একদৌড়ে সান্দাকফু মাত্র পৌনে ছ’ঘন্টায়

বাংলা তথা ভারতে এত কম সময়ে সান্দাকফু উঠেছে কেউ?

ছুটি পেলেই যার পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়া স্বভাব, হঠাৎই পুজোর আগে তিনদিনের ছুটি পেয়ে সে আর চুপচাপ বসে থাকে কী করে! অতএব, বেরিয়ে পড়লাম আবার মানেভঞ্জনের দিকে। তবে, আগেরবারের মতো একা নয়। গোর্খেতে ভাল্লুকের মতো কোনো এক বন্য প্রাণীর তাড়া খেয়েছিলাম। ফলে ঠিক করলাম, এবারে সঙ্গে করে কাউকে নিয়ে যাব। পেয়েও গেলাম অভীককে।

কিন্তু, সমস্যা হল– মানেভঞ্জন পৌঁছে অভীকের শরীর খারাপ হয়ে গেল। অগত্যা ঠিক করলাম, একাই বেরবো। তাই দৌড়ে সান্দাকফু, ফালুট হয়ে গোর্খেতে নামার পরিবর্তে সান্দাকফু গিয়েই ফিরে আসার পরিকল্পনা করলাম। সব মিলিয়ে ৫৮ কিমি রাস্তা। উচ্চতা বিচার করলে একদৌড়ে ওঠা-নামার পক্ষে নেহাত কম না। তার মধ্যে, পিঠের ব্যাগে ওজনও ছিল।

শুরু করলাম ভোর ৪টে ৪০-এ। শুরুতেই প্রচণ্ড চড়াই পেরিয়ে চিত্রে পৌঁছলাম ২৯ মিনিটেই। পিঠে ৩-৪ কেজির ওজনের মধ্যে ছিল জল, আলুসেদ্ধ, ডিমসেদ্ধ, কিছু চকলেট মানে এনার্জি বার, ওষুধপত্র, রেইনকোট। চিত্রে পেরতেই সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলাম। ততক্ষণে সূর্যের রক্তাভ আভায় নিজের রং পাল্টাচ্ছে। রং গলে গলে গড়িয়ে পড়ছে ঘুমন্ত বুদ্ধের গা বেয়ে।

এরপর একে একে মেঘমা, টুমলিং পেরিয়ে গৈরিবাস ছাড়িয়ে কায়াকাটা পৌঁছলাম। ততক্ষণে মেঘ ঢুকতে শুরু করে দিয়েছে। একাই এগিয়ে চলেছি। মাঝেমধ্যেই বন্য জন্তু-পাখি রাস্তা পারাপার করছে।

আগেরবারের চাইতে এবারে অনেকটাই সহজবোধ করছিলাম। তাই, শেষ অবধি নিজেকে ঠেলে গেলাম। বিকেভঞ্জন থেকে প্রচণ্ড চড়াই পেরিয়ে অবশেষে সান্দাকফু পৌঁছলাম ঠিক ১০টা ২৬ মিনিটে। অর্থাৎ, মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু, ৩০ কিমি রাস্তা, সঙ্গে প্রায় ৩০০০ মিটারের চড়াই পেরিয়ে, স্বনির্ভর হয়েই একাই পৌঁছলাম ঠিক ৫ ঘন্টা ৪৬ মিনিটে!

সময়ের রেকর্ডের পেছনে আমি দৌড়াইনা। প্রতিটি মুহূর্ত আমার সামর্থকে পুশ করতে থাকি। কিন্তু, পুরোপুরি স্বনির্ভরভাবে, পিঠে ওজন নিয়ে এর আগে কেউ এত কম সময়ের মধ্যে মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু উঠেছে কি? বাংলা তো বটেই, পুরো ভূ-ভারতের এমন কাউকে আমার অন্তত চেনা নেই।

আমি লম্বা দৌড় শুরু করেছিলাম ২৭ বছর বয়সে এসে। অর্থাৎ, মাত্র বছর দেড়েক আগে। অন্যান্য সব ফিল্ডের মতো এখানেও দক্ষতা তৈরি করতে অন্তত ১০ বছর লেগে যায়। তাই, ধৈর্য নিয়ে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এই ধৈর্য এখনই অদ্ভুত সব সাফল্য এনে দিচ্ছে আমায়। আমার নিজের নিরিখে সাফল্য। আগে সান্দাকফু যেতাম কত পরিকল্পনা করে, জিনিসপত্র বেঁধে। এখন, একদিন সকালে ব্যাগ নিলাম আর দৌড়তে দৌড়তে সান্দাকফু চলে গেলাম!

ফেরার খুব বেশি তাড়া ছিল না। তাই মেঘে ঢাকা সান্দাকফুতে এক কাপ চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। ততক্ষণে, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। পা পিছলে যেতে পারে যে কোনো সময়ে। তাই, খুব সাবধানে নামতে শুরু করলাম। মানেভঞ্জন পৌঁছলাম সন্ধের আগেই। একদিনেই উঠে নেমে আসা। সব মিলিয়ে ৫৮ কিমি পাহাড়ি রাস্তা পেরতে সময় লাগল মোট ১২ ঘন্টা ৩৭ মিনিট!

Post Tags
Developed by DXDasia