অয়ন এবং সৌম্যদীপ – ভুটানের পারো বিমানবন্দর নকশার দায়িত্ব পেলেন দুই বাঙালি স্থপতি

পারোকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে বিবেচনা করা হয়

য়ন রায় (Ayan Roy) এবং সৌম্যদীপ দাস (Soumyadeep Das), বাংলার (west Bengal’s) এই দুই তরুণ স্থপতির নাম আগে কখনও শুনেছেন? এঁরা দুজনেই কিন্তু বাংলার গর্ব। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার সল্টলেক সেক্টর V-এ তথ্যপ্রযুক্তি (IT) হাবের জন্যে একটি ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের প্রবেশদ্বার নকশার দায়িত্ব দিয়েছেন এঁদেরকে। প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে দেশের শিল্পাঙ্গন। নেপথ্যে অয়ন এবং সৌম্যদীপের মতো তরুণরাই। সারা দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই রাজ্যেও বাড়ছে স্টার্ট-আপ। এই তালিকায় ইতিমধ্যেই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে অয়ন এবং সৌম্যদীপের স্থাপত্য সংস্থা ভিব্রিজ (VBRIDGE)। দুই স্থপতিই শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি (Indian Institute of Engineering Science and Technology)-র প্রাক্তনী এবং ভিব্রিজ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ২০২০ সালে জৌগ্রামে মডেল ভিলেজ ডিজাইন করা হোক বা কোন্নগরে কোভিড স্ট্রিট আর্ট, নিউ টাউন থেকে সারাদেশের কোভিড হাসপাতালে থ্রিডি ইলিউশন আর্ট গার্ড রেল, নিজেদের উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলির জন্য খবরের শিরোনামে উঠে এসছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এবার আরও একটি ঐতিহাসিক কাজের সঙ্গে নিজেদের নাম যুক্ত করতে চলেছে ভিব্রিজ। অয়ন এবং সৌম্যদীপের তত্ত্বাবধানে সেজে উঠতে চলেছে ভুটানের পারো বিমানবন্দর (Paro airport, Bhutan)।

অয়নের স্কুল ছিল বেলুড় বয়েজ হাই স্কুল এবং এইচএম (Hind Motor) এডুকেশন সেন্টার। সৌম্যদীপের স্কুল মাহেশের শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয় (উচ্চ মাধ্যমিক)। স্কুলের পর, দুজনেই শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি (IIEST) থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক হন। বরাবরই ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলেন দুই তরুণ স্থপতি এবং দুজনেই নিজেদের উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০১৬ সালে CII-IGBC (Indian Green Building Council) ডিজাইন প্রতিযোগীতায় জাতীয় স্তরে প্রথম স্থানাধিকারী ছিলেন সৌম্যদীপ। এছাড়াও ২০১৭ সালে আর্কিটেকচারাল থিসিস (NAET)-এর জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। অয়ন এবং সৌম্যদীপ দুজনেরই চাকরিতে অনীহা ছিল। শুরু থেকেই ভেবে রেখেছিলেন নিজেদের কিছু করতে হবে।

২০১৯-তে আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে ভিব্রিজ। অবশ্য এর শুরুটা হয়েছিল অনেক আগে, যখন তাঁরা IIEST-তে আর্কিটেকচার পড়ছিলেন। ভিব্রিজ নামটি তাঁরা পেয়েছিলেন ‘We BRIDGE the gap’ থেকে, প্রথমে যা ছিল ‘WeBRIDGE’ এবং অবশেষে ঠিক হয় ‘VBRIDGE’। সরকারি সংস্থা সহ বহু অলাভজনক সংস্থার সঙ্গেও কাজ করছে এবং উদ্ভাবনী নকশা বাস্তবায়ন করছে এই প্রতিষ্ঠান।

১২ সেপ্টেম্বর ‘ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিয়ারিং ডে’-তে ভিব্রিজ ‘ভাইভ্যাস’ (VIVACE, VBRIDGE’s Integrated Vision, Architecture, Conclave and Exhibition) শিরোনামের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে, যেখানে বাংলা এবং সারা ভারতের স্থাপত্যের ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপস্থিত ছিলেন শিল্পপতি, শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা। ভুটানের পারো বিমানবন্দর ডিজাইনের কাজ এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভের প্রবেশপথে আইকনিক গেট ডিজাইনের কাজ পাওয়ার খবরটিও এইদিন ঘোষণা করেন তরুণ স্থপতিদ্বয়। আন্তর্জাতিক প্রকল্প হিসেবে পারো বিমানবন্দরের ডিজাইনের কাজটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছে ভিব্রিজ।

নিজেদের সর্বশেষ কৃতিত্ব সম্পর্কে ভিব্রিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অয়ন রায় বলেন, “ভিব্রিজ আমাদের স্বপ্ন। যা আর্কিটেকচার, ডিজাইন এবং ইঞ্জিনিয়ারিংকে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা জাতীয় এবং বিশ্বজনীন, উভয় ধারণাই অনুসরণ করছি।”

ভিব্রিজের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌম্যদীপ দাস বলেন, “ভবিষ্যতে প্রতিটা অ্যাসাইনমেন্টে গবেষণা এবং উন্নয়নের উপর আরও নজর দেবে ভিব্রিজ। সেটা নির্মাণ ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি হোক বা সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প। পাশাপাশি ব্যবসার বিস্তারের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে”।

৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের আইকনিক প্রবেশদ্বারটির কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে বলে জানান যাচ্ছে। স্থপতিরা একটি স্কাইওয়াকের ধারণার ভিত্তিতে গেটটির নকশা করেছেন। অন্যদিকে, ভুটানের পারো বিমানবন্দরের কাজটি অর্জন করা খুব একটা সহজ ছিল না। পারোকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিমানবন্দরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১.৫ মাইল উপরে এবং ১৮০০০ ফুট তীক্ষ্ণ চূড়া দ্বারা বেষ্টিত। ভূখণ্ডটি এতটাই বিপজ্জনক যে সমগ্র বিশ্বের মাত্র আটজন পাইলট সেখানে অবতরণ করার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং, ভুটান সরকার সবচেয়ে দক্ষ স্থাপত্য সংস্থাকে এই কাজে নিয়োগের জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। অয়ন এবং সৌম্যদীপের তার আগে শুধুমাত্র একটি স্থানীয় ফার্মের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল এবং সেটাই ছিল তাঁদের একমাত্র সম্বল। ভিব্রিজের প্রোফাইল এবং আগের প্রকল্পগুলি বিবেচনা করে সন্তুষ্ট হয় ভুটান সরকার। আগামী বছরের শুরু থেকে কাজ শুরু হবে পারো বিমানবন্দরে। এই দুই স্থপতি তরুণের কাছে স্থাপত্যের সংজ্ঞাটা ঠিক কী? তাঁদের দুজনের মতেই, “স্থাপত্য হল আধ্যাত্মিক, ব্যক্তিগত, স্বজ্ঞাত এবং অন্তহীন। মহাবিশ্বের সৃষ্টিও একটি স্থাপত্য। এটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমস্ত দিক থেকে উপযুক্ত একটি স্থান তৈরি করাই প্রকৃত স্থাপত্য।”

ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এখানে করুন।

Developed by DXDasia