চোখের সামনে অন্নপূর্ণা, গঙ্গাপূর্ণা, মচ্ছপুছরে, ধৌলাগিরি—এ যেন স্বর্গ
২
নাওয়াল গ্রামে পৌঁছতেই সন্ধে হয়ে গেল, পরেরদিন ঠিক কোন রাস্তা দিয়ে উঠবো দেখার সুযোগ পেলাম না। রাত ৪.৩০-এ যখন বেরিয়েছিলাম, চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একমাত্র ভরসা ছিল স্মার্টফোনের জিপিএস আর maps.me. খাবার টেবিলে গাইডরা আমায় বলছিল, একটাই রাস্তা উপরে উঠে যাচ্ছে, ওটাই কাংলার রাস্তা। তাই জিপিএস মিলিয়ে যখন উপরের রাস্তা ধরেছি, ভেবে নিয়েছিলাম আর দেখতে হবে না। আলো ফোটার আগে যতটা দ্রুত সম্ভব উঠে চলেছি।

ভোর ছটায় যখন প্রথম আলোকচ্ছটায় পুরো অন্নপূর্ণা রেঞ্জ জ্বলজ্বল করে উঠল, খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। এত কাছে, এত বিশাল! অন্নপূর্ণা ১, ২, ৩, ৪… তার পাশে গঙ্গাপূর্ণা, মচ্ছপুছরে, ধৌলাগিরি– একের পর সাত-আটহাজারি শৃঙ্গ ঢেউ খেলিয়ে চলেছে। রূপালি থেকে সোনালি হয়ে ততক্ষণে পাহাড়গুলো ধবধবে সাদা হয়ে উঠেছে। সত্যিই স্বর্গ। ভিডিওটিতে খানিক সেই রঙ ধরার চেষ্টা করেছি।
এদিকে পড়লাম আরেক বিপদে। আলো ফুটতে দেখলাম যে পাহাড়ে ওঠার কথা ছিল, আমি ঠিক তার পাশের পাহাড়ে প্রায় ৩০০ মিটার উঠে পড়েছি। অন্ধকারের মধ্যে কখন ট্রেক রুট ছেড়ে গরু ছাগলের হাঁটার পথ ধরে নিয়েছি বুঝতে পারিনি।
নিজের ছড়ানো দেখে তখন নিজেকে পুরো মিস্টার বিন মনে হচ্ছিল। তবে, বিন যেভাবে নিজের অদ্ভুত কাণ্ডগুলো গুছিয়ে নেয়, আমাকেও সেভাবে গুছিয়ে নিতে হত। পাশের পাহাড়ে ট্রাভার্স করলাম মাঝের একটি অংশ রীতিমতো রক ক্লাইম্বিং করে। তারপরেও রাস্তা খুঁজে পেতে প্রায় ৮টা বেজে গেল।

একাকী এগিয়ে চলেছি কাংলা পাসের দিকে, উচ্চতা প্রায় ৫৩২০ মিটার। অন্নপূর্ণা সার্কিট রুটের মূল রাস্তায় এই পাস পড়ে না, তাই রাস্তায় আর কেউ নেই। এক্লামাইটেজেশনের অভাবে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তাই ধীরে ধীরে উঠছি। পাস থেকে যখন প্রায় ৫০০ মিটার নিচে, কতগুলো বিন্দু দৃশ্যমান হল পাসের কাছে। বুঝলাম একটা টিম উল্টো দিক থেকে, মানে নার গ্রাম থেকে কাংলা পাস পেরিয়ে নাওয়াল গ্রামে নামছে।

হঠাৎই দেখলাম একজন ডিগবাজি খেতে খেতে পড়ছে। সে দৃশ্য দেখে রক্ত হিম হয়ে গেল। পাশ থেকে দুজন খুব দ্রুতগতিতে নেমে পড়ন্ত ব্যক্তিটিকে আটকালো। ওরা উপর থেকে আমায় সাহায্যের জন্য ডাকছে, আমিও যতটা দ্রুত সম্ভব ওঠার চেষ্টা করছি। কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে হাঁসফাঁস করছি। অবশেষে টিমটির সঙ্গে দেখা হল প্রায় একঘণ্টা পরে। সবার বয়স মোটামুটি ৬৫-৭০-এর উপরে। যে ভদ্রমহিলা গড়িয়ে পড়ছিলেন তিনিও সত্তরোর্ধ। গায়ে কিছু ধুলোর চিহ্ন ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে অতগুলো ডিগবাজি খেয়েছেন!

সত্যি, আমাদের দেশে লোকজন ৬০-এর পরে জীবন শেষ বলে ধরে নেয়, আর এরা ৬০ এর পরে নতুন জীবন শুরু করে!
অবশেষে কাংলা পাস পৌঁছলাম! আমার জানা হিমালয়ে তিনটি কাংলা পাস আছে, একটি কাশ্মীর-হিমাচল বর্ডারে, যেটি ২০১৬-তে পেরিয়েছিলাম। একটি এই নেপালে, যেটি এখন পেরোলাম। আরেকটি নেপাল-সিকিম বর্ডারে, খুব তাড়াতাড়িই হয়তো সেটাও পেরিয়ে যাব।

রাস্তা ভুল করে অনেকটা দেরি করে ফেলেছিলাম, তাই নাওয়াল ভিলেজে ফিরে বেরনোর কোনো উপায় ছিল না। ঠিক করলাম, নাওয়ালেই রাতটা কাটাবো, তাই ফেরার কোনো তাড়াও ছিলনা। মুগ্ধ হয়ে অনেকটা সময় কাটালাম কাংলা পাসের কাছে।

তখনো ভাবতে পারিনি আসল চ্যালেঞ্জ আসতে চলেছে সামনেই…
(চলবে)