভেবেছিলেন এই ঘটনাও বুঝি তেমনই। কিন্তু পরে তাঁরা দেখেন এই বিশেষ নক্ষত্রটির ক্ষেত্রে ঔজ্জ্বল্য বাড়লেও তা সাধারণ স্টেলার মার্জারের থেকে প্রায় ১০০০ গুণ কম। তা থেকে কিশলয়রা বুঝতে পারেন, এক্ষেত্রে দুটি নক্ষত্র পাশাপাশি নেই, বরং নক্ষত্রটি তার পাশের একটি গ্রহকে গিলে নিচ্ছে, তাই উজ্জ্বলতার এই তারতম্য।

 

তিনি জানান, নক্ষত্রটি রয়েছে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের আকিলা নক্ষত্রপুঞ্জে। দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় ১২ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। নক্ষত্রটির আকার প্রায় সূর্যের মতন। কাজেই ঔজ্জ্বল্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, গ্রহটির আকার প্রায় বৃহস্পতি গ্রহের মতন। তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটবে। আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর পরে, সূর্যের জ্বালানি যখন শেষ হয়ে যাবে, সূর্যও তার কাছাকাছি থাকা বুধ, শুক্র আর পৃথিবীকে গিলে খাবে এভাবেই। কার্ল সাগানের অমর উক্তি “Telescopes are time machines”-কে সত্যি করেই যেন কিশলয় দে এবং তাঁর গবেষক টিমের অন্য সদস্যরা টেলিস্কোপ দিয়ে দেখে নিলেন শেষের দিনটিকে। 

স্টেলার মার্জার

কিশলয়ের শেষ কথাটা শুনে মনে পড়ে যায় আরেকটি ঘটনার কথা। ১৯৭৭ সালে কার্ল সাগানের তত্ত্বাবধানে নাসার স্পেস স্টেশন থেকে উৎক্ষেপিত হয়েছিলো দুটি রকেট- ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২। তাদের মধ্যে রেকর্ড করে রাখা রয়েছে পৃথিবীর যা কিছু শুভ- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীত (বাখ, বেটোফেন, মোৎসার্ট হয়ে ভারতের কেশরিবাই কেরকরের গাওয়া ‘জাতা কঁহা হো’), বিভিন্ন অঙ্কের ফর্মূলা, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, গর্বের স্থাপত্যের, শিল্পের ছবি, পশুপাখির ছবি, মা শিশুকে খাওয়াচ্ছেন সেই ছবি, রহস্যময়ী মহাজগতের অজানা, অচেনা প্রাণীদের প্রতি ৫৯টি ভাষায় অভিনন্দন বার্তা, ‘নমস্কার, বিশ্বের শান্তি হোক’ থেকে ‘Hello, from the children of planet Earth’। তারা এখন সৌরজগত ছাড়িয়ে মহাকাশের মহাসমুদ্রে বয়ে চলেছে। সাগান ‘Pale Blue Dot’ শীর্ষক তথ্যচিত্রে বলেছিলেন, পৃথিবীর ধ্বংস হওয়ার সময়ের কথা। তিনি জানিয়েছিলেন, সূর্য যখন পৃথিবীকে গিলে নেবে, তখন পৃথিবীর চিহ্নে ভরা ভয়েজার স্পেসশিপ এমনই ভাসতে থাকবে অনির্দিষ্টের উদ্দেশ্যে। বিজ্ঞানীর অমোঘ স্বর ঘোষণা করেছিলো, “And far from home, untouched by this remote events, the Voyagers, bearing the memories of a world that is no more, will fly on”। কিশলয়বাবুর শেষ কথা শুনে এবং এই ঘটনার কথা মনে করে একইসঙ্গে জাগে ভয় আর বিস্ময়।

Developed by DXDasia