অন্নপূর্ণা সার্কিট যাত্রা: একাকিত্বের পরীক্ষা- ৩

আগামী কয়েক মাসে এই রাস্তা কেউ পেরোবেও না…

অন্নপূর্ণা সার্কিটের মূল রাস্তা খুব কঠিন ট্রেক নয়। প্রায় ১৫০ কিমি লম্বা, সঙ্গে একটি ৫৪০০ মিটার উচ্চতার পাস পেরোতে হয়—থরোংলা। রাস্তায় গ্রামের লোকজন এবং ট্রেকার্সদের সাক্ষাৎ মিলতেই থাকে। ট্রেকার্সরা ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এই রুট কমপ্লিট করে।

আমি এই রাস্তাটাই একটু কঠিন বানিয়ে নিয়েছিলাম। ঠিক করলাম, থরোংলার বদলে দুটি নির্জন ৫৩০০ মিটারের পাস, কাংলা আর মেসোকান্তলা হয়ে ১৫০ কিমি শেষ করব একাকী মাত্র ৫ দিনে। সঙ্গে রয়েছে প্রায় ১৫ কেজির একটি স্যাক। তাতে না রয়েছে স্লিপিং ব্যাগ, না টেন্ট। 

এর আগের পর্বগুলোতে নাগদিবাজার থেকে শুরু করে নাওয়াল গ্রাম হয়ে কাংলাপাসে ওঠার গল্প বলেছিলাম। বিশাল সেই অন্নপূর্ণা রেঞ্জ চোখের সামনে দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। সত্যিই তো, পাহাড় নিজের রূপ তাদের জন্যেই খুলে দেয়, যারা কষ্ট করে পাহাড়ে উঠতে পারে। আর সেই মোহময়ীকে স্পর্শ তারাই করতে পারে, যারা পর্বোতারোহণে যায়।

নাওয়াল গ্রামে নেমে এসে মানাং হয়ে পরের দিন চলে গেলাম তিলচো বেস ক্যাম্পে। মানাং আমার দেখা এখনো অবধি সবথেকে সুন্দর পাহাড়ি শহর। হ্যাঁ, লেহর থেকেও সুন্দর। মানাং পেরিয়ে খাংসার হয়ে তিলচো বেসক্যাম্পের রাস্তা বেশ বিপজ্জনক। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে ৭০০০ মিটারের তিলচো পিক। ঝুরঝুরে পাথরের মোরেনজোনের মধ্যে দিয়ে যখন তিলচো বেস ক্যাম্পে পৌঁছলাম, তিলধারণের জায়গা নেই। তিলচো বেসক্যাম্পে থাকার মতো ব্যবস্থা বলতে তিনটে মাত্র হোটেল। কিন্তু, নেপালে ছুটির মরশুমে সব ভর্তি, এমনকি ডাইনিং রুমেও পা রাখার জায়গা নেই। খাওয়াদাওয়া করে অগত্যা এক কোণে কয়েকঘণ্টা বসেই কাটালাম। এখানেও দেখা হয়ে গেল একদল বাঙালি ট্রেকার্সদের সঙ্গে। বাকিদের মতো ওরাও তিলচো লেক দেখে মানাং ফিরে যাবে।

ঘুম হচ্ছে না দেখে রাত তিনটের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কোজাগরি পূর্ণিমার রাতে সামনে ঝকমক করছে শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গগুলো। প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে ভোর ছটার আগেই উঠে এলাম তিলচো লেকে, তখন সবে সূর্যোদয় হচ্ছে।

এত সুন্দর দৃশ্যও আছে পৃথিবীতে? ৫০০০ মিটার উচ্চতায় বিশাল নীল রঙের লেক, পাশেই উঠে গিয়েছে সাতহাজারের তিলচো শৃঙ্গ। সূর্যের প্রথম আভায় তখন সব সোনালি রং। ঠান্ডা হাওয়ায় তখন প্রায় সব জমে যাচ্ছে। একটি মাত্র টি হাউসে এক কাপ চা খেলাম ১৫০টাকায়! একপ্লেট সুপ ৪০০ টাকায়! তারপরে খানিক ঘুমিয়ে নিলাম।

সকাল ৭টায় রওনা দিলাম মেসোকান্তলার দিকে। এবারে আমি একা! মেসোকান্তলা দিয়ে খুব কম লোকজন অন্নপূর্ণা সার্কিট কমপ্লিট করে। তিলচো বেসক্যাম্প থেকে মেসোকান্তলা হয়ে জনসম অবধি দূরত্ব ৩৫ কিমি। মাঝে জলের সোর্স মাত্র দুটি। ৫১০০ মিটার উচ্চতায় প্রায় ১০ কিমি পেরোতে হয়! হিমালয়ের অন্যতম নির্জন এবং চ্যালেঞ্জিং পাস হল এই মেসোকান্তলা।

আমার ধারণা ছিল সকাল ১০টার দিকে পাস ক্রশ করে যাবো। তিলচো লেক থেকে একটু এগিয়েই প্রথম জলের সোর্স, একটি ঝরনা। পৌঁছে দেখলাম পুরো জমে গিয়েছে, একটু জল খাওয়ার জন্য কোমরের বোতল বের করলাম, সেটিও জমে গিয়েছে! এত ঠান্ডা আবহাওয়া পাব আশা করিনি! অর্থাৎ জল ছাড়া আমায় আরো প্রায় ১৫ কিমি এগোতে হবে। পাস পেরিয়ে উল্টোদিকে নেমে আবার জল পাব। টানা চারদিন ধরে তার আগে হেঁটেই চলেছি। ১২০ কিমি পেরিয়েছি এখনো অবধি। একটা ৫২০০ মিটারের পাসও পেরিয়েছি। আগের দিন রাতেও ঘুম হয়নি। হঠাৎ দেখলাম রাস্তা ২০০ মিটার নেমে আবার উঠে গিয়েছে। এবার আমি অবসন্ন হতে শুরু করলাম। মাথা ধরে আসছে, পা চলছে না, সন্ধের আগে পৌঁছতে হবে ৩০ কিমি দূরে জমসমে। তার আগে খাওয়া থাকার কোনো জায়গা নেই।

ততক্ষণে প্রায় ১০টা বেজে গিয়েছে, পাসের নাম গন্ধ কোথাও নেই। এর মধ্যে জলের অভাবে আমার ডাইরিয়া হয়ে গিয়েছে। বারেবারে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দিতে শরীর পুরো ক্লান্ত। সেই ৫১০০ মিটারের নির্জন প্রান্তে আমি পুরো অসহায়, অবসন্ন।

আমি জানি, এই অবস্থায় কী করতে হয়… এর আগে এমন অবস্থা হয়েছিল লাদাখে খার্দুংলা পেরিয়ে ১১১ কিমি দৌড়তে গিয়ে! একটা পাথরের পেছনে গিয়ে বসলাম, মোবাইলটা বের করে ৩০ মিনিট পরে একটা এলার্ম সেট করলাম। তারপর, বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম!

আমি যে কোনো জায়গায় ঘুমোতে পারি। আমার যদি কোনো স্পেশাল ক্ষমতা থেকে থাকে, তাহলে এটাই। আমি কোলকাতার ভিড় বাসেও রড ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়েছি। পরে এই আল্ট্রারানিং-এর দুনিয়ায় এসে বুঝতে পেরেছি ঘুম কতটা প্রয়োজনীয়! এটাকে বলে পাওয়ার ন্যাপ। যখন শরীর দ্রুত নিজেকে রিপেয়ার করতে থাকে। যে বিশ্রাম আসলে পরের গতি আবার বাড়িয়ে দেয়।

অনেক দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন কোনো আওয়াজ ভেসে আসছে। পরে বুঝতে পারলাম ওটা এলার্ম। কেউ ছিল না সেখানে আমায় দেখার মতো। কয়েক মাসে কেউ ওই রাস্তা পেরবেও না। 

একটা ক্যাফিন দেওয়া জেল খেয়ে উঠে দাড়ালাম। হ্যাঁ, উঠে দাড়াতেই হত। এটাই ছিল আমার ‘প্রজেক্ট সোলো’র উদ্দেশ্য। দেখছিলাম, কতটা নির্মম পরবিবেশেও নিজে বেঁচে থাকতে পারি। যাই হয়ে যাক পাহাড়ের উপরে, থামা চলবে না, আমায় নেমে আসতেই হবে। ওখানে থেমে যাওয়া মানে মৃত্যু। আমাদের জীবনেও বোধহয় থেমে যাওয়ার আরেক নাম মৃত্যু। 

অবশেষে মেসোকান্তলা পেরোলাম দুপুর একটার দিকে। এবার মানাং ভ্যালি ছেড়ে সোজা নামতে শুরু করলাম মুস্তাং ভ্যালির দিকে। তখনও প্রায় ২০ কিমির উতরাই বাকি, খানিক নামার পরে জল পেলাম। পেট ভরে জল খেলাম। এবার রওনা দিলাম সোজা জনসমের দিকে। ধৌলাগিরি দেখতে দেখতে গিয়ে পৌছলাম সন্ধে সাতটা নাগাদ।

সঙ্গে শেষ করলাম অন্নপূর্ণা সার্কিট যাত্রা। এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য এবং অভিজ্ঞতা আমার আত্মবিশ্বাস আরো কয়েকধাপ এগিয়ে দিল। মুস্তাং ভ্যালির বাস রাস্তাও অপূর্ব সুন্দর! এটি সম্ভবত পৃথিবীর গভীরতম গর্জ। রাতে গিয়ে পৌছলাম পোখরা। পরেরদিন ফেওয়া লেকের পাসে বসে অন্নপূর্ণা, মাছাপুছরে উল্টো দিক দিয়ে দেখতে দেখতে এবার নিশ্চিন্তে সেলিব্রেশনের পালা। সঙ্গে প্ল্যান করতে শুরু করলাম আরো চ্যালেঞ্জিং কিছুর… 

Post Tags
Developed by DXDasia