স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তাহলে এখানেই
একাকিত্ব কি সত্যিই উপভোগ করার বিষয়?
যখন হিমালয়ে আল্পাইন ক্লাইম্বিং করব ঠিক করেছিলাম, আরো নানা কিছুর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠা। সেই প্রস্তুতিপথ যতটা না শারীরিক তার থেকে অনেক বেশি মানসিক, তাই তা মোটেই সহজ ছিল না। অন্যের উপর নির্ভরশীলতা পুরোপুরি কমিয়ে ঠিক করলাম একাই কাটাব, নিজের অনুভূতিগুলো নিজের সঙ্গেই ভাগ করে নেব, যতই ক্লান্ত থাকি না কেন রাতে ফিরে নিজের খাবারটা নিজেই বানাব ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে হিমালয়ে আল্পাইন ক্লাইম্বিং প্রচণ্ড নিষ্ঠুর, ঠিক যতটা কল্পনা করতে পারেন, তার থেকেও অনেক বেশি। আর এখানে কেউ কারো উপর নির্ভরশীল হয়ে ক্লাইম্ব করতে পারে না। এখানে ক্লাইম্ব হয় নিজ নিজ দক্ষতায়, বেঁচে থাকতে হয় নিজের জোরেই। তাই তার প্রস্তুতিও ততটাই কঠিন, সামগ্রিক জীবনযাত্রাতেও এই প্রস্তুতির ছাপ রাখতে হয়।

২০১৮-এর পুজোর ছুটি পেলাম যখন, একা একাই বেরিয়ে পড়লাম ‘স্কাই রানিং’ মানে পাহাড় বেয়ে দৌড়নোর জন্য। এবারে লক্ষ অন্নপূর্ণা সার্কিট। মোট দূরত্ব ১৫০ কিমি। সঙ্গে পেরোতে হবে পাঁচহাজার মিটারের দুটি নির্জন দুর্গম পাস। অথচ হাতে সময় মাত্র চারদিন। নিয়েই ফেললাম চ্যালেঞ্জ। সময় খুব কম অথচ পাহাড়ে একা বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার আমায় বাড়িয়ে চলতে হবে খুব দ্রুত।
আরো পড়ুন
একদৌড়ে সান্দাকফু মাত্র পৌনে ছ’ঘন্টায়
শালিমার-গোরক্ষপুর এক্সপ্রেস ধরে গোরক্ষপুর পৌঁছলাম সন্ধের দিকে। ওখান থেকে গাড়িতে করে যখন সুনৌলি সীমান্তে পৌঁছলাম তখন আটটা বাজতে আরো দশ মিনিট বাকি। তাই ভাবলাম প্রয়োজনীয় খাবারপত্রের বাজার ভারতের দিক থেকেই করে নেই। আসলে আমি জানতাম, পোখরা যাওয়ার শেষ বাস রাত আটটা অবধি পাওয়া যায়। কিন্তু যখন স্ট্যান্ডে পৌঁছলাম তখন দেখলাম, শেষ বাস ছেড়ে চলে গিয়েছে। আসলে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম, নেপালের সময় ভারতের থেকে পনেরো মিনিট এগিয়ে!
রাতটা ওখানেই হোটেলে কাটল। এরপর ভোরের প্রথম বাস ধরে রওনা দিলাম পোখরার দিকে। ঠিক ছিল পোখরাতে অতিরিক্ত মালপত্র রেখে খুব হাল্কা ওজন নিয়ে দ্রুত সার্কিটটি শেষ করব। কিন্তু ঘটনাচক্রে সমস্ত মালপত্র নিয়েই পৌঁছে গেলাম বেশিশহরে। ফলে যা কিছু মালপত্র নিয়ে কোলকাতা থেকে রওনা দিয়েছিলাম, সেই ভারী স্যাক নিয়েই আমার অভিযান শুরু হল। সঙ্গে পেলাম একটা অতিরিক্ত দিন।
হ্যাঁ, অভিযানই বটে, বেশিশহর থেকে একাকী ট্রেকের অনুমতি যোগাড় করে বাসে করে চলে এলাম নদিবাজার অবধি।, রাত্রিটা ওখানেই কাটালাম। রহস্যময় মার্স্যাংডি নদীর গভীর উপত্যকা আর সবুজ পাহাড়ের উপর জমে থাকা মেঘ রীতিমতো ছমছমে পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই কুহেলীর ডাক উপেক্ষা করার সাহস আমার নেই।
পরেরদিন ভোর সাড়ে ছটায় বেরিয়ে পড়লাম মার্স্যাংডি নদীর উপত্যকা ধরে। এর বামদিকে আসছে অন্নপূর্ণা রেঞ্জ, ডানদিকে মানসালু রেঞ্জ, মধ্যিখানে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকের রাস্তা। ঠিক প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর রাস্তার দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে চলেছে। প্রতিটি বাঁক নিজের নতুন নতুন রূপ খুলে দিচ্ছে।

প্রথম দিনের গন্তব্য ছিল নদী বাজার থেকে তিমাং। দূরত্ব প্রায় ৪৭ কিমি। সঙ্গে ২০ কেজির স্যাকটি নিয়ে উঠতে হবে প্রায় ২৫০০ মিটার! একের পর এক গ্রাম পেরিয়ে নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছি। কখনো সবুজ ধানক্ষেত, কখনো বিশাল বিশাল সব ঝরনা ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে। আর একা চলার সুবিধে হল কত স্থানীয় লোকেই ডাকছে কথা বলার জন্য, একটু গল্প করার জন্য। তারা আমার পরিকল্পনা শুনে হতবাক হয়ে যাচ্ছে!
একে একে জগৎ, তাল, ধারাপানি পেরিয়ে যখন থোচে পৌছলাম তখন প্রায় ৫ টা বাজে। আমায় কিছুতেই স্থানীয় লোকজন ছাড়বে না। বললো, তিমাং পৌঁছতে এখনো তিনঘণ্টা লাগবে। অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলব… আমি আমার মতো স্পিডেই দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। ঠিক করেছিলাম, আর একঘণ্টার মধ্যেই যেভাবে হোক তিমাং পৌঁছবো। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত সত্যিই জংগলের মধ্যে রাস্তা হারিয়ে, অন্ধকারে রাস্তা খুঁজে বের করে তিমাং পৌছলাম প্রায় রাত্রি ৭-৩০-এর দিকে!
পরেরদিন সকালে পূর্বদিকে মানসালু ঝকমক করে উঠলো! বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গ যখনই দেখি, মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। তার উপর, একা ঘুরছি দেখে গল্প করতে করতে আগের দিন রাতেই হোটেল মালিক আমায় বিনামূল্যে ইয়াকের মাংস খাইয়েছে। ডবল লাড্ডুর আনন্দ নিয়ে এগিয়ে চললাম চামের দিকে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি অন্নপূর্ণা সার্কিটের মেন রাস্তায় প্রচুর ছোটো ছোটো গ্রাম রয়েছে এবং সব গ্রামেই থাকার জন্য টি-হাউস রয়েছে। এখানে থাকার খরচ খুবই কম বা বিনামূল্যে। কিন্তু খাওয়ার খরচ প্রচুর। সব্জি-ভাতের দামই নেপালি টাকায় ৭০০!

নিজের মতো গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলেছি, হঠাৎই জঙ্গলের মাঝে মাথা ফুঁড়ে আবির্ভূত হল অন্নপূর্ণা! প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমার সেই প্রথম অন্নপূর্ণা দেখা, খানিক থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। এরপর যত এগোচ্ছি, অন্নপূর্ণার নানা দিক থেকে পিকগুলো একে একে দৃশ্যমান হতে শুরু করল। মনে হচ্ছে, আমি রীতিমতো পাগল হয়ে যাব। হ্যা, অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক একা করা উচিৎ নয়, এত সুন্দর নয়ানাভিরাম পরিবেশের মধ্যে মানুষ পাগল অবধি হয়ে যেতে পারে!
এদিনের যাত্রা ছিল মোট ৪০ কিমি, সঙ্গে ২৫০০ মিটার উঠে আসা। পিসাং থেকে একটা লম্বা চড়াই বেয়ে উঠে এলাম ঘাইরু গ্রামে, সময় যেন এখানে থমকে মধ্যযুগেই দাঁড়িয়ে আছে। সেখান থেকে গেলাম নাওয়াল গ্রামে, গ্রামে ঢোকার মুখে লেখা ছিল ‘হিডেন প্যারাডাইস অন আর্থ’, পৃথিবীর বুকে লুকানো ছোট্ট একটুকরো স্বর্গ।
কেন স্বর্গ বলছে? পরেরদিন যখন কাংলার পথে এগিয়ে গেলাম খুব ভালোভাবে টের পেয়েছিলাম!
(চলবে)