করোনায় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় মিলছে সাড়া, জানাচ্ছেন শিলিগুড়ি সরকারি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক

রাজ্যজুড়ে রোগীদের অনলাইনেও পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি

করোনা নিয়ে এখন চারদিকে চিন্তা। এই সময় দ্বিতীয় ঢেউয়ের জেরে সর্বত্র করোনা বাড়ছে। মানুষ বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষ কিন্তু আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের কাছেও যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়া ব্লকের লিউসিপাখরি সরকারি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় সাড়া পাচ্ছেন কোডিভ-আক্রান্তরা। 

শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়া ব্লকের লিউসিপাখরি সরকারি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ সৌম্যদীপ কর জানাচ্ছেন, করোনার প্রথম ঢেউ শুরু হওয়ার পর বিগত এক বছরে করোনার উপসর্গ নিয়ে তাঁর কাছে ৩০ জন রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। চিকিৎসা শুরু হওয়ার সময় করোনা ‘পজিটিভ’ থাকলেও পরে করোনা ‘নেগেটিভ’ হয়েছেন। তবে সবাই তাঁর কাছে অনলাইন চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে কলকাতার বাসিন্দারাও রয়েছেন। কলকাতার ভবানীপুরে একটি পরিবারের সাত জনের করোনা উপসর্গ ছিল। এরমধ্যে বয়স্করাও ছিলেন। তাঁরা সকলেই এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। 

বিগত একবছর ধরে সরকারি সেই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বহু রোগীর চিকিৎসা করেছেন ডাঃ কর। এর মধ্যে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা অনেক রোগীও ছিলেন। ফলে বেশ কয়েকবার তাঁকে করোনার পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু সবসময়ই তাঁর রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। এর পিছনে রহস্য কি, তারই আশপাশে বহু চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী যখন করোনায় আক্রান্ত হন তখন তিনি কেন বারবার নেগেটিভ ছিলেন বা এখনো আছেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সেটা আমি জানি না। তবে আমি করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে রোজ সকালে বিশেষ ধরনের চা পান শুরু করেছি। ঈষদুষ্ণ হাফ কাপ গরম জলে পাঁচ গ্রাম সুকনো আদার গুঁড়ো এবং ২৫০ মিলিগ্রাম ধনের গুঁড়ো মিশিয়ে পান করছি। এটা বেশ ভাইরাস বিরোধী পরিবেশ তৈরি করে শরীরের ভিতরে।” 

এর বাইরে তাঁর পরামর্শ, সকালে চবনপ্রাশ খাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া অশ্বগন্ধা, গুলঞ্চ, দারচিনি, যষ্টিমধু প্রভৃতির ট্যাবলেট গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে সবটাই গ্রহণ করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে, না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যদিও মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদি যেসব করোনা বিধি রয়েছে সবটাই মেনে চলতে হবে।

পশ্চিম মেদিনীপুর অধুনা ঝাড়গ্রামে জন্ম এই চিকিৎসকের। ছোট থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার প্রতি। তাঁর চতুর্দশ পুরুষ ছিলেন মাধব কর। আয়ুর্বেদ চিকিৎসক মহলে ‘মাধব নিদান’ বলে কিছু কথাও প্রচলিত রয়েছে। কলকাতার জেবিরায় স্টেট আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে তিনি প্রথমে পাশ করেন। তারপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ফেলোশিপ করেন এনোরেকটাল সার্জারির ওপর। পরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন হসপিটাল ম্যানেজমেন্টের ওপর। ২০০৭ সালে ফাঁসিদেওয়ার ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরকারি আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজে যোগ দেন। বিভিন্ন রকম ব্যথা কমানোর ওপর তিনি বিশেষ ভাবে কাজ করছেন। উত্তরবঙ্গের দূরদূরান্ত গ্রামের অনেক মানুষ তাঁর কাছে পাইলস প্রভৃতির চিকিৎসার জন্য আসছে এবং এই ধরনের চিকিৎসায় তিনি অপারেশনও করেন। এ ছাড়া হাঁটুর ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথার চিকিৎসা করিয়েও অনেকে সুস্থ হয়েছেন। গরিব মানুষদের কথা চিন্তা করে তিনি মাত্র ৫০ টাকায় বিভিন্ন গ্রামে শিবির করছেন শুধু শরীরের বিভিন্ন ব্যথা কমাতে।

একসময় শিলিগুড়িতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিনির হেল্থ কেয়ার প্রকল্পেও চিকিৎসক হিসেবে সেবামূলক কাজ করেছেন। তিনি বলেন, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ভারতের একটি শাশ্বত চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি একটি বিরাট বিজ্ঞান। কাজেই এই চিকিৎসাকে অবহেলা করা যাবে না। অতীত ভারতে যখন এলোপ্যাথির এত রমরমা হয়নি তখন কিন্তু আয়ুর্বেদিকই ছিল ভরসা। আর অতীতেও অনেক মহামারী হয়েছে। সেই সময় কিন্তু মহামারী থেকে পরিত্রাণ পেতে আয়ুর্বেদিক ছিল বিরাট ভরসার স্থল। করোনার উপসর্গ নিয়ে অনেকেই অন্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে না গিয়ে তাঁর কাছে এসেছেন এবং তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে গিয়েছেন, এটাই তাঁর কাছে উল্লেখযোগ্য বলে তিনি জানিয়েছেন। 

Developed by DXDasia