আরও একবার জাতীয় স্তরের শিল্পচর্চায় উঠে এল বাংলার নাম
বাংলার প্রাচীনতম আঙ্গিকগুলির মধ্যে অন্যতম হল শঙ্খ শিল্প। আর এই শিল্প জগতে অন্যতম নাম হাটগ্রাম। বাঁকুড়া জেলার ইন্দপুর ব্লকের অখ্যাত এই গ্রামটি আজ শঙ্খ শিল্পের হাত ধরে গোটা দেশের নজর কেড়েছে। শুধুমাত্র শাঁখা নয়, শঙ্খ দিয়ে যে কত রকমের হস্ত শিল্প বা ঘর সাজাবার জিনিষ তৈরি করা যায় তা এখানে না এলে বোঝা যাবে না। বাজাবার শঙ্খ তো রয়েছেই, তাছাড়া ধুপদানি, কাজলদানি, চুলের ক্লিপ, গলার হার ও শঙ্খ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শোপিস তৈরি করেন এখানকার শঙ্খ শিল্পীরা। গোটা রাজ্যের বেশিরভাগ শাঁখা ও শঙ্খজাত পণ্যের অধিকাংশের যোগান যায় এই হাটগ্রাম থেকেই। আর সবচেয়ে যে বিষয়টা উল্লেখ না করলেই নয় এই হাটগ্রামে এমন কয়েকজন শঙ্খ শিল্পী রয়েছেন যারা শঙ্খের উপর সূক্ষ্ম কারুকার্য করে হিন্দু পুরানের নানান দেবদেবী ও রামায়ণ-মহভারতের নানান আখ্যান ফুটয়ে তুলেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। আর এই কাজের জন্য অনেকেই জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আর গোটা দেশ জুড়ে জনপ্রিয়তা বেড়েছে হাটগ্রামের।
সম্প্রতি এই বিস্ময়কর কারুকার্য সম্বলিত শঙ্খের দৌলতেই বাঁকুড়ার মুকুটে জুড়ল আরও একটি জাতীয় পুরস্কারের পালক। নেপথ্যে শঙ্খশিল্পী বাবলু নন্দী। তাঁর সৌজন্যে আরও একবার জাতীয় স্তরের শিল্পচর্চায় উঠে এল বাংলার নাম।
আয়তনে বড়োজোর এগারো ইঞ্চি। তবে সে শাঁখের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখলে বিস্ময় জন্মাতে বাধ্য যে কারোর মনে। কারণ, ওইটুকু শঙ্খের ওপরেই যেন ফুটে উঠেছে মহাভারতের আস্ত এক অধ্যায়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। কী নেই সেখানে? কৃষ্ণ-অর্জুনের রথযাত্রা, কর্ণের রথের চাকার মেদিনীগ্রাস থেকে শুরু করে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন, অশ্বত্থামা বধ, ভীম-দুর্যোধনের গদাযুদ্ধ— সবকিছুই নিপুণ দক্ষতায় খোদাই করেছেন শিল্পী।
বাঁকুড়ার ইন্দপুর ব্লকের হাটগ্রামের বাসিন্দা বাবলু নন্দীর পূর্বপুরুষরাও জড়িত ছিলেন শঙ্খ শিল্পের সঙ্গে। তবে সরাসরি শাঁখের ওপর নকশা নয়, বরং শাঁখা তৈরির কাজ করতেন তাঁরা। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের থেকেই অল্পবিস্তর সেই শিল্পকলা, কারুকাজ শিখেছিলেন তিনি। পরে পুরুলিয়ার মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করার পর পরিবারের সেই শিল্পকেই জীবিকা হিসাবে বেছে নেন। তবে শাঁখার ব্যবসায় পা দেননি বাবলু নন্দী। বরং, আস্ত শাঁখের ওপরেই শিল্পকলা ফুটিয়ে তুলতে উদ্যোগী হন। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত শঙ্খ খোদাই শিল্পী সুবোধ দত্তের থেকে তালিম নেন শঙ্খশিল্পের।
আরও পড়ুন: বোঙা হাতি-ঘোড়ার দেশ—পাঁচমুড়া থেকে ফিরে
তবে বাঁকুড়ার অন্য শঙ্খশিল্পীদের থেকে তাঁর খোদাইয়ের কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর কাজ যেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। মূলত পৌরাণিক বিভিন্ন কাহিনিকেই শাঁখের ওপর নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন বাবলু। এর আগে একাধিক রাজ্যস্তরের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তাছাড়াও বাংলার একাধিক শিল্প প্রদর্শনীতেও জায়গা পেয়েছে তাঁর হাতের কাজ। ২০১৯ সালে একটি মাত্র শঙ্খের ওপরে আলাদা আলাদা প্যানেল তৈরি করে কুরুক্ষেত্রের সম্পূর্ণ ছবি ফুটিয়ে তোলেন তিনি। তবে বিক্রি না করে, আগ্রহের বশেই সেই শাঁখ কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রকে পাঠিয়েছিলেন। সম্প্রতি, অবসান হয় সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার! তাঁর এই কৃতিত্বে উচ্ছ্বসিত বাঁকুড়ার গোটা শিল্পীমহল।