খেয়াল করলে দেখা যাবে, মুসাফিরের রাজা চরিত্রটি অনেকটা দেবদাসেরই আদল
(গত পর্বের পর)

মুসাফিরের রাজা ও ঋত্বিক —
খেয়াল করলে দেখা যাবে, রাজা চরিত্রটি অনেকটা দেবদাসেরই আদল। দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন অভিনীত বিমল রায়ের ‘দেবদাস’। ঋত্বিক সেসময় কাজের ফাঁকে ফাঁকেই দেবদাস-এর সেটে যেতেন, আড্ডা দিতেন। তার অন্যতম কারণ ছিল রমা (সুচিত্রা সেন) এবং বিমল রায়। দুজনেই তাঁর মাতৃভূমির মানুষ। অতএব এটা পরিস্কার যে তিনি সেখান থেকেই দেবদাসের পুণর্জন্ম ব্যাপারটিকে রাজার সত্তায় ইনপুট করেছেন। খেয়াল আছে, শেষ একটা প্রতিশ্রুতি রাখতে দেবদাস ফিরে এসেছিল পার্বতীর গ্রামে। কিন্তু দেবদাসকে সেবা করার সুযোগ সে পায়নি। নাম পরিচয়হীন ভিনদেশে সে মারা যায় পার্বতীর চৌকাঠে। এই সিকোয়েন্সটা রি-ইনস্টেট করতেই রাজা ও উমার প্রথম শটে রাজাকে দেখানো হয়েছে ঘরের বারান্দায় বসে ভায়োলিন বাজাতে। এখানে উমা অর্থাৎ পার্বতী, তাঁর কাছে মরণাপন্ন দেবদাসকে আরেকবার ফিরিয়ে দেওয়া অপূর্ণ বাসনাস্বরূপ।
এবার দেখা যাক রাজা নামটির বক্তব্য কী? সাল ১৯৪৮, ঋত্বিক তাঁর ‘রাজা’ গল্পে লিখেছেন— রাজা কবি। রাজা পকেটমার। কিন্তু হৃষিকেশ মুখার্জীর ছবির জন্য মুসাফির গল্পটাকে ভাঙতে হয়। সে আফসোসের কথা তাঁর স্ত্রী সুরমা ঘটককে চিঠিতে জানিয়েছিলেন। বোম্বের আদবকায়দায় রাজাকে ভাঙতে হল। পোয়েটিক মেজরের নাটকীয়তা বজায় রেখে। এখানে রাজা চোর নয় বরং বেহালা বাদক। অন্তিম পথের পথিক। তাঁর বেপরোয়া মুসাফির জীবন যার স্বপ্ন নেই মৃত্যু যন্ত্রণা নেই বেঁচে থাকার বাসনা নেই এরকম নিরাসিক্ত নিরাভিমান অপেক্ষার মাঝখানে উমার প্রত্যাবর্তন। ষাট সত্তরের ছবিতে এই ধরনের উচ্ছন্নতার একটা মনোটনিক ফ্রেম অনেক হিন্দি ছবিতেই উঠে আসে। যার মূল হোতা দিলীপ কুমার। সফট-স্কেলে ছোটো ছোটো উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে একটা আইকনিক ইমেজ ততদিনে রমরমিয়ে চলছে। সেখানে হৃষিকেশ, সলিল, বিমল রায়ের মতো বাঙালিদের চেষ্টা ছিল বম্বে চলচ্চিত্রকে অভিনব আঙ্গিকে তুলে ধরা। ‘মুসাফির’ ডিরেকশনের দিক দিয়ে যতখানি ওয়েল-ফ্রেমড, তার চেয়েও অনেক বেশি আলোচ্য ছবির প্লট ও কাহিনির বিষয়টি। সেটাই অমরত্ব দিয়েছে ছবিটিকে। তবু ঋত্বিকের মন গলেনি। নাম যশ সব ত্যাগ দিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ রূঢ় বাস্তবের যে অন্ধকার গলি থেকে তিনি রাজাকে নিছক গদ্যে তুলে এনেছিলেন সেকথা বলার সুযোগ বোম্বের মাটিতে এক্কেবারেই নেই। পরিচালক ব্যাডলি ফ্লপ খেতে পারে। বলা ভালো, সাম্রাজ্যবাদী আনুগত্য স্বীকার করে রাজার মতো লোডেড ক্যারেকটার ফুটিয়ে অসম্ভব। তাছাড়া সে দুরূহ সাহস ঋত্বিক ছাড়া আর কেউ দেখাবেন না। আফটার অল, ছবি করিয়েদের কাটা পকেটগিলো তো ভরতে হবে। তারচেয়ে হালকা প্রেমের টোর খাওয়া পাতলা লুজমোশনের গল্প দিব্যি চলতে পারে। হৃষিকেশ মুখার্জীর এইসব সফট মেলোড্রামাটিক ছবিগুলো সমসাময়িক দর্শন কণ্ঠ ভরে পান করেছেন।

মুসাফির ও দ্য ট্রাজেডি কিং —
বিমল রায়ের দেবদাস ছবির করার পর এ ছবির ক্যারেকটার স্টাডি করতে দিলীপ কুমারের বিশেষ একটা অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয়নি। কারণ তৃতীয় পর্যায়ের চিত্রনাট্য দেবদাস আধারিত একটি শ্যাডো ক্যারেকটার। কেবল একটি ভায়োলিনের অপেক্ষা। এ ব্যাপারে তিনি সিদ্ধহস্ত। চমকে দেওয়ার ব্যাপার ছিল, তাঁর নিজস্ব কণ্ঠে গাওয়া প্রথম প্লে-ব্যাক। সেও কিনা ক্যুইন মেলোডি দ্য লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ক্লাসিকাল ডুয়েট। পিলু রাগাশ্রিত ঠুমরী ‘লাগি নাহি ছুটে রামা..’। যেমন ধীর স্থির তেমন মেজমেরিক। যেন সুরের পানপেয়ালা কণ্ঠে ধারণ করেছেন। অন্যদিকে ফ্রেমে উঠে আসছে উমা ও রাজার রোমান্টিক সিকোয়েন্স — ইয়াদ হে ম্যায় উস দিন দের সে আয়া থা ঔর তুনে জলদি জলদি কাপড়ে বদল লিয়ে থে। ফির ম্যায়নে ডুবতে সূরজকে সামনে তেরি ইয়ে তসবির লি থি। কেয়া দিন থে কসক বনকে সমা গ্যয়ী…
দিলীপ কুমারের দক্ষতা, মেথড অ্যাকটিং মৃদুস্বর রাজার মতো বোহেমিয়ান চরিত্রের জন্য ডোসাইল ট্রিটমেন্ট, মস্তিষ্কের স্নায়ুস্পন্দ থেমে যায়। মনের মধ্যে নিঃশব্দ একটা হাহাকার ছড়িয়ে দেয়। এ জন্যই হয়তো তিনি ট্রাজেডি কিং। আমাদের আজীবন মনে থাকবে তাঁর শেষ বিয়োগাত্মক দৃশ্যটি, যেখানে ঝড় বাদলের নিস্কৃত রাতে অসুস্থ শরীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, চোখে মুখে মৃত্যুর রেখাঙ্কিত ছাপ। হয়তো আর কিছুক্ষণ, তারপরেই সমস্ত ক্লান্তির যবনিকা নামিয়ে এক মুসাফির ডুবে যাবে তরল অন্ধকারের সরণিতে —
— বাহারকা তুফান আন্দারকা তুফান শায়েদ এক হো যানা চাহতে হ্যায়… অ্যায়সে মহামিলন কে সময় ইয়ুঁহি অন্ধকার হোতা হ্যায়। ইয়ুঁহি বাদল গরজতে হ্যায়। ইয়ুঁহি বিজলিয়া কণ কণ পড়তে হ্যায়। ঔর জীবন কে পথ পর এক থকে হরে মুসাফির ইসিতারহ টুট টুট পড়তে হ্যায়…
মুসাফির জীবনকে আলবিদা জানিয়ে রাজা আজ সত্যিকারের বিদায় নিলেন ইঁটকাঠের এই পার্থিব শহর থেকে। যেখানে ব্যাধি নেই, হাহাকার নেই, বিয়োগান্তক দৃশ্য নেই, অমনস্কাম জন্মান্তর নেই — আলবিদা ইউসুফ খান। আপনার সফর সুহানা হোক।
সমাপ্ত