আপনজন : দক্ষিণ কলকাতায় চপ-কাটলেটের নির্ভরযোগ্য আস্তানা

এখানকার ফিস ফ্রাইয়ে টাটকা ভেটকির স্বাদ এখনও অদ্বিতীয়

দোকানের সাইজ দেখলে আপনি ভাবতেই পারেন, কলকাতার অন্যতম সেরা চপ-কাটলেটের দোকান এটা হয় কী করে! ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খাবার কিনতে হবে, খেতে চাইলে সেই ঠিকানাও ফুটপাত। তবে যাঁরা গাড়িতে আসেন তাঁদের কথা আলাদা। গাড়িতেই তাঁরা ডান হাতের কাজ সারেন। সুবিখ্যাত তরুণকুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষের গাড়িতে বসার তর সইত না, তাঁরা ফুটপাতে দাঁড়িয়েই ফিশ ফ্রাই, এগ পকোড়ার সদগতি করতেন বলে শোনা যায়। রবি ঘোষ নাকি খাবার পর এতই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন যে প্রতিবারই এই ‘আপনজন’-এর কর্ণধার প্রভাস ঘোষের মাথায় তিন আঙুল হাত ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করতেন।

আশীর্বাদ, ভালোবাসা পাওয়ার মতো হিট মেনু বই কী দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী মোড়ের একেবারে কাছে তপন থিয়েটারের গায়ে সদানন্দ রোডের এক চিলতে দোকান আপনজনের। এখানকার ফিশ ফ্রাই কিংবদন্তিতুল্য। ভেটকির পুরু ফিলেয় ঠাসা এই ফ্রাইয়ের মাছ নিজে কেনেন প্রভাসবাবু। ভোরবেলা উঠে চলে যান মাছের আড়তে। মাছ পছন্দ না হলে সেদিন মাছই আনেন না। ফিশ ফ্রাই হয় না। তবু কোয়ালিটির সঙ্গে কোনও আপস নয়। শুধু তাই নয়, কলকাতায় একমাত্র এই দোকানেই বোধহয় ফিশ ফ্রাইয়ের দাম ওঠা নামা করে। ভেটকির দরের উপর এই দাম নির্ভর করতো। ক্রেতাদের অবশ্য সেসব নিয়ে কোনও মাথাব্যাথা নেই। আসেন, ভিড় জমান, কেনেন, খান। মাংসের সিঙ্গাড়া, মটন কাটলেট, প্রণ কাটলেট, এগ পকোড়া কিছুই পড়ে থাকে না। আর ফিশ পসিন্দা তো শীতে সুপার হিট!

বছর পঞ্চাশের প্রভাসবাবুর আদি বাড়ি সুন্দরবনের কুলতলিতে। দাদুর হাত ধরে কলকাতায় আসা, ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ করতেন। খেতে খুব ভালোবাসেন, বছর তিরিশ আগে মাথায় ঢুকল নিজে কিছু করার ইচ্ছে, আর তা অবশ্যই খাওয়া সংক্রান্ত। পরম হিতৈষী তাঁদের জমিদার মুখোপাধ্যায়দের একতলার এক পরিত্যক্ত ঘরে ১৯৮২ সালের ১৭ অগাস্ট শুরু করলেন ‘আপনজন’। প্রথম দিকে করতেন শুধু রাধাবল্লভী, সিঙ্গাড়া আর ভেজিটেবিল চপ। সামান্য লাভেই খুশি ছিলেন। লাভ বলতে ভালো জিনিস খাওয়ানোর তৃপ্তি। ব্যস এটাই হয়ে উঠলো দোকানের ‘ইউএসপি’। তাঁর কথায়, “দোকানে খাবারের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তাই করি না। যেটুকু করি, তার প্রত্যেকটা যেন ভালো হয় সে দিকেই আমার নযর।” এবং সে জন্যই মাছ মাংস নিজে এনে নিজের হাতেই ফ্রাই-চপ-কবিরাজি বাঁধার কাজটা করেন। মশলার রসায়নটাও ওঁর নিজের। তারপর টাটকা সাদা তেলে ভাজার প্রক্রিয়া তো শুরু হয় খদ্দেরের সামনে। প্রভাসবাবুর কথায়, “আমার দোকানের খাবার খেয়ে বাজে ঢেঁকুর উঠলে টাকা ফেরত।”

 

কেউ অবশ্য তা আজ পর্যন্ত চাননি—সত্যজিৎ রায় থেকে জুনিয়র পিসি সরকার সহ এখনকার তাবড় তাবড় নায়ক-নায়িকা কেউ না। প্রত্যেকেই তাঁর চপ কাটলেটের গুণমুগ্ধ। চোখের সামনেই দেখলাম, কীভাবে দোকানের সব খাবার খালি হয়ে গেল। প্রভাসবাবুর মুখে চোখে তখন তৃপ্তির ঝলক।

Developed by DXDasia