উত্তমের সঙ্গে জুটি বেঁধে একসময় বাংলা সিনেমায় রাজ করেছেন অঞ্জনা ভৌমিক

মাত্র ২০ বছর বয়সে আরতি থেকে নিজের নাম পাল্টে রাখলেন অঞ্জনা

সত্তরের দশকের বিখ্যাত বাংলা ছবি ‘রৌদ্রছায়া’। আউটডোর শুটিং চলছে এক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে। শুটিং প্যাক-আপ হতেই দেখা গেল অভিনেত্রী সুপ্রিয়াদেবী ও অঞ্জনা ভৌমিক একসঙ্গে দুপুরে খেতে বসেছেন। খাবার এসেছে সুপ্রিয়ার বাড়ি থেকে, নিজে হাতেই তিনি রান্না করে এনেছেন বন্ধু অঞ্জনার জন্য। অথচ ওই ছবিতে অভিনয়ই করেননি সুপ্রিয়াদেবী। তবু রোজ শুটিং-এ আসতেন শুধুমাত্র এই বন্ধুটির জন্য। মাগুর মাছ খেতে ভালোবাসেন অঞ্জনা, বাড়িতে সুপ্রিয়াদেবী নিজের মেয়ের জন্য তা রাঁধলেই খবর দিতেন বন্ধু অঞ্জনাকেও। শুটিংয়ের পর আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতেন অঞ্জনা। একদিন খেলার সময় পড়ে গিয়ে অঞ্জনা চোট পেয়েছেন খবর পেয়েই সাবিত্রী সব ফেলে ছুটে এলেন বন্ধুর কাছে। সেই অর্থে একজন ‘হার্টথ্রব’ জনপ্রিয় অভিনেত্রী আরেকজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর জন্য নিজে রান্না করে আনছেন কেবলমাত্র বন্ধুতার খাতিরে, এক জনপ্রিয় অভিনেত্রী আরেকজন অভিনেত্রীর সেবা করছেন, এমন নির্ভেজাল আন্তরিকতা আজকের চলচ্চিত্র জগতে হয়তো বিরল। কিন্তু এমনটাই যে ঘটত তখন, নিজে মুখেই তা বলেছেন বাংলা ছবির বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অঞ্জনা ভৌমিক, এইসব স্মৃতির ভার, যার কাছে তাঁর বয়সের চেয়েও বেশি। লোকচক্ষুর আড়ালে মুম্বাইয়ে দিন কাটে এখন তাঁর, সঙ্গী বই, পুরোনো সিনেমা আর কখনও দুই মেয়ে চন্দনা, নীলাঞ্জনা বা তাদের পরিবার পরিজন।

শুটিং প্যাক-আপ হতেই দেখা গেল অভিনেত্রী সুপ্রিয়াদেবী ও অঞ্জনা ভৌমিক একসঙ্গে দুপুরে খেতে বসেছেন। খাবার এসেছে সুপ্রিয়ার বাড়ি থেকে, নিজে হাতেই তিনি রান্না করে এনেছেন বন্ধু অঞ্জনার জন্য।

কোয়ালিটি কাজে বিশ্বাস করতেন অঞ্জনা, তাই একসময় আর তেমন ছবি করেননি তিনি। অথচ ষাটের দশকের বিখ্যাত সিনেমা মানেই অঞ্জনা ভৌমিক, কখনও মহানায়ক উত্তমকুমারের বিপরীতে, আবার কখনও তাঁর নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সৌন্দর্যের আভিজাত্য আর দৃপ্ত অভিনয় ঘিরে ছিল অভিনেত্রী অঞ্জনাকে। দর্শককে আবিষ্ট করার অপূর্ব ক্ষমতা ছিল তাঁর। ভালো কাজের জন্য দর্শক অপেক্ষা করবেই, এ কথা এখনও মানেন অঞ্জনা। নিজেই বলেছেন, “আই অলওয়েজ বিলিভ দ্যাট ইউ মাস্ট কিপ ইওর অডিয়েন্স ওয়ান্টিং মোর”।

 

কোচবিহারের মেয়ে অঞ্জনার আসল নাম আরতি। সুনীতি অ্যাকাডেমির মেধাবী ছাত্রী আরতিকে বাবা বিভূতিভূষণ আদর করে ডাকতেন বাবলি বলে। বাবার আদরের বাবলি স্কুলের পড়া শেষ করে কলকাতায় সরোজিনী নাইডু কলেজে ভর্তি হয়। তখনও ঠিক ছিল না আরতি অভিনয়ই করবে পরবর্তীতে। কিন্তু ভবিতব্য এমনটাই ছিল বোধহয়। তাই হঠাৎই সুযোগ আসে, মাত্র ২০ বছর বয়সে পীযুষ বসুর পরিচালনায় ‘অনুষ্টপ ছন্দ’-তে প্রথম ‘ডেবিউ’ করেন আরতি। ছবি মুক্তির আগেই নিজের নাম পাল্টে রাখেন ‘অঞ্জনা’। আর এই নামেই দর্শক ও সমালোচকের কাছে জনপ্রিয় হন প্রথম ছবি থেকেই। অভিনয় গুণে অঞ্জনা চোখে পড়েছিলেন অনেকেরই। তাই একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ আসে সহজেই। মহানায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘চৌরঙ্গী’, ‘কখনও মেঘ’, ‘নায়িকা সংবাদ’, ‘রৌদ্রছায়া’, ‘রাজদ্রোহী’-তে অঞ্জনা ভৌমিকের অভিনয় দর্শক মনে রাখবে চিরকাল। যখন দর্শক ভেবেছেন আর বোধহয় সাফল্য পাবে না উত্তম-অঞ্জনা জুটি, সবাইকে অবাক করে অঞ্জনা ফিরে এসেছেন ‘মহাশ্বেতা’-য়, যেখানে বিপরীতে তাঁর নায়ক ছিলেন সৌমিত্র। অঞ্জনা সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায় সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তাঁর পরিশ্রম ও প্রতিভার সাক্ষী। ইন্ডাস্ট্রির সবার সঙ্গেই তাই এক সহজ সম্পর্ক ছিল অঞ্জনার। প্রতিবছর দোলের দিন উত্তমকুমারের বাড়িতে গিয়ে দোল খেলার পর কাটা বেছে বেছে অঞ্জনার মাছের লেজ ভাজা খাওয়া, সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়া, সুপ্রিয়াকে পছন্দমতো গয়না বিশেষত কানের দুল উপহার দেওয়া, বাঁধাধরা কাজের জীবনের বাইরে এইসব ছিল সেই সহজতারই পরিচয়।

মাত্র ২০ বছর বয়সে পীযুষ বসুর পরিচালনায় ‘অনুষ্টপ চন্দ’-তে প্রথম ‘ডেবিউ’ করেন আরতি। ছবি মুক্তির আগেই নিজের নাম পাল্টে রাখেন ‘অঞ্জনা’। আর এই নামেই দর্শক ও সমালোচকের কাছে জনপ্রিয় হন প্রথম ছবি থেকেই।

নেভি অফিসার অনিল শর্মার সঙ্গে বিবাহ সূত্রে মুম্বাই বাস শুরু হয় অঞ্জনার। আশির দশকের পর আর অভিনয় তেমন করেননি এই অভিনেত্রী। তবু, লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনের জগৎ ঘিরে আছে তাঁর পরিবারকে। মেয়ে নীলাঞ্জনা অভিনেত্রী ও প্রযোজক হিসেবে সফল। নীলাঞ্জনার জীবনসঙ্গী অভিনেতা যিশু সেনগুপ্তের বহুমুখী অভিনয়ে মুগ্ধ বর্ষীয়ান অঞ্জনাও। এমনকি যীশু-নীলাঞ্জনার কন্যা সারা অভিনীত ‘উমা’ দেখেও সম্প্রতি খুব খুশি হয়েছিলেন অঞ্জনা। উত্তম-অঞ্জনা জুটি অভিনীত ‘চৌরঙ্গী’-র আদলেই পরিচালক সৃজিত মুখার্জির ছবি ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ দেখে স্মৃতিকাতর অঞ্জনার সঙ্গে এই লকডাউনের শুরুতেই ভিডিও শুট করেছেন যিশু সেনগুপ্ত। নেপথ্যে বেজেছে ‘কিচ্ছু চাইনি আমি, আজীবন ভালোবাসা ছাড়া’। অঞ্জনা অল্প সময়ের জন্য বাংলা ছবিতে ‘রাজ’ করলেও প্রকৃত  দর্শক আজীবন তাঁকে ভালোবেসেই গেছেন। কিন্তু স্বীকার করতেই হয়, আরও যত কাজে অঞ্জনা ভৌমিককে দর্শক আশা করেছিলেন ততটা তাঁকে পাওয়া যায়নি। একটা সময়ের পর তাই তাঁর নামটা আধুনিক দর্শকের কাছে দূরতম দ্বীপে পরিণত হয়েছে। তবু বাংলা ছবিতে সময়ের শিলালিপি ক্ষয়ে যাওয়া অবসরেও অঞ্জনার নাম বেঁচে থাকে বারবার, ‘চৌরঙ্গী’-র হেয়ার স্টাইলে, ‘কখনও মেঘ’-এর আড়ালে। ‘ভুলে যাওয়া কবিতা’-র মায়াও যে বড়ো আন্তরিক সে কথা বাংলা ছবিকে মনে করায় যেসব নাম তাদের মধ্যে অঞ্জনা ভৌমিক অন্যতম। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা এই অভিনেত্রীকে।

Developed by DXDasia